চারদিকে অস্থির আতঙ্ক, ঘরে থাকার তীব্র আর্তি। চোখে মুখে অজানা মৃত্যুভীতির অলীক দুঃস্বপ্ন। সোস্যাল মিডিয়ায় শুধু মৃত্যুঝড়ের পূর্বাভাস। অথচ তার মধ্যেও অসংখ্য মানুষ আপন ছন্দে পাগলপারা। টিভিতে দেখলাম একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার অকপটে স্বীকার করলেন, আমাদের মতো সবদেশেই পাগল আছে। তাদের বাগে আনা কঠিন। ইটালি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা সর্বত্র তাদের অবাধ বিস্তার। করোনাকে তারা কেয়ার করে না। কিচ্ছু হবে না বলে নিষেধ অমান্য করার বাতিকে তারা বেতাজ বাদশা। আমাদের দেশেও তারা দেদার ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তাই দেখে আমাদের চোখ ঝলসে উঠছে, দাঁত কিড়মিড় করছে, নখ বেরিয়ে আসছে। শেষে পুলিশের ডান্ডায় শায়েস্তা করার আকুল প্রত্যাশা। সেই নাছোড়েরা বাবার অবাধ্য সন্তান থেকে মুহূর্তেই আমাদের দীক্ষিত আক্রোশে অপরাধী হয়ে ওঠে। ডাক্তারবাবু তাদের পাগল বলে বিচ্ছিন্ন করে ঠিকই করেছেন। অবশ্য পাগল কথাটিও আপেক্ষিক। পৃথিবীর প্রথম নবজাগরণ ঘটেছিল যে দেশটিতে, তারনামই ইটালি। সেই প্রথম আধুনিক দেশটিতে করোনাকে উপেক্ষা করার মাশুলে আজ তার সর্বস্বান্ত পরিণতি।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডেও তার উপেক্ষার ফল ফলেছে। আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রে তার সর্বাধিক প্রভাবের কথা ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে পাগলের উপস্থিতি প্রায় সর্বত্রই। পাগল আমরাও, যাকে বলে সেয়ানা পাগল। আমরা প্রয়োজনে পাগলের অভিনয় করে থাকিমাত্র। ওরা সেই অভিনয় করতে জানে না। মন আরমুখের দূরত্ব বাড়াতে তারা অনভ্যস্ত। আমাদের মতো চৌখস হতে পারেনি। পৃথিবীটা তাদের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে। মাঝে মাঝে আমাদেরকে অভিনয় নয়, নকল করে চলার চেষ্টা করে। চেনা গণ্ডিতে পা ফেলে। আমাদের মতো চোখ-কান-নাকের বিস্তার ঘটাতে পারে না, পায় না রস ও রসনার অভিজাত আস্বাদন। আমরা ছুটে চলি মৌমাছি হয়ে, ঘুরে বেড়াই প্রজাপতি ভেবে, দেশান্তরে পাড়ি দেই পরিযায়ী পাখি সেজে। আবার পেঁচার মতো শিকার ধরায় দক্ষ, কোকিলের মতো বংশবিস্তারে স্বাভাবিক। কণ্ঠে মধু, মনে কাকের বাসা। আমাদের ভোগী জীবনে উপভোগ্য পৃথিবীতে প্রাণের মায়া তো একটু বেশি হবেই। যেখানে বর্ষণেই নৃত্যপাগল ময়ূরের মত মন নেচে ওঠে, সেখানে ওদের কী-বা গ্রীষ্ম, কীই-বা বসন্ত! বসন্ত বললে ওদের বরং বসন্ত রোগের কথা মনে পড়ে। ইটালি বললে তাদের ইঁটের কথা মনে আসে, মার্কিন শব্দে মার্কিন কাপড় ভেবে বসে। ওদের পৃথিবীটা দিনে শুরু হয়, রাত নামতেই শেষ হয়ে যায়। এজন্য সেই দিনের পৃথিবীটা ঘরবন্দি করলে তা আরও ছোট হয়ে যায়, তাদের দমবন্ধ মনে হয়।
মনের চলনের অভাব থেকেই দেহের চলন বেরিয়ে আসে। সেখানে আমাদের সীমাহীন চলন। ওদের বেড়িয়ে আসতে বললে ঘুরে আসে, আমাদের ঘুরতে বললে বেড়িয়ে পড়ি। আর বেড়াতে বললেই আমরা ভ্রমণে পা বাড়িয়ে দেই। ওদের বাঁচার সংগ্রাম, আমাদের বিলাসিতার প্রতিযোগিতা। সেখানে আকস্মিক করোনার অদৃশ্য আক্রমণে আমাদের জীবনে বিপর্যয় নেমে এলেও ওদের এন্টেনা খুব বেশি সক্রিয় না হওয়াই দস্তুর। এজন্য ওরা আমাদের সাবধানী মনের চেতাবনির শরিক হতে পারে না নয়, মনে সাড়া পায় না। এজন্য নিরন্তর সচেতনতার প্রয়োজন। পুলিশের ভয়ে ঘরে ঢোকানো গেলেও তাদের মনে নিঃসঙ্গ করা সহজ নয়। ওদের মন যে আমাদের মতো নিঃসঙ্গতায় বেঁচে থাকার টিকা নেয়নি। ওদের মাধ্যমে করোনার ছড়ানোর ভয় না থাকলে আমাদের দরদ কি এভাবে উথলে উঠত? তাদেরকে ছাড়িয়ে ওঠার ব্রত নিয়েই যে আমাদের বেড়ে ওঠা!
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
খুব সুন্দর লাগল।শেষ লাইনটা”….দরদ কি এভাবে উথলে উঠত?”