আজ ১৫ মার্চ…গতকাল ছিল ১৪ই মার্চ। কুড়ি বছর আগে আজকের দিনে ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন যুগ শুরু হয়েছিল। কুড়িটা বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল।
কি ঘটেছিল ২০০১ সালের মার্চ মাসের ১৪ তারিখে?
ক্রিকেটের সমঝদাররা ব্যাটিং নিয়ে কথা বলার সময় প্রায়শই দুটো কথা উচ্চারণ করেন। প্রথমটা হল “টেকনিক”। মাথা নিচু, কনুই উপরের দিকে, ব্যাট আর প্যাডের মধ্যে কোনো গ্যাপ নেই, ব্যাট একদম সোজা, টাইমিং…ইত্যাদি। অপর কথাটা হল “ক্লাস” বা “এলিগ্যান্স”…যার সঙ্গে টেকনিকের খুব একটা সম্পর্ক নেই, কিন্তু যা দর্শকদের কাছে অতীব দৃষ্টিনন্দন…যা দেখতে দর্শকরা মাঠে আসেন।
এই “টেকনিক” এবং “এলিগ্যান্স” যেদিন একসঙ্গে সুপ্রিম ফর্মে থাকে সেদিন বাইশ গজে ইতিহাস লেখা হয়…কিংবদন্তিদের জন্ম হয়। ২০০১ সালের ১৪ই মার্চ এমনই এক ইতিহাস লেখা হয়েছিল ইডেনের মাটিতে। “টেকনিক” এর রাজা রাহুল দ্রাবিড় এবং “এলিগ্যান্স” এর বাদশা ভি ভি এস লক্ষণের ৩৭৫ রানের পার্টনারশিপ এই দিনেই ঘটেছিল।

মার্চের গরমে, ম্যাচ এবং সিরিজে নিশ্চিত হারের মুখে দাঁড়িয়ে, ম্যাকগ্রা, গিলেসপি, ওয়ার্নদের বোলিং আক্রমণ সামলে প্রায় ৩৭৫ রানের পার্টনারশিপ বানিয়ে, টেস্টের চতুর্থ দিনে সারাটা দিন ইডেনের বাইশ গজ আঁকড়ে পড়েছিলেন দ্রাবিড় এবং লক্ষ্মণ। সেইদিনের গ্যালারির ঘটনাবলী আজ স্মৃতিতে অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে…কারণ দুচোখ ভরে ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের দুই কিংবদন্তী ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং দেখতেই আমি ব্যস্ত ছিলাম।
আগের দিন… প্রথম ইনিংসে ব্যার্থতার জন্য মিডিয়া রাহুল সম্বন্ধে লিখেছিলো, “রাহুল কি আদেও ভারতীয় দলের তিন নম্বর জায়গাটার যোগ্য?” এইদিন সেঞ্চুরী করবার পর রাহুল স্বভাববিরুদ্ধভাবে এক হাতে হেলমেট এবং অপরহাতে ব্যাট নিয়ে উদ্ধত ইশারা করেন ক্লাব হাউসের উপরে প্রেস বক্সের দিকে …একবার… দুবার… তিনবার… “আমিই রাহুল দ্রাবিড়, ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমের তিন নম্বর ব্যাটসম্যান…এটাই আমার জায়গা।” নিচে রাহুলের একক ছবিটি এই সেঞ্চুরির ঠিক পরের ছবি। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থেকে অমানুষিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যখন সাফল্য আসে, যখন সমালোচনার জবাব দেওয়া যায়, তখন এই ধরণের শিশুর মতো হাসি মুখে ফুটে ওঠে। ছবিটি আমার অত্যন্ত প্রিয়।

উল্টোদিকে লক্ষ্মণ…আমি জানিনা, ওই অতিমানবিক ব্যাটিংয়ের জন্য কোন বিশেষণটি সবচাইতে বেশি উপযুক্ত। “এফোর্টলেস”, “এলিগ্যান্ট”, “ম্যাজেস্টিক”…কোনটা? শেন ওয়ার্ন বল ফেললেন লেগ স্টাম্পের খান পাঁচেক স্টাম্প বাইরের রাফে…লক্ষ্মণ স্টেপ আউট করে “এগেনস্ট দ্য স্পিন” মিড উইকেট ড্রাইভ মারলেন…বাউন্ডারি! ওয়ার্নের গালাগালির উত্তরে মিষ্টি হাসি দিয়ে ঠিক পরের বলেই অবিকল এক ডেলিভারিতে স্টেপ আউট করে “উইথ দ্য স্পিন” কভার ড্রাইভ মারলেন…আবার বাউন্ডারি! এরপর দেখা গেল, লক্ষ্মণের ব্যাটিং দেখে গিলক্রিস্ট এবং ওয়ার্ন হাততালি দিচ্ছেন…আবার তাঁদের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্মণের মিষ্টি হাসি!
দিনের শেষে অপরাজিত থেকে যখন দুজনে প্যাভিলিয়নে ফিরছেন, নীচের একটি ছবি ঠিক তখনকার। দুজনের হাসি হাসি মুখ…সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর টিমকে টেনে তোলার আনন্দ, টিম এবং দেশের হার বাঁচানোর আনন্দ। এই ছবিটি ইডেনের ক্লাব হাউসের বাইরে দীর্ঘদিন ঝোলানো ছিলো…এখন আছে কি না জানি না। অনেকে অনেক মোটিভেশনাল ভিডিও দেখে নিজেকে উদ্বুদ্ধ করেন। এই পার্টনারশিপের ভিডিও আমার ডেস্কটপ, ল্যাপটপ এবং মোবাইলে রাখা আছে…এটাই আমার একমাত্র মোটিভেশনাল ভিডিও।
কিছুদিন পরে এক সাংবাদিক গিলক্রিস্টকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, দ্রাবিড় ও লক্ষণকে আউট করবার জন্য তাঁর মাথায় কোনো প্ল্যান ঘুরছিল কি না? উত্তরে তিনি বলেন, “কোনো মানুষ ব্যাট করলে প্ল্যান করে তাঁকে আউট করা যায়। কিন্তু যখন কেউ অতিমানবিক ব্যাটিং করেন …তখন তাঁর ব্যাটিং দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকে না।” একই প্রশ্নের উত্তরে স্টিভ ওয় বলেন, “ওই পার্টনারশিপ ভাঙ্গার জন্য একটি বলের দরকার ছিলো…দুঃখের বিষয় সারাদিন ধরে ওই বলটা আসেনি।”
কিছুদিন আগে ইউ টিউবে স্টিভ ওয়’র একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম। লক্ষণ-দ্রাবিড়ের ওই পার্টনারশিপের কথা উঠলে স্টিভ বললেন, “ওই অতিমানবিক ব্যাটিং দেখতে অনেক মাইল হেঁটে যাওয়া যায়। আমার দুর্ভাগ্য যে সেদিন আমি মাঠে ছিলাম অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হিসাবে…তাই ওই ব্যাটিং আমি উপভোগ করতে পারিনি। কিন্তু এর পরে যতবার আমি ওই পার্টনারশিপের ভিডিও দেখেছি…ততবার মনে হয়েছে যে টেস্ট ক্রিকেটের এই শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞাপন এটা”।
২০০১ সালের ১৫ মার্চ। কি ঘটেছিল সেদিন?
১৪ মার্চ অর্থাৎ চতুর্থ দিন খেলার শেষে সাংবাদিকরা হরভজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “হাতে জেতার মতো রান রয়েছে। আপনার কি মনে হয় যে আপনি টিমকে জেতাতে পারবেন?” হরভজন তখন নবাগত…মাত্র উনিশ বছর বয়সের যুবক। তিনি উত্তর দেন, “আমার তিনটে বোনের বিয়ে বাকি। কাল জেতাতে পারলে বোর্ড কিছু বেশি টাকা দেবে আশা করি। তাহলে সহজেই বোনদের বিয়ে দিতে পারবো। কাল চেষ্টার কোনো ত্রুটি থাকবে না।”
পরদিন অর্থাৎ ১৫ই মার্চ ‘টার্বুনেটর’ হরভজনের স্পিনের জালে আটকে গেলো অস্ট্রেলিয়া। টি-ব্রেক অবধি অস্ট্রেলিয়ার মাত্র একটি উইকেট পড়েছিল…ব্রেকের পর একের পর এক উইকেট পড়তে লাগলো। হরভজনের উল্টো দিক থেকে যোগ্য সঙ্গত করলেন শচীন…বল হাতে তিনটে উইকেট তুলে নিয়ে। শেষ উইকেটে ক্রিজে ছিলেন ম্যাকগ্রা এবং ক্যাসপ্রোভিচ। খেলার মাত্র চার ওভার বাকি থাকতে হরভজনের বল ইনটেনশনাল প্যাড আপ করলেন ম্যাকগ্রা। গোটা ইডেনের এল বি ডব্লুর আবেদনে আম্পায়ারের আঙ্গুল তোলার পরমুহূর্তের তোলা ছবি হলো নীচের সৌরভ এবং হরভজনের ছবিটি…এই ছবিটা পরদিন আনন্দবাজারের সামনের পাতা জুড়ে ছাপা হয়েছিল।

কলকাতার মাটিতে আটকে গিয়েছিল স্টিভের অশ্বমেধের ঘোড়া। কলকাতা টেস্ট তিনি হারলেন…চেন্নাইতে তৃতীয় টেস্ট তিনি হারলেন দুই উইকেটে…’ফাইনাল ফ্রন্টিয়ারে’ আটকে গেলেন তিনি…ভারত থেকে সিরিজ জিতে ফেরা আর হলো না তাঁর।
ইডেন টেস্ট জেতার পরে আমি গ্যালারিতে দর্শক এবং পুলিশকে একসঙ্গে নাচতে দেখেছিলাম। অনেক দর্শককে আনন্দে কাঁদতে দেখেছিলাম। পিচের উপর সেদিন সমস্ত ভারতীয় খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ান স্টাইলে নাচেন…ইডেনের ড্রেসিংরুমে শচীন, সৌরভ এবং রাহুল শ্যাম্পেনের বোতল খোলেন…এই ভিডিও অনেক রাত অবধি টিভিতে সম্প্রচার করা হয়েছিল। রিচি বেনো বলেছিলেন, “সৌরভের এই আগ্রাসী মনোভাব খুব শীঘ্রই ভারতীয় ক্রিকেটের খোলনলচে বদলে ফেলবে।” গাভাস্কার বলেছিলেন, “ভারতীয় ক্রিকেট নতুন যুগে প্রবেশ করলো…আগের যুগটি ছিলো “বিফোর সৌরভ গাঙ্গুলি”…নতুন যুগটি হলো “আফটার সৌরভ গাঙ্গুলি”।

ম্যান অফ দ্য ম্যাচ বাছাইয়ের সময় ম্যাচ রেফারির মন্তব্য খুব ভালো লেগেছিল। তিনি বলেছিলেন, “আমি বুঝতে পারছিলাম না যে ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার কার প্রাপ্য? ২৮১ রান করা লক্ষণের না কি ম্যাচে ১৩ উইকেট নেওয়া হরভজনের? তারপরে মনে হল, লক্ষণের ২৮১ রানটাই তো হরভজনকে দ্বিতীয় ইনিংসে বল করবার সুযোগ দিলো। সুতরাং ম্যান অফ দ্য ম্যাচের যোগ্য দাবিদার লক্ষণই”।
কোনটা ভারতের শ্ৰেষ্ঠ টেস্ট জয়…২০০১ এর ইডেন, ২০২১-এর ব্রিসবেন…না কি অন্য কোনো ম্যাচ…এই নিয়ে চিরকাল বিতর্ক থাকবে। আমি যেটুকু ক্রিকেট বুঝি, চতুর্থ দিনের ভাঙ্গা উইকেটে ম্যাকগ্রা, গিলেসপি এবং অবশ্যই ওয়ার্নকে সামলে সারাদিন উইকেট কামড়ে পড়ে থেকে ৩৭৫ রানের পার্টনারশিপ বানিয়ে স্টিভের বিশ্বসেরা অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া…এটা জাস্ট অসম্ভব…এটা হয় না, হতে পারে না।
কুড়ি বছর আগে আজকের দিনেই সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখানোর পরে স্টিভের অশ্বমেধের ঘোড়ার মুখে লাগাম পরানো হয়েছিল।