শিলিগুড়িতে আশি, নব্বই দশক ও বিংশ শতকের প্রথম দিকে ছিল সিনেমা হলের রমরমা ব্যবসা। সিনেমাহলের সংখ্যাটাও ছিল নেহাত কম নয়। সেই সময় ‘পায়েল’, ‘বিশাল’ মানেই জবরদস্ত সিনেমা। সালমান খান অভিনীত ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ বিশাল সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়েছিল। বিখ্যাত এই সিনেমাটি ছিল সেই সময়ে ব্লকবাস্টার হিট। সিনেমা হলের মধ্যে বসে সিনেমা দেখার মজাটাই ছিল আলাদা। কেউ পাঁচবার, কেউ দশবার, কেউ তার থেকেও বেশি সালমান খান, ভাগ্যশ্রী অভিনীত এই সিনেমাটি দেখেছেন। বিশাল সিনেমাতে প্রদর্শিত সিনেমাটি দেখবার জন্য লম্বা লাইন পড়তো, দর্শকরা এতই উৎসাহিত ছিল যে ডবল দাম দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করে সিনেমাটি দেখেছে। ‘বিশাল’ সিনেমা হল-এর নামের সাথে প্রচুর হিন্দি বাংলা ছবির নাম জড়িয়ে রয়েছে। শিলিগুড়িকে ‘বিশাল’ সিনেমা হল একের পর এক ব্লকবাস্টার হিট ছবি দিয়েছে।
তৎকালীন শিলিগুড়ির আমজনতা সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসতেন। সেই কারণে একের পর এক শহরের বুকে গড়ে ওঠে নিউ সিনেমা, বিশাল সিনেমা হল, মেঘদুত, ঊর্বশী, আনন্দলোক, ঝংকার, বিশ্বদীপ, পায়েল, আনন্দলোক। এছাড়া শিলিগুড়ির দীনবন্ধু মঞ্চে প্রদর্শিত হত হরেক কিসিমের সিনেমা, এখনো সিনেমা প্রদর্শিত হয় দীনবন্ধু মঞ্চে। সেই সময় দর্শকরা সিনেমাকে বই বলতো, বই দেখার উৎসাহে তৎপর ছিল দর্শক। পেনড্রাইভ যুগ আসার পর সিনেমা দেখার অভ্যাস হারিয়ে ফেলে মানুষ। শিলিগুড়িতে বন্ধ হয়ে গিয়েছে উর্বসি, মেঘদূত, আনন্দলোক, বিশ্বদীপ, ঝঙ্কার প্রভৃতি সিনেমা হল।
মেটেনি ইভিনিং নাইট শো সিনেমা হল গুলির সামনে থাকতো রমরমা ভিড়। গরমের থেকে মুক্তি পেতে এসি লাগানো পায়েল সিনেমা হলে অনেকেই প্রবেশ করতেন। রবিবার সিনেমা হল গুলোতে টিকিট পাওয়া যেত না, অগত্যা সিনেমা দেখতে হলে ব্ল্যাকে টিকিট কেটে সিনেমা হলে ঢুকতে হত। অনেকেরই পছন্দ ছিল যেকোনো সিনেমাহলের ব্যালকনিতে বসে সিনেমা দেখা, সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখা তৎকালীন সময়ে এক নস্টালজিক ব্যাপার। স্কুলের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখার মজাটাই আলাদা। এখন সবটাই অতীত। অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে শহর শিলিগুড়ি এখন হামাগুড়ি দিয়ে বেঁচে আছে।
আশি-নব্বই দশকে সিনেমা হলে টিকেটের দাম খুবই কম ছিল। সেই কারণে সিনেমা হলের প্রতি আকর্ষণ ছিল মানুষের। অমিতাভ বচ্চন, রাজেশ খান্না থেকে অজয় দেবগন, সানি দেওলের সিনেমাগুলি ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো না দেখলে অনেকেরই পেটের ভাত হজম হত না। সিনেমা আর্টিস্টরা ছিলেন তখনকার দিনে আমজনতার আইডল। সেলুনে গিয়ে নিজের প্রিয় তারকার মতো হেয়ার স্টাইল করতে পারলেই যেন কেল্লাফতে। এছাড়া সিনেমা দেখে বেরোনোর পর সিনেমা হলের পাশের ক্যাসেটের দোকান গুলির থেকে গানের অডিও ক্যাসেট কেনাটা কম্পালসারি ছিল। মানুষের চাওয়া পাওয়া বড়ই সীমিত ছিল সেই সময়। বর্তমান যুগে মনোরঞ্জনের বিভিন্ন জিনিস রয়েছে, তৎকালীন সময়ে মনোরঞ্জনের সেরা উপায় ছিল সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা।
কোন কারনে হিট ছবিগুলি দেখতে না পারলে বন্ধু বান্ধব দের কাছ থেকে গল্প শোনা মাস্ট। এটা যেন সেই সময় এক ট্রেডিশন ছিল। বর্তমানের মত তৎকালীন সময়ে মাল্টিপ্লেক্স ছিল না, এসির হাওয়া খেয়ে সিনেমা দেখার সৌভাগ্য খুব কম মানুষের হয়েছে। ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, স্পেশাল, ব্যালকনি, সোফা এই নামগুলো প্রচলিত ছিল। যাদের পকেট গরম থাকতো তারা ব্যালকনি ও সোফায় বসে সিনেমা দেখতেন। সাধারণদের জন্য ছিল ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস, স্পেশাল। বর্তমান প্রজন্ম কিন্তু পুরোপুরি এই বিষয় থেকে বঞ্চিত।
শিলিগুড়িতে সিনেমা হল গুলোর পাশে বিভিন্ন খাবারের দোকান থাকতো, কোলড্রিংস, ফুচকা, আইসক্রিম, চিপস-সহ আরো অনেক কিছুর দোকান ছিল। এই দোকানগুলো মূলত সিনেমাহলের দর্শকদের উপরই নির্ভরশীল ছিল। শিলিগুড়ির পায়েল, বিশাল হলের আশেপাশের দোকান গুলির রমরমা ব্যবসা ছিল, কারণ এই হল দুটিতে সব সময় হিট ছবি লাগতো। এখন সবটাই ইতিহাস, সময় পাল্টেছে, যুগ পাল্টেছে শুধু রয়ে গেছে স্মৃতিচারণ।