‘আকাশ আমার ঘরের ছাউনি / পৃথিবী আমার ঘর।
সারা দুনিয়ার সকল মানুষ / কেউ নয় মোরা পর।’
ওপার বাংলার তিতাস নদীর পাড়ে ছলাৎ ছলাৎ জলের শব্দ, জোয়ার ভাটার উথাল পাতাল ঢেউ আজন্ম দোলা দেয় তাঁর রক্তে। তাই ঘরের চারদেওয়াল নয় – অমর পালের ঠিকানা আকাশ বাতাস প্রকৃতির মাঝে। সাতানব্বই বছর পেরিয়েও তার কন্ঠে খেলা করতো ভোরের রোদ্দুর।
১৯২২ সালের ১৯শে মে অবিভক্ত ভারতের ব্রাহ্মণবেড়িয়ায় মাঝেরপাড়ায় (বাঙাল ভাষায় মাইজপাড়ায়) জন্ম অমর পালের। সম্পন্ন ব্যবসায়ী পরিবারে গানের খুব চর্চা ছিল ।বাবা মহেশচন্দ্র পাল নিজে গান না গাইলেও, সমঝদার ছিলেন সুরের। আর মা দূর্গাসুন্দরীর গানের গলা ছিল ভারী মিষ্টি। লোকসঙ্গীতে অমর পালের গানের হাতেখড়ি হয়েছিল মায়ের কাছ থেকে। মা দূর্গাসুন্দরী কত যে মেয়েলি গান গাইতেন — ধান কোটা, চিঁড়ে কোটা, ধামাইল অর্থাৎ বিয়ের গান এমনকি মুসলিম জারি গান পর্যন্ত ছিলো তাঁর সংগ্রহে। শেষ বয়সেও যা তিনি লিখে দিয়েছেন ছেলেকে সম্পূর্ণ স্মৃতি থেকে। সেই যে ছেলেবেলায় বাড়ির উঠোনে বৈষ্ণবীর মাধুকরি গান, “রাই জাগো রাই জাগো শুকসারী বলে / কত নিদ্রা যাও গো রাধে শ্যামনাগরের কোলে”
…শুনে ঘুম ভাঙতো ছেলের, পরে তাই কন্ঠে তুলে নিয়েছেন বালক অমর… সঙ্গীত জীবনে সেই গানই রেকর্ড হিট করেছে।
একটু বড় হয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে দোকানে সচিন কর্তা, কে এল সায়গল, কানন দেবীর গান কলে শুনে বিভোর হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়া আর বাড়ি ফিরে মাস্টারের হাতে বেতের কঞ্চি দিয়ে মার খাওয়া… এ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ‘স্কুল কেন কামাই করস দিনের পর দিন?’ এ প্রশ্নের উত্তর দেবে কেমন করে সাত আট বছরের বালক। তার যে পড়াশোনা করতে ভালই লাগে না, মন যে বুঁদ হয়ে থাকে গানের ভুবনে।
মাত্র দশবছর বয়সে বাবার মৃত্যুতে আকাশ ভেঙ্গে পড়ল মাথায়। মা আর তিন ছোট ভাই বোনকে খাওয়াবে কে? ঢপলীলার যাত্রা দলে নাম লেখালো ছোট্ট অমর। কিন্তু বিবেকের গান গেয়ে যে ক-পয়সা পাওয়া যায়!
কিছুদিন এ শহর ও শহর ঘুরে গান গাওয়া হলো, এবার মার নির্দেশে গেলেন এক আত্মীয়ের সঙ্গে রংপুরে সেখানে একটি দোকানে ম্যানেজার হয়। পরে নিজের চায়ের দোকান খুললো তরুণ অমর। একদিন সামান্য দুধ চাইতে এসে না পেয়ে যখন লাল মুখো সাহেব লাথি কষালো, আর সহ্য হলো না, দোকান বিক্রি করে সটান বাড়ি ফেরৎ।
কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার আর মন টেকে না। আগে একবার বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় স্বাদ নিয়ে এসে বুঝেছে, নামডাক হতে গেলে যেতে হবে বড় শহরে। এবার আর না বলে নয়, মাকে বলেই কলকাতায় পারি। কিন্তু বেশিদিন সহ্য হলো না হোটেলের খাবার, আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
কিন্তু এবার একটা বড় ঘটনা ঘটলো জীবনে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাজারের কাছেই বাদ্যযন্ত্রের দোকান ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁয়ের। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁয়ের ছোট ভাই। গুরুজীর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম শুরু হল। কিন্তু অমর বুঝতে পারছিলেন তার প্রাণ আনচান করছে মাটির গানের জন্য। লোক সংগীত কে তিনি ব্যাখ্যা করতেন কর্মসংগীত বলে। কাজের ক্লান্তি ভোলার জন্য যে গান গায় মাঝি মোল্লারা, কিংবা ঘরের মেয়ে বউ গায় — সেই সহজ-সরল সুরেই জীবন খুঁজে পান অমর পাল। তাই শেষ পর্যন্ত কলকাতাই হল তার ঠিকানা।
স্বাধীনতার পরের বছর শচীন ভট্টাচার্যের হাত ধরে চলে আসা এপারে। ১৯৫১ সালে প্রথম আকাশবাণীতে শচীন ভট্টাচার্যের লেখা ভাটিয়ালি সুরে গাইলেন ‘কোন গ্রামের কন্যা ওগো/ যাইবা কোন গ্রামে গো’। এরপর বিস্তর লড়াই করে আসেন শীর্ষে, আকাশবাণী রেকর্ড আর মঞ্চ জুড়ে ছড়িয়ে গেলো তাঁর সুরের মায়াজাল। লোকসংগীতের জগতে তার অনন্য অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ স্টেট একাডেমী অফ ডান্স, মিউজিক এন্ড ভিসুয়াল আর্টস, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ সঙ্গীত একাডেমি তাঁকে সম্মানিত করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তাঁকে লালন পুরস্কার ও সংগীত মহাসম্মান দেন। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডিলিট উপাধি দেন।
তাঁর গাওয়া বহুগানের মধ্যে — ‘শয়নে গৌর স্বপনে গৌর’, ‘জাগ হে এই নগরবাসী’, ‘আমি স্বপ্ন দেখি মধুমালার মুখ’, ‘মনা কি করলি রে’, ‘এই ভব সাগরে ক্যামনে দিব পাড়ি’ বৃন্দাবন বিলাসিনী’, ‘জাগিয়া লহো কৃষ্ণ নাম’, ‘আমার গৌর কেনে’… সারা দুনিয়ার বাঙালিকে প্রাণের আরাম দিয়েছে।
কিন্তু তাঁর জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা কোনটা জিজ্ঞাসা করলে এক মুহূর্ত না ভেবে জবাব দেন অমর পাল — সত্যজিৎ রায়ের ডাকে হীরক রাজার দেশে ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ। ‘আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায় ও ভাই..’ এক টেকেই ওকে করেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ। সিনেমায় এক বাউল মেঠো পথে হাঁটতে হাঁটতে এক মনে গেয়ে চলেছে প্রাণ জুড়ানো এই গানটি। গানটির মাঝে সত্যজিৎ আরো একটি সংলাপ ঢুকিয়ে দিলেন ‘বাঃ খাসা! কি ভাষা’.. কোথাও যেন রাজনীতি আর রাজা-প্রজার কথা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলো অমর পালের কন্ঠে। সংলাপের পর আবার গাইলেন‘দেখো ভাল জনে রইল ভাঙা ঘরে/ মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে।’ প্রচ্ছন্ন ইঙ্গীতের কারণে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও অমর পালের গলার মোহিনী মায়ায় আজও বড় প্রাসঙ্গিক এবং বিখ্যাত হয়ে রয়েছে গানটি।
তাঁর জীবনের আরেকটি সেরা অভিজ্ঞতা হলো, ওয়াশিংটনে গান গাইতে গিয়ে তখনকার রাষ্ট্রদূত সিদ্ধান্ত রায়ের সঙ্গে ঘরোয়া আসরে চিংড়ি মাছ খেতে খেতে মালা রায়ের অনুরোধে ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো’ শোনানো। সে কি কম রোমাঞ্চকর!
যে বয়সে সাধারণত গায়ক-গায়িকারা হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল ঠেকানোর কথা ভাবতেই পারেন না, সেই বয়সেও কিন্তু নিয়মিত রেওয়াজ করতেন অমর পাল। সপ্তাহে দুদিন টালিগঞ্জের বাড়িতে গান শেখাতেন দূর দূরান্ত থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের।
সাত দশকের বেশি এই লোকগানেই অনাবিল আবেগে আত্মস্থ এই শিল্পীর কথা ও সুরে বার্ধক্যের কোন ছাপ পড়তো না। তাঁর প্রয়াণের কিছুক্ষণ আগেও লোকগানের মতো মাটির গন্ধ মাখা সতেজাতার প্রতীক ছিলেন তিনি। ২০১৯ এর ২০ শে এপ্রিল কলকাতা বাড়িতে দুপুরে সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় এসএসকেএম হসপিটাল এর আইটিইউতে। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পূর্ববঙ্গের লোকগানের সহজিয়া ঘরানার স্মরণীয় বাহক ও কিংবদন্তী লোকশিল্পী অমর পালের প্রয়াণ দিবসে তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
খুব সুন্দর হয়েছে।ভালো লাগলো আপনার লেখা পড়ে।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই