রোগবালাই সংক্রান্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগুলির সীমাবদ্ধতার কারণেই অতিমারির বিরুদ্ধে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া যাচ্ছে না। অতিমারি পৃথিবীতে এই প্রথম নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ২০০২-৪ সার্স দেখেছি আমরা। তবুও তার ১৫ বছর পর করোনার সময় আমরা যাকে বলে ল্যাজেগোবরে হয়ে গেলাম স্রেফ সময়মত উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিতে পারার কারণেই। ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ লন্ডনের একটা গবেষণায় জানা গেছে বেশিরভাগ সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাতেই এই সীমাবদ্ধতা প্রকট। এই সমস্যা দূর করতে না পারলে সতর্কতা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র করা যাবেনা। কাজেই সমস্যা থেকে যাবে।
ইউসিএল-এর গবেষণায় জানা যাচ্ছে ৩৮টি রোগ প্রতিরোধ সতর্কতা ব্যবস্থার মধ্যে ৩৩টিতেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পশুপাখি বা মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ব্যাপারে তারা কোন আগাম আভাস দিতে পারেনা। কারণ গোটা ব্যবস্থাটা একান্তই প্রযুক্তি নির্ভর। রোগজীবাণু চিহ্নিত করার ব্যাপারে প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে একটা বড় ব্যাপার। কিন্তু চিহ্নিত করা মানেই রোগ প্রতিরোধ করে ফেলা নয়। একাজ প্রযুক্তি দিয়ে হয়না। এক্ষেত্রে মানুষের সতর্কতা ও সংঘবদ্ধতা একটা বড় ব্যাপার। মানুষ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সংক্রমণ মোকাবিলায় কত আগে থেকে ব্যবস্থা নিতে পারছে সেটা একটা বড় ব্যাপার।

সার্স এবং কোভিড-১৯কে আগেই চিহ্নিত করা গিয়েছিল। কিন্তু চিন থেকে শুরু করে বহু সরকার ব্যাপারটাকে কোন গুরুত্বই দেয়নি। ভূ-রাজনীতি ও নানা অর্থনৈতিক কারণে চিন থেকে শুরু করে পৃথিবীর বহু দেশের সরকার সংক্রমণের ব্যাপকতা গোপন করে দায়মুক্ত হতে চেয়েছে। মৃত্যু ও সংক্রমণের খবর চাপা দিয়ে বা লঘু করে দেখিয়ে তারা ভেবেছিলেন অবস্থা সামাল দেওয়া যাবে। কিন্তু পরবর্তীকালে মৃত্যুমিছিল দেখে তারা হকচকিয়ে গেছেন। ২০০৯ এর H1N1, বার্ড ফ্লু, ২০১৩তে পশ্চিম আফ্রিকাতে ইবোলা এবং ২০১৫র জাইকা সবক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। খবর আগে পাওয়া গেলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মানুষকে প্রস্তুত করা যায়নি। মানুষকে বোঝানো যায়নি কি কি কারণে এটা ঘটছে, কীভাবে এই সংক্রমণ আটকানো যেতে পারে। পরিবেশ দূষণ, গবাদি পশু থেকে সংক্রমণ, বেআইনি পশুপাখি বাণিজ্য, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গাফিলতি ইত্যাদি যেসব ছিদ্র পথে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকছে এগুলি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা যায়নি বলে বহু মানুষ কালরোগের শিকার হয়েছে।

এক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড এপিডেমোলজিক নেটওয়ার্ক খুব ভালো কাজ করছে। তাদের গবেষণার শিক্ষা ইউরোপের বহু দেশে অতিমারির ব্যাপকতা কমিয়েছে। পরিবেশ দূষণ যে রোগ ছড়ানোর একটা বড় শর্ত হয়ে ওঠে তারা তা দেখিয়েছে। মোদ্দা কথা হল, শুধু ওষুধ বা চিকিৎসা নয়, অতিমারি রুখতে হলে একটা সংহত সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জনস্বাস্থ্য, সম্প্রদায়গত স্বাস্থ্য, প্রাণী স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য রক্ষার কাজকে একসূত্রে না বাঁধলে তা সম্ভব নয়। এটা একটা সবসময়ের কাজ। প্রতিটি মানুষ ও সরকার এবং আমলাতন্ত্রের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া এক্ষেত্রে সাফল্য সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে মেশিনের থেকেও বড় মানুষ। তাদের সতর্কতাই ঠেকাতে ও দূর করতে পারে রোগ।