দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিশ্লেষণে তিনটি বিষয় প্রায়শই আলোচনায় উঠে আসে—প্রাচীন নগর সভ্যতা, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের কালাত নগরী, স্থানীয় ব্রাহুই ভাষা এবং নিকটবর্তী মেহেরগড় প্রত্নস্থল এই তিনটি মাত্রাকে একটি একক সূত্রে যুক্ত করে। কালাত একদিকে যেমন একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, তেমনি এটি এমন একটি অঞ্চলের নাম যেখানে দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়ভাষী ঐতিহ্যের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাস মিলিত হয়েছে। কালাত শহর, ব্রাহুই ভাষা এবং মেহেরগড় ও সিন্ধু সভ্যতার মধ্যে সম্পর্ককে অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা দরকার।

মেহেরগড়ের মেহের শব্দটি মিহর-এর অপভ্রংশ। মিহর মানে কন্নড় ও মালয়ালমে ‘প্রথম’, তামিলে, মুরু মানে সমগ্র, মিরু এর অর্থ, যা সকলকে অতিক্রম করে। মিহর এর অর্থ, যা সকলকে অতিক্রম করে। আর গড় মানে বসতি বা পরিখা বা কেল্লা। প্রথম জনবসতিকে বলা হত মিহরগড় তথা মেহেরগড়। তাই ব্রাহুইভাষার চিহ্ন যে এখনও সেখানে বিদ্যমান, তা বেশ বোঝা যায়।
কালাত (Kalat) বেলুচিস্তানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি পাহাড়ি শহর, যার উচ্চতা প্রায় ২,০০০ মিটার। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এটি বহু প্রাচীনকাল থেকেই একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নগর হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসে কালাত “কালাত-ই-ব্রাহুই” নামে প্রসিদ্ধ, কারণ এটি ব্রাহুই জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছিল।
মধ্যযুগে কালাত ছিল বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকের রাজধানী। পরে “খানাত-ই-কালাত” (Khanate of Kalat) নামে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যা অষ্টাদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত একটি স্বাধীন বা অর্ধস্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে টিকে ছিল। ফলে কালাত কেবল একটি স্থানীয় নগর নয়, বরং ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক কেন্দ্র।

কালাত অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ব্রাহুই ভাষা। এ ভাষার বিশেষত্ব হলো—ভূগোলের বিচারে এটি বেলুচিস্তানের অন্তর্গত হলেও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে এটি দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। দ্রাবিড় ভাষা সাধারণত দক্ষিণ ভারতে সীমাবদ্ধ (তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম ইত্যাদি), অথচ ব্রাহুই আজও উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে জীবিত।
ভাষাতত্ত্ববিদদের মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। প্রধান দুটি মতবাদ হলো—
১. মাইগ্রেশন থিওরি: কোনো এক সময়ে দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়ভাষী জনগোষ্ঠী উত্তর-পশ্চিমে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে ও শেষ পর্যন্ত এখানে এসে বসতি স্থাপন করে এবং কালাত অঞ্চলে ব্রাহুই ভাষার প্রতিষ্ঠা করে।
২. ইন্ডিজেনাস থিওরি: দ্রাবিড়ভাষীরা মূলত উত্তর-পশ্চিম ভারতে বসবাস করত এবং সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম ভাষা দ্রাবিড় ছিল। পরবর্তীতে আর্য ও অন্যান্য ভাষার প্রভাবে দ্রাবিড় ভাষাগুলি দক্ষিণ ভারতে সরে যায়, কিন্তু ব্রাহুই উত্তর-পশ্চিমে টিকে থাকে। এটি যদিও একটি অপ্রধান তত্ত্ব।
ব্রাহুই ভাষার ধ্বনিগত গঠন, ব্যাকরণ এবং শব্দভাণ্ডার দ্রাবিড় ভাষার সঙ্গে মিল রাখলেও এর মধ্যে পারসিয়ান, পশতু, বেলুচি এবং আরবি প্রভাব প্রবল। বর্তমান সময়ে প্রায় ২৫–৩০ লক্ষ মানুষ ব্রাহুই ভাষায় কথা বলেন, যা মূলত কালাত ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সীমিত।
কালাত শহর থেকে মোটেই দূরে নয়, কোয়েটা ও সিবি শহরের কাছে বোলান গিরিখাতে অবস্থিত এই মেহেরগড় প্রত্নস্থল। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার অনুযায়ী মেহেরগড়ের ইতিহাস প্রায় ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত প্রসারিত। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন কৃষিভিত্তিক গ্রাম হিসেবে বিবেচিত হয়।
মেহেরগড়ের বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো—
মেহেরগড় থেকে প্রাপ্ত উপাদান প্রমাণ করে যে এখানে কৃষি ও গ্রামীণ জীবনধারা বিকশিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সিন্ধু সভ্যতার নগর সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করে। কালাত শহর মেহেরগড়ের নিকটবর্তী হওয়ায় এ অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতি প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই গভীরভাবে যুক্ত।
সিন্ধু সভ্যতা (২৬০০–১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, চানহুদারো, কালিবঙ্গান, রাখিগড়ি, ধোলাভিরা, গণেরিওয়ালা, সুটকাগেনদর, সোতকা-কোহ প্রভৃতি নগরীর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার প্রমাণ করে যে এটি ছিল এক উন্নত নগরসভ্যতা।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো—সিন্ধু সভ্যতার ভাষা। যেহেতু হরপ্পা লিপি এখনো পাঠোদ্ধার হয়নি, গবেষকরা এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তবে অনেক ভাষাবিদ মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতার জনগণ দ্রাবিড়ভাষী ছিল। তাদের যুক্তিগুলি হলো—
অতএব, কালাত অঞ্চলে ব্রাহুই ভাষার অস্তিত্ব মেহেরগড় ও সিন্ধু সভ্যতার দ্রাবিড়ভাষী তত্ত্বকে শক্তিশালী করে।

মেহেরগড় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে প্রাপ্ত মূর্তিসমূহ
কালাত শহর ও ব্রাহুই জনগোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার এক অনন্য উদাহরণ। যেখানে সিন্ধু সভ্যতার নগর ধ্বংসাবশেষ ইতিহাসের অন্তরালে বিলীন হয়েছে, সেখানে একটি ভাষা এখনো জীবিত থেকে আমাদের প্রাচীন অতীতের সেতুবন্ধন ঘটাচ্ছে।
ব্রাহুই ভাষার মধ্যে যেমন দ্রাবিড় বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ আছে, তেমনি এটি পার্শ্ববর্তী ইরানি ও তুর্কি ভাষার প্রভাবও শরীরে ধারণ করেছে। এ কারণে এটি “লিঙ্গুইস্টিক আইল্যান্ড” বা ভাষাগত দ্বীপ হিসেবে পরিচিত—অর্থাৎ এমন একটি প্রাচীন ভাষা, যা বহিরাগত ভাষার সমুদ্রে ঘেরা থেকেও এখনও টিকে আছে।
কালাত ও ব্রাহুই ভাষা নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব নিম্নলিখিত কারণে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক—
১. ভাষাতত্ত্ব : দ্রাবিড় ভাষার বিস্তার ও ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে ব্রাহুই একটি মূল চাবিকাঠি।
২. প্রত্নতত্ত্ব : মেহেরগড় থেকে সিন্ধু সভ্যতার বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে কালাত অঞ্চলের অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
৩. সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব : ব্রাহুই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, লোককাহিনি ও জীবনধারা প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে।
কালাত শহর, ব্রাহুই ভাষা এবং মেহেরগড় ও সিন্ধু সভ্যতার যোগসূত্র আমাদের ইতিহাসচর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। কালাত শুধু একটি পাহাড়ি নগর নয়, বরং এটি হলো সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ধারক। ব্রাহুই ভাষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ মাটির নিচে লুকিয়ে থাকলেও ভাষা কখনো কখনো হাজার হাজার বছর পেরিয়ে জীবন্ত থেকে যায়। আর মেহেরগড় প্রত্নস্থল প্রমাণ করে যে ব্রাহুই জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এই অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি ও নগর সংস্কৃতির সূতিকাগার।

অতএব, কালাত ও ব্রাহুই ভাষাকে আমরা যদি মেহেরগড় ও সিন্ধু সভ্যতার প্রেক্ষাপটে দেখি, তবে এটি আমাদের কাছে প্রমাণ করে—সভ্যতা কেবল পাথরের দেয়াল নয়, বরং মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে অমর হয়ে থাকে।সিন্ধুসভ্যতা তথা হরপ্পাসভ্যতা প্রোটোদ্রাবিড়ীয় জনগোষ্ঠী-অধ্যুষিত ছিল বলে আমার ধারণা। প্রাকহরপ্পা মেহেরগড় সভ্যতাও যে প্রোটোদ্রাবিড়ীয়, কালাত শহরের অবস্থানই সেটি প্রমাণ করছে। কালাত শহরে এখনও সবচেয়ে বেশি চলে ব্রাহুই নামক প্রোটোদ্রাবিড়ীয় ভাষা। কালাতই হল সিন্ধুসভ্যতা ও মেহেরগড় সভ্যতার কমন ফ্যাক্টর। ব্রাহুই জনগোষ্ঠী যে মেহেরগড় এর আদি ভূমিপুত্র ছিল, পরে সিন্ধুসভ্যতায় তারাই ছিল প্রধান অধিবাসী, তা বোঝাই যায়। রেট্রোগ্রেড ইস্ট্রোস্পেকশনে এটাই প্রমাণিত হয়, প্রোটোদ্রাবিড়ীয় ব্রাহুইভাষী জনগোষ্ঠী মেহেরগড় সভ্যতার পতনের পরে সিন্ধুসভ্যতার যুগেও টিকে গিয়েছিল। এখনও চলেছে ব্রাহুইভাষার আবহমান ধারা। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিয়াছে।