এক বন্ধু গতকাল রাতে বাইডেনের বিজয়ের পর উৎসবের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “ট্রাম্প টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে এক অনাবাসী ভারতীয় বললেন, আজ আমি প্রচন্ড ক্লান্ত কিন্তু একইসঙ্গে দারুণ খুশি। নতুন করে বাঁচার ইচ্ছেটা আবার চাগাড় দিচ্ছে। আজ অনেকদিন বাদে বাড়ি থেকে কাজ শেষ হল, অফিসে যেতে হবে আবার সোমবার থেকে।” এই হাঁফ ছেড়ে বাঁচা অনাবাসী ভারতীয়টির কথা আদতে গোটা আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু মানুষের কথার প্রতিধ্বনি। শুধু তাই নয়, গোটা আমেরিকার মনের কথা। ট্রাম্প মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছিলেন এক আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য স্লোগান তুলে এদের আমেরিকা থেকে বিদায় করতে চেয়েছিলেন তিনি। জাতি নয়, বর্ণ নয়, ধর্ম নয় শুধু মানুষের কাজকেই তার পরিচয় হিসেবে বিশ্বাস করা খোদ আমেরিকানরাই সেকথা বিশ্বাস করেননি। মানুষের রায় তাকে প্যাভেলিয়নে পাঠিয়ে দিয়েছে। আজ তাদের খুশির দিন। ট্রাম্পের পরাজয়ে বহু জায়গায় মানুষ তাদের অফিস রাস্তায় নেমে এসে আনন্দে স্লোগান দিয়েছেন, গান করেছেন, নাচ করেছেন।
করোনা অবাক ও হতাশ করে দিয়েছিল পৃথিবীকে। ট্রাম্পও ঠিক তাই, তার যুক্তি বর্জিত সিদ্ধান্ত ও ঔদ্ধত্যে বারবার অবাক হয়েছিল আমেরিকা। শেষে মানুষ ক্লান্ত হয়ে তাকে উপেক্ষা করতে শিখেছিল। ব্যালটে তাদের ক্ষোভ প্রতিবাদ হয়ে ফেটে পড়লো। করোনার উত্থানের মতই দুনিয়া হাঁ করে দেখেছে ট্রাম্পের হঠাৎ রাজা হওয়া। চার বছর কাটতে না কাটতেই সেই ভুঁইফোড় স্বেচ্ছাচারি রাজাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে তারা। রাস্তায় রাস্তায় শ্যাম্পেনের ফোয়ারার নিচে, ড্রামের তালে পা মিলিয়ে করোনা জ্বরে কাঁপতে কাঁপতেও উৎসবে মেতেছেন মানুষ। তারা প্রমাণ করেছেন ভোট হল জনগণের উৎসব। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মকে যারা ‘সামাজিক দূরত্ব’ নামে একটি জনবিরোধী নিয়মে পর্যবসিত করেছেন তাদের বিধিনিষেধ আজ আর মানেননি মার্কিনীরা। ভিড়ে ভয় না পেয়ে অগণিত মানুষ ট্রাম্পকে দুয়ো দিচ্ছেন তার প্রাসাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে।
বাইডেনের পাশাপাশি উঠে আসছে কমলা হ্যারিসের নাম। তিনি আগামি দিনে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট। এ জয়ও ফুটবল মাঠ থেকে ফুটপাথ অবধি কালো মানুষদের প্রতিবাদ ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনের জয়। বোঝা গেল ট্রাম্পের সাদা চামড়ার প্রভুত্ববাদের আতঙ্কে কুঁকড়ে যায়নি গোটা পৃথিবীকে গণতন্ত্র এবং অধিকার রক্ষার লড়াই শেখানো আমেরিকা।
বাইডেনের এই জয় আসলে ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের সামনে কুঁকড়ে যাওয়া মানুষের আত্মবিশ্বাসকে আবার ফিরিয়ে আনবে। পৃথিবীর নানাপ্রান্তের প্রতিবাদী মানুষ প্রেরণা পাবেন এই জয় থেকে। এই জয় কিন্তু হঠাৎ জেগে ওঠা কোন আবেগ ও উচ্ছ্বাস নয়, বাইডেন এগিয়েছেন শান্ত অথচ নির্ভীক পদক্ষেপে। তিনি মানুষের মনের কথা পড়তে পেরেছিলেন। গোটা পৃথিবীর রাজনীতিতেই যা হয়ে উঠছে এক বিরল ঘটনা। আজকের রাজনীতিবিদদের একটা বড় অংশ দেশের মানুষদের মন পড়তে পারেননা তাই তারা তাদের থেকে দূরে সরে যান। বাইডেন কিন্তু সে রাস্তায় হাঁটেননি। মাৎস্যন্যায় আর বর্ণদাঙ্গার খাদের মুখ থেকে শেষ অবধি ঘুরে দাঁড়ালো আমেরিকা।
জয় মানুষের জয়।