ভোট দেওয়ার পর আঙুলে কালির দাগ লাগিয়ে একটি সেলফি! আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই “কালি-সেলফি” নিছক একটি ছবি নয়, বরং এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের প্রতীক।
ভোট দিতে গিয়ে বাঁ হাতের তর্জনীর উপর কালি লাগানোর প্রথা দীর্ঘ বছরের।একে সবাই ‘ভোটের কালি’ বলে চিনলেও এর আসল নাম ‘ইনডেলিবল ইঙ্ক’। অর্থাৎ, যে কালি সহজে বদলে ফেলা যায় না, মুছে ফেলা যায় না।অনেক রহস্যে মোড়া এই ‘কালি-কথা’। আজ বলবো তারই গল্প।
১৯৫০-এর দশকে, ভারতের নির্বাচন কমিশন একাধিক ভোটদান ও জালিয়াতি রোধ করার জন্য একটি সমাধান খুঁজছিল। এরই ফলস্বরূপ জন্ম হয় ‘ইনডেলিবল ইঙ্ক’ এর।ভোটের কারচুপি বন্ধ করতে, ভোটারদের বাঁ হাতের তর্জনীতে এই কালি লাগানোর নিয়ম চালু করা হয় ১৯৬২ সালে দেশে তৃতীয় লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকে। গত ৬৪ বছর ধরে কালি লাগানোর নিয়ম পরিবর্তন হলেও কালি কিন্তু বদলায়নি।
এই কালি খোলাবাজারে পাওয়া যায় না।

মহীশূর পেইন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড (এমপিভিএল) এই কালির একমাত্র প্রস্তুতকারক।কোম্পানিটি ১৯৩৭ সালে মহীশূরের মহারাজা নলওয়াদি কৃষ্ণরাজা ওয়াদিয়ার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কালির ফর্মুলা ভারতের ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরির সহযোগিতায় তৈরি করা হয়েছিল। অতি গুরুত্বপূর্ণ গোপন সেই ফর্মুলা আজও গোপনীয় রাখা হয়েছে।
বছর পাঁচেক আগে এমপিভিএলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. চন্দ্রশেখর ডোড্ডামনি ব্রিটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকাকে জানিয়েছিলেন, ওই কালি বানানোর গোপন ফর্মুলা এমন কী তারও জানা নেই! MPVL-এর মাত্র দুজন কেমিস্ট (রসায়নবিদ) এই কালির সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা জানেন। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার স্বার্থে এই ফর্মুলা অত্যন্ত সুরক্ষিত রাখা হয়। এমনকি কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টরও এই ফর্মুলা জানেন না।ফর্মুলাটি গোপন রাখা হয় যাতে কেউ নকল কালি তৈরি করতে না পারে বা কালিটি মুছে ফেলার উপায় বের করতে না পারে।ওই দুজন কেমিস্ট যখন অবসর নেন, তখন তারা তাদের উত্তরসূরিদের এই গোপন ফর্মুলা শিখিয়ে দিয়ে যান।

১৯৪৭ সালে এমপিভিএল পাবলিক সেক্টর কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয় এবং ১৯৮৯ সালে এর নাম পরিবর্তিত হয়ে “মাইসোর পেইন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড” (MPVL) হয়। এটি শুধুমাত্র একটি লাভজনক সংস্থাই নয়, ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ভারত-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে (থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া ইত্যাদি আরও ২৫টি দেশে) নির্বাচনের সময় ভোটারদের আঙুলে যে কালি লাগানো হয়, তা এই কোম্পানি উৎপাদন করে। নির্বাচনের জন্য অমোচনীয় কালি ছাড়াও, কোম্পানিটি বিভিন্ন ধরণের পেইন্ট, এনামেল, প্রাইমার, ডিস্টেম্পার, এবং বার্নিশ তৈরি করে।
১৯৫১ সালের ১৯শে জুলাই ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রধান নির্বাচনী আইন ‘জনপ্রতিনিধিত্ব বিল’-এ সম্মতি দিয়েছিলেন।” (মেনন, এনডি) ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের জন্য ভারত সরকার ১,৮৪,৪০০ টাকায় প্রায় ৩,১৬,০০০ শিশি অমোচনীয় কালি ক্রয় করেছিল।
১৯৬২ সালে নির্বাচন কমিশন, আইন মন্ত্রণালয়, ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি এবং ন্যাশনাল রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন নির্বাচনের জন্য রং সরবরাহ করতে মহীশূর পেইন্টসের সাথে একটি চুক্তি করে। এই অমোচনীয় কালিতে সিলভার নাইট্রেট থাকে। সিলভার নাইট্রেটের পরিমাণ যত বেশি হয়, কালির গুণমান তত উন্নত হয় এবং ফলস্বরূপ, কালির স্থায়িত্বও তত বেশি হয়। কালি দ্রুত শুকানোর জন্য এতে একটি অ্যালকোহল-ভিত্তিক দ্রাবকও থাকে। যখন সিলভার নাইট্রেট মানুষের ত্বকের সংস্পর্শে আসে, তখন এটি সিলভার ক্লোরাইডে রূপান্তরিত হয়, এই প্রক্রিয়ায় এর রঙও বদলে যায় এবং এটি আঙুল, কিউটিকল ও নখের প্রোটিনের মধ্যে জমা হতে থাকে।

সিলভার ক্লোরাইড আলোকসংবেদী (photosensitive)। সূর্যের আলো বা অতিবেগুনী (UV) রশ্মির সংস্পর্শে এলে সিলভার ক্লোরাইড ভেঙে গিয়ে বিশুদ্ধ সিলভার ধাতু (\(Ag\)) তৈরি করে, যা কালো বা গাঢ় ধূসর বর্ণের হয়। এ কথা ভাবলে, প্রত্যেক ভারতীয় ভোটার তাদের মূল্যবান ভোট দেওয়ার জন্য প্রায় দশ লক্ষ সিলভার পরমাণু পান!
এই সিলভার কণাগুলো ত্বকের প্রোটিনের সাথে শক্তভাবে আটকে থাকে, যা সাবান বা জল দিয়ে সহজে তোলা যায় না। ত্বকের উপরের চামড়ার কোষগুলো যতক্ষণ না নতুন কোষে পরিবর্তিত হয়, ততক্ষণ এই দাগ থেকে যায়। ভোটারদের আঙুলে (সাধারণত বাম হাতের তর্জনী) নখের গোড়া থেকে চামড়া পর্যন্ত এই কালি দেওয়া হয়, যাতে একজন ব্যক্তি দুইবার ভোট দিতে না পারেন। একটি ১০ মিলি কালির বোতল দিয়ে প্রায় ৭০০ জনের আঙুলের ছাপ দেওয়া যায়।
কালিটি আলোক-সংবেদনশীল এবং এটিকে সরাসরি সূর্যালোকের সংস্পর্শ থেকে রক্ষা করতে হয়। পূর্বে এটি বাদামী কাচের বোতলে সংরক্ষণ করা হতো, বর্তমানে এটি অ্যাম্বার রঙের প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা হয়।
এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা জর্জ ইস্টম্যান তার ফটোগ্রাফিক কোম্পানি — দ্য ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি, ইউএস-এর জন্য যা আবিষ্কার করেছিলেন, তার মতোই। ভোট দেওয়ার পর আপনার নখে লেগে থাকা কালো অবশিষ্ট কালি অনেকটা সাদা-কালো নেগেটিভ প্রিন্টের মতোই।

প্রয়োগ পদ্ধতি দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে নির্বাচনে স্থায়ী কালি ব্যবহারের গুরুত্ব ও ধারণাটি একই থাকে। ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং মালদ্বীপে ভোটারদের একটি বোতলে আঙুল ডুবিয়ে কালি লাগাতে হয়, অন্যদিকে তুরস্কে ভোটারদের কালি লাগানোর জন্য নজল ব্যবহার করা হয়।
হাতে কালি লাগানোর গুরুত্ব ছোটগুলোও বোঝে। আগে ভোট দিতে যাওয়ার সময় সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে যেতাম। আমার সাথে সাথে ছেলেও হাতে কালি লাগিয়ে আসতো। কালি লাগানোর পর তার খুব আনন্দ হতো। জানিয়ে রাখি, পালস পোলিও টিকাপ্রাপক খুদেদের হাতে দেওয়া ‘ইনডেলিবল ইঙ্ক’ (Indelible Ink) বা অমোচনীয় কালি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটের কালির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যদিও দুটি কালির প্রস্তুতকারক একই — কর্ণাটক সরকারের অধীনস্থ ‘মাইসোর পেন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড’ (MPVL)।
ইনডেলিবল ইঙ্ক বা অমোচনীয় কালি শুধু একটি কালি নয় — এটি ভোটাধিকার সুরক্ষার একটি কার্যকর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ভোটাররা যখন ভোট দিয়ে বের হন, তখন এই কালি তাদের নাগরিক দায়িত্ব পালনের একটি দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। এটি সচেতনতা বাড়ায় এবং অন্যান্যদেরও ভোট দিতে উৎসাহিত করে।এই কালির দাগটি হলো দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয় এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের গ্যারান্টি।
সূত্র: প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো, নির্বাচন কমিশন, ভারত সরকারের পক্ষে।
অসাধারণ একটি প্রতিবেদন তুলে ধরলেন আপনার লেখার মাধ্যমে।ধন্যবাদ আপনাকে এই না জানা তথ্য জানবার জন্য।