ওষুধ মানেই আবশ্যকীয়। কিন্তু সেই ওষুধ নিয়ে আমাদের ধ্যান ধারণা মোটেও স্পষ্ট নয়। আমরা পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসের দাম বা সে সবের দাম বৃদ্ধি নিয়ে যতটা সোচ্চার, ওষুধের দাম বা সেই দাম কতটা কিভাবে বাড়ছে সে বিষয়ে আমরা প্রায় কোনও খোঁজ খবরই রাখিনা। কেবল ওষুধের দামই নয় — ডাইগোনিস্টিক/প্যাথলজিক্যাল টেস্ট থেকে শুরু করে ডাক্তারবাবুদের ফিস এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত নানাবিধ খরচাপাতি গত কয়েক বছরে যে প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% বেড়েছে সে বিষয়েও ওয়াকিবহাল নই। অন্যদিকে আমাদের দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারীরা এতটাই শক্তিশালী যে ওষুধ এবং চিকিৎসার আনুষঙ্গিক মূল্য নির্ধারণে সরকারী ন্যায় নীতি থাকা স্বত্বেও তাদের অদৃশ্য হাতই কাজ করে।
ওষুধের ব্যবসায় কেবল প্রস্তুতকারী সংস্থা নয়, জড়িত আছেন উৎপাদনকারী, হোলসেলার ও রিটেলারও। আর সেই ব্যবসায় ঘুরছে ১৩৬ লক্ষ কোটি টাকা (১.৩৬ ট্রিলিয়ন)। ব্যবসাটি যে অত্যন্ত লাভজনক তা বিষদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না। তবে সমস্ত ওষুধের মধ্যে অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ বা essential medicine ও ততটা প্রয়োজনীয় নয় বা non-essential ওষুধের তালিকা তৈরি করে সরকার। অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের ক্ষেত্রে ১৬% রিটেল মার্জিন ঠিক করা হলেও অন্য ওষুধের বেলায় তার হিসাব থাকে না। কেমিক্যাল ও ফার্টিলাইজার দপ্তরের অধীন NPPA সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে ওষুধের দাম নির্ধারণ করে। কিন্তু স্বাস্থ্য ও ওষুধের প্রয়োজনীয়তা ঠিক কতটা সে বিষয়ে তাদের ধ্যান ধারণা কতটা স্পষ্ট সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাছাড়া সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কতটুকু, তা যাচাই করারই যে কোনও ব্যবস্থা নেই।
কোন কোন ওষুধ প্রয়োজনীয় তা বিবেচিত হয় নীতি আয়োগের সুপারিশে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিক কি দামে সাধারণ মানুষের কাছে ওষুধগুলি পোঁছাচ্ছে তা দেখছে কে? সেটা দেখার তো কেউ নেই। নেই বলেই ওষুধে ডিসকাউন্ট এই গালভরা কথাটি হয়ে গিয়েছে প্রহসন। আমরা কি জানি বুঝি বেসরকারি হাসপাতালগুলির হাতে ওষুদ পৌঁছানোর পর কি মূল্যে ওরা আমাদের হাতে বিল ধরায়। সারা দুনিয়া জানে যে আমাদের দেশের ২০% ওষুধ জাল। আমরা কত নিষিদ্ধ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ যে খেয়ে যাচ্ছি তারও হিসেব নেই। কারণ মেয়াদ উত্তীর্ণ বা Expired ওষুধ দেখারও যে কেউ নেই। ওষুধ ও তা তৈরি করার দ্রব্যে গুলির গুণগত মান বিচার করার ব্যবস্থা কি? সেও তো প্রায় নেই বললেই চলে। অর্থাৎ ভেজালের স্বর্গরাজ্যে এ দেশের ভেজালকারীরা সম্পূর্ণ স্বাধীন। তাই ভেজাল ওষুধ ২০% কেন, হয়তো আরও বেশী।
ওষুধ ব্যবসার এই স্বর্গরাজ্যে গত ২৫ মার্চ জাতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথোরিটি জানায় নতুন আর্থিক বছরে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বাড়তে চলেছে। এই প্রয়োজনীয় ওষুধের মধ্যে রয়েছে ব্যথানাশক, অ্যান্টিইনফেক্টিভস, কার্ডিয়াক ওষুধ এবং অ্যান্টিবায়োটিক-সহ অন্যান্য ওষুধ। ৩৮৪টি মলিকিউলের দাম, যা প্রায় ২৭টি থেরাপির ৯০০ ফরমুলেশনের সঙ্গে মিলে যায় তাঁর দাম ১২ শতাংশের বেশি বাড়ছে। গত বছর জাতীয় ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথোরিটি পাইকারি মূল্যসূচকে ১০.৭ শতাংশ পরিবর্তন করেছিল। এ বছর বাড়লো ১২ শতাংশ। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের বক্তব্য, যাতে বাজারে ওষুধের ঘাটতি না হয় এবং প্রস্তুতকারীরা ও ভোক্তারা যাতে উপকৃত হয়, তা মাথায় রেখেই মূল্যবৃদ্ধি।
তার মানে দেশে প্রয়োজনীয় ওষুধের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার চেয়েও ওষুধ প্রস্তুতকারীদের লাভ নিশ্চিত করাটা জরুরী। কিন্তু সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতা নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। অথচ তা নিশ্চিত করতেই ওষুধের দাম একটি নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে বাড়ানোর কথা। অতএব এই ধরনের মূল্যসূচকের বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণকে অব্যবস্থায় পরিণত করে। এই হারে অপরিহার্য ওষুধের মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্য যে স্রেফ প্রস্তুতকারী সহ হোলসেলার ও রিটেলারদের সবার্থে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া এই দাম বৃদ্ধির হার খুবই কম হয়। গত কয়েক বছরে এই বৃদ্ধির হার ১ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে থাকতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু এবার প্রয়োজনীয় বা জীবনদায়ী ওষুধের দাম একধাক্কায় ১২ শতাংশ। ওষুধের বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত এটাই সর্বোচ্চ হার। এমনিতেই আধুনিক জীবনযাত্রায় সাধারণ মানুষের রোগের প্রকোপ যে ভাবে দিনে দিনে বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষকে আরও সমস্যায় পড়তে হবে।