দুর্গোৎসবের কালক্রমিক ইতিহাস ও এর ধারাবাহিক তথ্য-উপাত্ত এখনো পাওয়া যায়নি। কোনো ইতিহাসবিদ বা সমাজবিজ্ঞানী ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীতে দূর্গোৎসবের উদ্ভবের ইতিহাস ও আনুষঙ্গিক ঘটনাপঞ্জি নির্ভরযোগ্য দলিলপত্র ঘেঁটে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হননি। ফলে কখন, কিভাবে দুর্গোৎসব শুরু হলো তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে পুরাণ, মহাভারত, রামায়ণ, ধর্মীয় কাব্য, নানা ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও সূত্র থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, দুর্গা পূজার প্রথম প্রবর্তক কৃষ্ণ, দ্বিতীয় বার দুর্গা পূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা আর তৃতীয়বার দূ্র্গা পূজার আয়োজন করেন মহাদেব। আবার দেবী ভাগবত পুরাণ অনুসারে জানতে পারি, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু ক্ষীরোধ সাগরের তীরে দূর্গার আরাধনা করে বর লাভে সফল হন। মূল বাল্মীকির রামায়ণে, দুর্গা পূজার কোনো অস্থিত্ব নাই। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে দুর্গাপূজার অস্থিত্ব আছে।
মধ্য যুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গা পূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে আছে দুই ধরনের স্থাপত্যরীতি মন্দির। প্রাচীনতমটি পঞ্চরত্ন দেবী দুর্গার। মন্দিরের প্রাচীন গঠনশৈলী বৌদ্ধ মন্দিরের মতো। দশম শতকে এখানে বৌদ্ধ মন্দির ছিল। পরবর্তীতে কিভাবে সেন আমলে হিন্দু মন্দির হয়েছিল তা ইতিহাসে লেখা নাই। ১১শ বা ১২শ শতক থেকে এখানে কালী পূজার সাথে দুর্গা পূজাও হতো। ইতিহাসবিদ দানীর মতে, প্রায় সাড়ে পাঁচ শ বছর আগে রমনায় কালী মন্দির নির্মিত হয়েছিল এবং এখানেও কালী পূজার সাথে দুর্গা পূজা হতো।

রামকৃষ্ণ মিশন ঢাকা
বঙ্গে ১৪শ শতকে দুর্গা পূজার প্রচলন ছিল কিনা ভালোভাবে জানা যায় না। ঘটা করে দুর্গা পূজা চালুর আগে কিছু কিছু উচ্চ বর্ণ হিন্দুদের গৃহকোণে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে ঘরোয়া পরিবেশে এই পূজা চালু ছিল। কারো মতে, ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম দুর্গা পূজা করেন। অনেকে মনে করেন, ১৬০৬ সালে নদীয়ার ভবনানন্দ মজুমদার দুর্গা পূজার প্রবর্তক। ১৬১০ সালে কলকাতার বারিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দুর্গা পূজার আয়োজন করেছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৬১০ সালে কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার দুর্গার ছেলে মেয়েসহ সপরিবারে পূজা চালু করেন।
আধুনিক দুর্গা পূজার প্রাথমিক ধাপ ১৮ম শতকে নানা বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগে ব্যক্তিগত, বিশেষ করে জমিদার, বড় ব্যবসায়ী, রাজদরবারের রাজ কর্মচারী পর্যায়ে প্রচলন ছিল। বাংলাদেশের সাতক্ষীরার কলারোয়ার ১৮ শতকের মঠবাড়িয়ার নবরত্ন মন্দিরে (১৭৬৭?) দুর্গা পূজা হতো বলে লোকমুখে শোনা যায়। ১৯২৬ সালে অতীন্দ্রনাথ বোস জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে পূজা উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কালের বিবর্তনে তাই দুর্গাপূজা আজ বাঙালির প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রূপ লাভ করেছে।

শাঁখারিটোলা, ঢাকা
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে হিন্দুদের এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে মুসলিমরাও। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই বাংলাদেশে তাই পূজা বা ঈদ হয়ে গেছে সম্প্রীতির স্মারক। পূজা-পার্বণ তাই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে গেছে সামাজিক অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের গ্রাম বা শহরে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদেরও এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করতে দেখা গেছে। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, শাঁখারিবাজার, তাঁতিবাজার, বংশাল, সূত্রাপুর এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে অনুষ্ঠানে যোগ দেয় শত শত মুসলিম যুবক। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশে পূজা আয়োজন কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে যায়। বিভিন্ন সময়ে বাধার মুখে পড়ে দুর্গাপূজা। এদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দলে দলে ভারতে চলে যায়। গ্রামে গ্রামে একটা আতঙ্কের রাজনীতি চলু হয়। আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি সে সময় একটা ভয় কাজ করেছে আমাদের মনে। এদেশটাকে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে ‘আমার না’।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে একটা স্বস্তি কাজ করে এদেশের হিন্দুদের মধ্যে। এদেশে পূজা ফেরে আগের চিরচেনা রূপে। দিন দিন দুর্গাপূজা মণ্ডপের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নিরাপদ আবাসভূমে পূজা ফিরে পায় তার চিরচেনা রূপ। তবে আওয়ামী লীগ হিন্দুদের দল বলে একটা কথা চালু আছে এদেশে। অনেকেই বলে থাকেন আওয়ামী লীগের আমলে হিন্দুরা এদেশে ভালো থাকে। তবে বিএনপির আমলে যেমন বিভিন্ন মণ্ডপে মূর্তি ভাঙা হয়েছে সেটা থেমে থাকেনি আওয়ামী লীগের আমলেও। যার মধ্যে ২০২১ সালের কথা বলতেই হয়।

গতবছর দুর্গাপূজার মহা অষ্টমীতে কুমিল্লা নগরের নানুয়াদিঘির উত্তর পাড়ের পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুরের ঘটনায় পূজা বন্ধ হয়ে যায়। এতে কান্নায় ভেঙে পড়ে এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এর জেরে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। নোয়াখালী, চাঁদপুর-সহ বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতায় কমপক্ষে দশজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনায় ১২টি মামলা হয়। পুলিশ এসব মামলার তদন্ত করছে। তবে এবার প্রশাসনের অভয়ে একই স্থানে পূজা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
গতবারের হামলার ঘটনায় শুধু নোয়াখালী, কুমিল্লা ও চাঁদপুরেই ৫৬টি মামলা হয়েছিল। এর অর্ধেক মামলায় আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারও হয়েছিল চার শতাধিক আসামি। কিন্তু অধিকাংশ আসামি জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছেন। তবে কুমিল্লার মণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখার মূল হোতা ইকবাল এখনও কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
তবে এবারের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করেও জঙ্গি হামলার ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, পূজাকে কেন্দ্র করে দুই ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। একটি হলো জঙ্গি হামলার, আরেকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটিয়ে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টি করা। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ-সহ সবাই কাজ করছে।

পুরানো ঢাকা
এদিকে কুমিল্লা শহরের যে পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা হয়েছিল গত বছর এবার নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সেই নানুয়াদীঘির পাড়ে পূজার আয়োজন শেষ হয়েছে। সেখানকার পূজার আয়োজক কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রতিবেশী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শঙ্কা কাটাতে মণ্ডপে প্রতিমা পাহারা দেওয়া থেকে শুরু করে আরো নানান উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্থানীয় মুসলমানেরা।
গতবছরের হামলার ঘটনায় এবার নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। এবার প্রতিটি পূজামণ্ডপে ২৪ ঘণ্টায় পালাক্রমে দু’জন করে আনসার মোতায়েন থাকবে। সেজন্য সারা দেশে ৩২ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপের জন্য এক লাখ ৯২ হাজার আনসার মোতায়েন করা হচ্ছে। পুলিশ এবং র্যাব অব্যাহত টহলে থাকবে। সব পূজামণ্ডপে গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হবে এবং মনিটর করা হবে ফেসবুক-সহ সামাজিক মাধ্যম। পুলিশের সদর দপ্তর এবং জেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হবে এবং ২৪ ঘণ্টা সেখানে যোগাযোগ করা যাবে। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত রাখা হচ্ছে।
এ বছর বাংলাদেশে ৩২ হাজার ১৬৮টি মণ্ডপে পূজা হবে এবং গত বছর দুর্গাপূজার সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ১১৮টি। সে হিসেবে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ৫০টি। ঢাকা মহানগরে এবার পূজার সংখ্যা ২৪১টি, যা গত বছরের থেকে ৬টি বেশি।
লেখক : মিঠুন কুমার পাল, শিক্ষক ও সাংবাদিক, ঢাকা, বাংলাদেশ