‘ধুল চেহরে পর থি অউর আইনা সাফ করতা রহা’—ঊনবিংশ শতাব্দীতে লিখেছিলেন উর্দু কবি মির্জা গালিব। দল বদলের এই বঙ্গে বড়ই প্রাসঙ্গিক গালিবের উপলব্ধি। নতুন দলে গিয়ে পুরনো দলের মুন্ড পাতের মেগাসিরিয়াল চলছে। পুরনো দল থেকে ভেসে আসছে পাল্টা প্রতিক্রিয়া। তবে যার বিরুদ্ধে যে অভিযোগই থাকুক না কেন দল বদলালেই তা ধুয়ে মুছে সাফ। তখন শুধুই দল বদলির মুখে পুরনো দলের কেচ্ছা। অথচ অর্থবল, পেশীবল, কু-কথা, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, দুর্নীতি সবই থেকে যাচ্ছে রাজনীতিতে। এই মৌরসিপাট্টায় কোনও কমতি নেই। নেই মালিন্য মোছার কোনও সংকল্প। স্বাধীনতার পরে বঙ্গে কংগ্রেস শাসন, তারপর দীর্ঘ বাম শাসনে দল ছাড়ার নজির ছিল না তা নয়। তবে এমন জাঁকজমক ছিল না। এমন বাদ্যি বাজিয়ে বলিউডি চিত্রনাট্যকে হার মানিয়ে দল বদলে পতাকা হাতে নিয়ে ফটোশেসনের দেমাক ছিলনা।
এই শতকের শুরুতে সিপিআইএম ছাড়েন পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রথম শারির নেতা সমীর পুততুন্ড এবং সৈফুদ্দিন চৌধুরী। তাঁদের সিপিএম ছেড়ে বেরিয়ে আসায় রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন পড়েছিল। এই দু-জনের দল ছাড়ার সঙ্গে সুভাষ চক্রবর্তীকে ঘিরে কৌতুহল তৈরি হয়েছিল রাজনীতিতে। তিনিও কি দল ছাড়বেন? এই প্রশ্নে চর্চা শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সুভাষ চক্রবর্তী দল ছাড়েননি। সমীর পুততুন্ড এবং সৈফুদ্দিন চৌধুরী দু-জনেই দলীয় রাজনৈতিক লাইনে বিরোধিতা করে দল ছেড়েছিলেন। বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান ঠেকাতে কংগ্রেসের সম্পর্ক নিয়ে দলীয় লাইন বদলান উচিত বলে দলে প্রস্তাব দিয়েছিলেন সৈফুদ্দিন চৌধুরী। দল তাঁর সঙ্গে সহমত হয়নি। যদিও ২০০৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিকে ঠেকাতে সিপিএম কংগ্রেসকে সমর্থনের পথ নিয়েছিল।
সমীর পুততুন্ড বা সৈফুদ্দিন চৌধুরী ব্যক্তিগত লাভের জন্য দল ছাড়েন নি। তাঁর নতুন দল গড়ে বড়ো ঝুঁকি নিয়েছিলেন। সেই সময় বঙ্গে সিপিআইএম ছিল দন্ডমুন্ডের কর্তা। সৈফুদ্দিন ছিলেন সাংসদ এবং সমীর পুততুন্ড ছিলেন দক্ষিন ২৪ পরগনার জেলা সম্পাদক। কথিত আছে সমীরবাবুর প্রতাপে জেলায় বাঘে গরুতে একঘাটে জল খেত। তিনি অত্যন্ত কুশলী রাজনীতিক এবং দক্ষ সংগঠক। তিনি দল ছাড়ায় ২০০১-এ বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআইএম দক্ষিন ২৪ পরগনায় অনেক আসন হারিয়েছিল। ২০০১-এ নির্বাচনে জেতার পরে দক্ষিন ২৪ পরগণার বিষ্ণপুর পূর্বতে সিপিআইএম-এর বিজয় সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন জ্যোতি বসু। মঞ্চে দাঁড়িয়ে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, এই জেলায় আমাদের যিনি সম্পাদক ছিলেন তিনি দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তার জন্য আমরা এই জেলায় ১১টা আসনে হেরেছি। তবে শেষ পর্যন্ত সমীর পুততুন্ড ও তাঁর দল পিডিএস রাজ্য রাজনীতিতে প্রসঙ্গিকতা হারিয়েছে। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় পিডিএস তৃণমূলের সঙ্গে একমঞ্চে থাকলেও সমীর পুততুন্ড তৃণমূল কংগ্রেসে নাম লেখাননি।
এখন শুভেন্দু অধিকারীর তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ায় রাজ্য-রাজনীতিতে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে। তিনি দল ছাড়ায় তৃণমূল কতগুলো আসন হারাতে পারে তা নিয়ে নানান জল্পনা চলছে। শুধু শুভেন্দু অধিকারী নয় আরো কয়েকজন বিধায়ক তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছেন। বিজেপি নেতারা সিনেমার সংলাপ ধার করে বলছেন ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায়’। রাজনীতিতে এখন ময়দান কাঁপানো সংলাপের ছড়াছড়ি। শুনে মনে হয় বলিউডের বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার সেলিম জাভেদ যাঁরা বহু হিট ছবি হিট সংলাপ লিখেছিলেন তাঁরা যদি এখন রাজনৈতিক নেতাদের জন্য সংলাপ লিখতেন তাহলে সুইস ব্যাঙ্কে এ্যাকাউন্ট খুলতে হতো। অনেকেরই প্রশ্ন অন্যদল থেকে এইভাবে নেতা- বিধায়কদের দলে টানছে কেন বিজেপি? এর পিছনে যে কারন রয়েছে তা অনুমান করা কঠিন নয়। উত্তর বঙ্গে আরএসএস-এর প্রভাব বিস্তারে লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে বিজেপি ভালো ফল করেছে।
বিধানসভা নির্বাচনেও উত্তরবঙ্গে বিজেপির দাপট থাকতে পারে। তবে বাংলার শাসন ক্ষমতায় বসতে হলে, দক্ষিন বঙ্গে আধিপত্য প্রয়োজন। কিন্তু দক্ষিন বঙ্গে বিজেপি এখনও সব জেলায় সব বুথে এজেন্ট দেওয়ার মতো সংঘঠন তৈরি করতে পারে নি। এবার করোনার বিধিনিষেধে রাজ্যে বুথের সংখ্যা বেড়ে ৯২/৯৩ হাজার হতে পারে। ফলে বিজেপিকে সংগঠন বাড়াতেই হবে। তবে বুথে শুধু এজেন্ট বসালেই তো হবেনা। নির্বাচনী লড়াইতে বুথ ম্যানেজমেন্ট অতি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। নিপুন বুথ ম্যানেজমেন্টের জন্য জোরালো সংগঠন প্রয়োজন। এই দুর্বলতা ঢাকতেই বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরিয়ে ভোটের আগে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে বিজেপি। এর পাশাপাশি তৃণমূলকে ভেঙে বিরোধী সংগঠন দূর্বল করাই বিজেপির লক্ষ্য। এই কারনে উত্তরবঙ্গে তৃণমূল বিধায়ক মিহির গোস্বামীর যোগদান পতাকা হাতে নিয়ে ফটো শেসনেই শেষ। এর পাশে শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে দক্ষিণবঙ্গে প্রাক নির্বাচনী জৌলুস চোখে পড়ার মতো। পূর্ব মেদিনীপুর পশ্চিম মেদিনীপুর আর ঝাড়গ্রাম এই তিন জেলায় রয়েছে বিধানসভার ৩৮টি আসন। শুভেন্দু-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন নেতা ও বিধায়কদের দলে এনে এই ৩৮টি আসনে জেতা বিজেপির লক্ষ্য। এই লক্ষ্য মোটেই কম নয়। ফলে বলা যায় শুভেন্দু অধিকারী অনেক বড়ো ঝুঁকি নিয়েছেন। মন্ত্রীত্ব বিভিন্ন সরকারি সংস্থার শীর্ষপদ দলীয় সংগঠনের গুরুত্ব সব কিছু ছেড়ে তিনি যখন এক বড়ো পরীক্ষায় বসেছেন তখন তাঁর নিশ্চই কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
শুভেন্দুকে এই পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। নির্বাচনের আগে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখে রাজা-উজির মারা আর কঠিন নির্বাচনী পরীক্ষায় পাশ করার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। তাঁর পিছনে বিজেপির মতো অতি শক্তিশালী দল রয়েছে। কেন্দ্র এবং বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার ফলে বিজেপির অর্থের প্রাচুর্য রয়েছে, চোখ ধাঁধানো প্রচারের জন্যে বিজেপির অত্যন্ত কৌশলী ব্রিগেড রয়েছে। এই বলে বলীয়ান হয়ে সংবাদমাধ্যম, সমাজমাধ্যম ও প্রচার মঞ্চ এই ত্রিভুজে নির্বাচনী প্রচারে শুভেন্দুর ছায়া যতই দীর্ঘ দেখাক না কেন তাঁকে মার্কশিট নিতে হবে ইভিএম থেকে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় দেশের বিভিন্নরাজ্যে বড়োসড়ো অনেক নেতাই দল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছেন। তাঁদের কেউই বিজেপির নীতি নির্ধারকের গোষ্ঠীতে ঠাঁই পাননি। বিজেপি সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবর্তিত হলেও বাজপেয়ী, আডবানীর আমল থেকে এখনও পর্যন্ত এই ধারায় বদল হয়নি। যার সাম্প্রতিকতম উদাহরন মুকুল রায় ও জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। দলের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি পদ পেতে মুকুল রায়ের ৩ বছর সময় লাগলো। আর জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া মধ্যপ্রদেশের ২২টি আসনের উপনির্বাচনে কংগ্রেসকে পর্যুদুস্ত করে পুরস্কারের অপেক্ষায় ওয়েটিংলিস্টে রয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে অনেকগুলো স্তর রয়েছে। দলিত, আদিবাসী, নমশুদ্র, মুসলিম সম্প্রদায় ও মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে এই স্তর ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি স্তরই নিজস্ব চাওয়া পাওয়া নিয়ে ইভিএম-এর বোতাম টিপবে। এবারে বঙ্গনির্বাচনী রাজনীতিতে যোগ হয়েছে বাঙালি মনিষী ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার নিয়ে টানা পোড়েন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এই মুহূর্তে বঙ্গবাসীর কৌতূহল দলবদল নিয়ে। এই দলবদলিদের কোন চোখে দেখছে বঙ্গবাসী তার উত্তর কয়েকমাস পরে ভূমিষ্ঠ হবে ইভিএম-এর গর্ভ থেকে।