সিন্ধুসভ্যতার কিছু কিছু লোকাচার ও অভ্যাস কালের প্রবাহে হাজার হাজার বছর পরেও সিন্ধু উপত্যকার বর্তমান অধিবাসীদের মধ্যে তার অস্তিত্বের জানান দেয়। সিন্ধের হিন্দুঅধ্যুষিত অঞ্চলে ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার রেওয়াজ আছে। যদিও আঞ্চলিক নাম আলাদা। সিন্ধুসভ্যতা থেকে কিছু চুঁইয়ে আসা পূজাপার্বণ সিন্ধের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখনও বিদ্যমান কিনা তা নিয়ে ইরাবতম মহাদেবন বা আসকো পার্পোলার মতো বিশেষজ্ঞ কোনও কিছু বলে যাননি। যদিও এ বিষয়ে গবেষণার প্রভূত অবকাশ আছে।
ভ্রাতৃত্ব ও ভগ্নিত্বের বন্ধনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উপমহাদেশে এক বিশেষ উৎসবের উদ্ভব হয়েছে, যা আজ বিভিন্ন নামে পরিচিত — “ভাই বীজ”, “ভাই দূজ”, “ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া”, বা বাংলায় “ভাইফোঁটা”। যদিও এই উৎসবটি সমগ্র ভারতবর্ষেই পালিত হয়, তবে সিন্ধ প্রদেশে (বর্তমান পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক অঞ্চল) এর পালন প্রাচীনকাল থেকে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। সিন্ধুর উপত্যকা সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক হিন্দু সমাজ পর্যন্ত এই উৎসব নারীর ভালোবাসা, আশীর্বাদ ও পারিবারিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে আছে।
সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, পারিবারিক মূল্যবোধ ও দেব-দেবীর উপাসনা মানুষের জীবনের কেন্দ্রে ছিল। ভাই বীজ বা ভাতৃ জারা সেই ঐতিহ্যেরই এক প্রতিফলন, যা কেবল ধর্মীয় রীতিই নয়, বরং এক সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুষঙ্গ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
উৎসবের নাম ও অর্থ
“ভাই বীজ” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভ্রাতৃদ্বিতীয়া থেকে — অর্থাৎ দ্বিতীয়া তিথিতে পালিত ভ্রাতার বিষয়ে উৎসব। এই দিনে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে বোন তার ভাইকে আহার করায়, তাকে তিলক দেয় বা ফোঁটা দেয়, এবং তার দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করে। পশ্চিম ভারতে, বিশেষ করে গুজরাট ও সিন্ধ প্রদেশে, এই উৎসবকে বলা হয় “ভাই বীজ” (Bhai Beej), আর সিন্ধি সম্প্রদায় একে “ভাতৃ জারা” বা “ভাতারো জারো” নামেও চেনে।
সিন্ধি ভাষায় “জারা” মানে শুভ দিন বা শুভ অনুষ্ঠান। সেই অর্থে “ভাতৃ জারা” মানে “ভ্রাতার শুভ দিন” — যে দিন বোন তার ভাইয়ের সুরক্ষা ও সুখের জন্য প্রার্থনা করে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
সিন্ধ অঞ্চল ইতিহাসে ভারতের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালেরও আগে গড়ে ওঠা মোহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, চনহু দারো ইত্যাদি শহরে যে সমাজ গড়ে উঠেছিল, তা ছিল পারিবারিক, ধর্মনিষ্ঠ ও উৎসবপ্রিয়। অনেক প্রত্নবস্তু — যেমন মৃৎপাত্রে অঙ্কিত নারী-পুরুষের যুগলচিত্র, ভক্তিপূর্ণ পূজার দৃশ্য বা দেবীর প্রতিমা — ইঙ্গিত দেয় যে, পারিবারিক সম্পর্ককে তারা দেবত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
পণ্ডিতদের মতে, ভাই বীজের প্রাচীন রূপ সম্ভবত সিন্ধুসভ্যতার সময়েই উদ্ভূত। তখন হয়তো এটি ছিল ‘‘ভগ্নী-ভ্রাতৃ পূজা”, যেখানে পরিবারে নারী পুরুষ একে অপরকে মঙ্গলকামনায় আশীর্বাদ দিত। পরবর্তীকালে বৈদিক তথা পৌরাণিক যুগে এই আচার ধর্মীয় রূপ পায়, এবং দেবী যমুনা ও যমের পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে যুক্ত হয়।
পৌরাণিক প্রেক্ষাপট
ভাই বীজের মূল পৌরাণিক কাহিনি হল যম ও যমুনার গল্প। বলা হয়, সূর্য ও সংজ্ঞার সন্তান ছিলেন যম ও যমুনা। একদিন যম তার বোন যমুনার বাড়ি আসেন। যমুনা স্নেহভরে তাকে আহার করান, তিলক দেন এবং তার দীর্ঘায়ুর কামনা করেন। যম এই ভালোবাসায় এতই অভিভূত হন যে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন — “যে ভাই কার্তিক মাসের দ্বিতীয়া তিথিতে তার বোনের আহার গ্রহণ করবে, সে মৃত্যুভয় থেকে মুক্তি পাবে।”
এই কাহিনি সিন্ধ প্রদেশেও প্রচলিত ছিল। সিন্ধি ধর্মগ্রন্থ “ছেচুন্দর মহাত্ম্য” এবং লোককথাগুলিতে যমুনা ও যমের এই উৎসবকে “ভাতারো জারো” নামে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে দেবী যমুনাকে “ভাই রক্ষিকা” বা ভাইয়ের রক্ষাকারিণী দেবী হিসেবে পূজা করা হয়।
সিন্ধি সমাজে উৎসবের রীতি
সিন্ধ প্রদেশে, বিশেষ করে হায়দরাবাদ, সুক্কুর, শিকারপুর, ও করাচি অঞ্চলে হিন্দু সিন্ধিরা আজও ভাই বীজ উৎসব পালন করেন। পাকিস্তানে হিন্দুদের সংখ্যা কমে গেলেও এই ঐতিহ্য পারিবারিক পরিসরে টিকে আছে।
সাধারণত এদিন সকালে নারীরা স্নান করে নতুন পোশাক পরেন। গৃহের দেবালয়ে দেবী লক্ষ্মী, দেবী যমুনা ও গোপাল কৃষ্ণের পূজা করা হয়। তারপর বোন ভাইকে বিশেষ আসনে বসিয়ে তার কপালে ‘লালচন্দনের তিলক বা ফোঁটা” দেয়। এই তিলককে বলা হয় ‘বীজ’, যা থেকেই উৎসবের নাম — ভাই বীজ।
এরপর ভাইকে মিষ্টি খাওয়ানো হয় — প্রথাগতভাবে “মিঠো লাডু”, “সিঁধি কুখুম” (গুড়-ময়দার পিঠা) ও “খীর”। ভাই বোনকে উপহার দেয়, সাধারণত কাপড়, গয়না বা টাকাপয়সা।
সিন্ধি সমাজে এই দিনে ভ্রাতৃ জারা বা ভাতারো জারো পূজা নামেও একটি বিশেষ আচার হয়। এখানে বোন দেবী যমুনার প্রতীক হিসেবে পানপাতায় দুধ ও তিল রাখে, এবং মন্ত্র পাঠ করে বলে —
“যমুনা জি দয়া, ভাইয়া জি আয়ু দীর্ঘ থিয়ে।” অর্থাৎ, “যমুনার কৃপায় ভাইয়ের আয়ু দীর্ঘ হোক।”
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
সিন্ধি সমাজে ভাই বীজ কেবল একটি পারিবারিক উৎসব নয়; এটি এক সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। যেহেতু সিন্ধিরা ঐতিহ্যগতভাবে বণিক ও ভ্রমণপ্রিয় সম্প্রদায়, অনেক ভাই পরিবার থেকে দূরে ব্যবসার কাজে থাকতেন। তাই বছরে একদিন বোনেরা ভাইয়ের জন্য বিশেষ প্রার্থনা করতেন — যেন সে নিরাপদে, সুখে ও সমৃদ্ধিতে থাকে।
এই উৎসব সিন্ধি সমাজে ‘পারিবারিক সংহতি” রক্ষার মাধ্যম হিসেবেও দেখা হয়। সমাজে মেয়েরা বিবাহের পর অন্য বাড়িতে চলে যায়, কিন্তু ভাই বীজের মাধ্যমে তারা তাদের জন্মপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে।
সিন্ধুসভ্যতার প্রত্নপ্রমাণ ও উৎসবের ধারাবাহিকতা
প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে ভাই বীজের মতো উৎসবের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া কঠিন, তবে হরপ্পা ও মোহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া কিছু নিদর্শন ইঙ্গিত দেয় যে, ভাই-বোন বা নারী-পুরুষের পারস্পরিক বন্ধনের প্রতীকী উপাসনা তখনও প্রচলিত ছিল। উদাহরণস্বরূপ —
১. “Mother-Goddess” প্রতিমা : নারী দেবীর পূজা পারিবারিক মঙ্গল ও প্রজননের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
২. যুগল মূর্তি : নারী-পুরুষের যুগল প্রতিরূপে শান্তি ও ঐক্যের প্রতীক পাওয়া যায়।
৩. তিলক চিহ্ন : বহু মৃৎপাত্রে লালচে রঙের বিন্দু বা রেখা দেখা যায়, যা তিলকের আদিম রূপ হতে পারে।
এইসব নিদর্শন প্রমাণ করে যে, ভাই বীজের মতো পারিবারিক উৎসবের মূল সূত্র সিন্ধুসভ্যতার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে নিহিত।
স্বাধীনতার পর ও আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বহু সিন্ধি হিন্দু ভারতে অভিবাসিত হন— বিশেষ করে রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও দিল্লিতে। তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন নিজেদের উৎসব-সংস্কৃতি। আজও ভারতের সিন্ধি সম্প্রদায় ভাই বীজ বা ভাতৃ জারা পালনে অত্যন্ত সক্রিয়।
ভারতের বাইরে, পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশে কিছু হিন্দু পরিবার যেমন হায়দরাবাদ ও থারপারকার অঞ্চলে গোপনে বা সীমিতভাবে উৎসবটি পালন করেন। যদিও সামাজিক চাপ ও সংখ্যালঘুতার কারণে তা প্রকাশ্যে হয় না, তবুও পারিবারিক ঘরে এই ঐতিহ্য জীবন্ত।
ধর্মীয় ও প্রতীকী বিশ্লেষণ
ভাই বীজ উৎসবের প্রতীকী দিক গভীর। এখানে তিলক হলো সুরক্ষা ও সুলক্ষণের চিহ্ন, যা বোন ভাইয়ের কপালে আরোপ করে যেন সে অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পায়। খাদ্যভোজন হলো ভগ্নীস্নেহের প্রতীক, যা পারস্পরিক বিশ্বাস ও আত্মিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
এই উৎসবের মূল বার্তা হল —
সিন্ধি দর্শনে ভাই বীজকে বলা হয় “ধর্ম জি বন্ধন” — অর্থাৎ “ধর্মের বন্ধন”। কারণ এটি পারিবারিক ভালোবাসাকে ধর্মীয় পবিত্রতার সঙ্গে যুক্ত করে।
তুলনামূলক দৃষ্টিতে
ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন বাংলায় “ভাইফোঁটা”, উত্তর ভারতে “ভাই দোজ”, মহারাষ্ট্রে “ভাউ বীজ”, তেমনি সিন্ধ প্রদেশে “ভাতৃ জারা”— সবই এক মূল উৎস থেকে এসেছে। পার্থক্য কেবল ভাষা ও স্থানীয় প্রথার।
তবে সিন্ধি সংস্করণে কিছু অনন্য দিক আছে—
এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো সিন্ধি ধর্মীয় চিন্তার সৌর ও জ্যোতিষ-প্রভাবকেও প্রতিফলিত করে।
সিন্ধ প্রদেশে ভাই বীজ বা ভাতৃ জারা উৎসব কেবল একটি পারিবারিক আচার নয়; এটি সিন্ধু সভ্যতার আদিম সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। হাজার বছর পেরিয়ে আজও এটি ভ্রাতৃস্নেহ, ভগ্নীভক্তি ও পারিবারিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।
যেখানে আধুনিক সমাজ ক্রমে এককতার দিকে ঝুঁকছে, সেখানে এই প্রাচীন উৎসব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় — মানবজীবনের আসল সৌন্দর্য নিহিত সম্পর্কে, ভালোবাসায় ও পারস্পরিক মমতায়।
ভাই বীজের তিলক শুধু কপালে রঙ নয়, এটি এক অনন্ত সূত্র — যা সিন্ধুর প্রাচীন নদীর মতোই অবিরাম বয়ে চলেছে যুগের পর যুগ ধরে।
সিন্ধুসভ্যতার কিছু কিছু সামাজিক উৎসব যে হাজার হাজার বছর পরেও সিপেজ বা চোঁয়ানোর ফলে সিন্ধের বর্তমান সমাজে জানান দিচ্ছে, তার কালচিহ্ন দেখিয়ে দিচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের গবেষকরা নীরব কেন জানি না। তবে সিন্ধের কোনও লেখক বা গবেষক এসব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা করলে আখেরে আমাদেরই লাভ হবে।