দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ২৪ নভেম্বর। আগ্রার এক জনসভায় বক্তৃতা করছেন নরেন্দ্র মোদী, তিনি বললেন, যদি আমাদের সরকার জিতে ক্ষমতায় আসে, তাহলে প্রতিবছর দেশের ২ কোটি যুবক চাকরি পাবে। তারপর গঙ্গা যমুনায় অনেক চড়া পড়েছে, মোদি জমানার ৮ বছরে দেশের কতজন যুবক চাকরি পেয়েছে? এর জবাব বুধবার লোকসভায় দিয়েছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। তিনি জানিয়েছেন, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২১-২২ অর্থবর্ষ পর্যন্ত চাকরির জন্য আবেদন করেছেন ২২ কোটি ৫ লক্ষ ৯৯ হাজার ২৩৮ জন। আর চাকরি পেয়েছেন ৭ লক্ষ ২২ হাজার ৩১১ জন।
কোভিড অতিমারির কারণে গত দু’বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। বেকারত্বের হার বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, বিগত পঞ্চাশ বছরে দেশজুড়ে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ সীমা ছুঁয়েছে। প্রতিশ্রুতির পর প্রধানমন্ত্রীত্বের দুটি পর্ব পেরিয়েছেন মোদী, ২ কোটি তো দূরের কথা, কার্যত ২ লক্ষ কাজের সংস্থানও করতে পারেননি মোদী ও তাঁর সরকার৷ বিগত বছরগুলির কেন্দ্রীয় বাজেটে কর্মসংস্থান নিয়ে কোনও কথা খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ বরং গত বছরের বাজেট ঘোষণার আগেই অর্থমন্ত্রকের আগাম ঘোষণা, পাঁচ বছর ধরে খালি পড়ে থাকা সরকারি সমস্ত পদ তুলে দেওয়া হোক৷ অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী আওয়াজ তুলে দিলেন, যুবকরা বেকার না থেকে পকোড়া ভাজুক৷

প্রসঙ্গত, কয়েক বছর ধরেই আর্থিক বৃদ্ধির হার নিয়ে পরিসংখ্যানের কচকচি চলছে৷ এ বছর আর্থিক বৃদ্ধি কত হবে– ছয় না সাত শতাংশ, তা নিয়ে তর্কের শেষ নেই। কিন্তু এই কূটতর্কের ফলে কর্মসংস্থানের বেহাল দশা কি আদৌ বদলাচ্ছে? গত আট বছরে কর্মসংস্থানের হারে একেবারে তলানিতে এ বছর৷ ২০১৩–১৪ থেকে ২০১৫–১৬– এই তিন আর্থিক বছরে দেশে কর্মসংস্থান ৫৩ লাখ কমে গিয়েছে৷ ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) ২০১৮–র বার্ষিক রিপোর্ট জানিয়েছিল, ভারতে বেকারের সংখ্যা আরও বাড়বে৷
আগে কিছুটা হলেও কর্মসংস্থান তৈরি হত নির্মাণশিল্প, তথ্য–প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলিতে, এখন সেখানে চলে কর্মী ছাঁটাইয়ের তোড়জোড়৷ মোদীর নোটবন্দি বহু মানুষের রোজগারে থাবা বসিয়েছে৷ তারপর জিএসটি–র কোপে পড়ে বহু ক্ষুদ্র–মাঝারি শিল্প হাবুডুবু খাচ্ছে৷ খোদ মোদি সরকারের আর্থিক উপদেষ্টাই বলেছিলেন, নোটবন্দি–জিএসটি–র মতো অর্থনৈতিক পদক্ষেপ করার কোনও দরকার ছিলনা, কিন্তু চমকপ দিতেই হবে তাই প্রধানমন্ত্রী এসব করেছেন৷ নিয়ম করে প্রতি বছর বাজেট হয়েছে, পরিকল্পনার পাহাড়প্রমাণ সৌধ গড়া হয়েছে, কিন্তু কর্মসংকোচনের হার ধাপে ধাপে বেড়েছে৷ দেশজুড়ে চাকরির জন্য বেকার যুবকের হাহাকার আর্তনাদে পরিণত হয়েছে৷ আর মোদী স্বচ্ছ ভারত, গো রক্ষা, নোটবন্দি, মেক ইন ইন্ডিয়া, স্কিল ইন্ডিয়া, স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া, সবকা সাথ সবকা বিকাশ–একের পর এক ভাঁওওতাবাজির স্লোগান তুলে চলেছেন।
দেশের যে কোনও রাজ্যের রাস্তায় দেখা মিলবে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো পিএইচডি করা যুবকের। আর প্রধানমন্ত্রী চাষি-শ্রমিকের ছেলেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী করার আকাশ-কুসুম স্বপ্নে বুঁদ করে রাখতে চাইছেন। কোভিডের কারণে গত ২ বছর ধরে সমস্ত নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে পড়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ শূন্যপদ। কিন্তু সেই সব শূন্যপদে নিয়োগ বন্ধ। কারণ, সরকারের বেতন দেওয়ার রেস্ত নেই। মোদীজি ভাবছেন দেশবাসী বোকা, তারা এসব জানবে বুঝবে না। ঠিকই; তাই আপনি বছরে ২ কোটি চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিলেন আর সেই ভাঁওতা ক্যাপসুল গিলে দেশের মানুষ বিপুল ভোটে একবার নয়, দুবার আপনাকে জিতিয়ে সিংহাসনে বসালো।

কিন্তু আসল চিত্র হল অসংগঠিত ক্ষেত্র ছাড়া কাজের বাজার নেই। মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও পরিবারের মানুষদের দুবেলা পেট ভরানো দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে৷ কর্মসংস্থানের এই বাস্তব পরিস্থিতির কথাটি জানেন বলেই মোদি ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ, নীতি আয়োগের পূর্বতন ভাইস চেয়ারম্যান অরবিন্দ পানাগড়িয়া পর্যন্ত বলছেন, আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট ইজ এ সিরিয়াস প্রবলেম৷ অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, পূর্ণ সময়ের কাজ, উপযুক্ত মাইনে ভিত্তিক কাজ নেই৷ যেটুকু কাজ হচ্ছে সেটা ঠিকা কাজ৷ দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা মোদী খুব ভাল করেই জানেন। সেই অবস্থার ছবিটিকে আড়াল করতেই তিনি বেকার যুবকদের পকোড়া ভাজার সহজ প্রেসক্রিপশন দেন। নতুন কাজের কোনও সুযোগ নেই বলেই বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটে৷ অথচ মোদী আর তাঁর অনুগামীরা কর্মসংস্থানের জোয়ার বইয়ে দেওয়ার বুলি আওড়েই চলেন। কারণ, সামনে কয়েকটি রাজ্যে ভোট৷ এই সময় বেকারদের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে এসব বুলি আওড়ানো দরকার৷
এই সহজ কথাটি আজ সকলেই জানেন যে, কর্মসংস্থান হতে গেলে দরকার অবাধ শিল্পায়ন৷ যার মানে হল প্রবল গতিতে নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে ওঠা৷ কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে তা কি করে সম্ভব৷ সরকারের জনমুখী দৃষ্টি থাকলে সরকারি উদ্যোগে কিছু শ্রমনিবিড় শিল্প গড়ে উঠতে পারে৷ রেল–স্বাস্থ্য–শিক্ষা–ব্যাঙ্ক ইত্যাদি পরিষেবা ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বাড়িয়ে কিছু কর্মসংস্থা করা যেতে পারে৷ কিন্তু দেশের সরকার যে আসলে ধনকুবের গোষ্ঠীর সেবাদাস৷ তাই বাজেটে আড়াইশো কোটি টাকার বেশি কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে করছাড়ের ঘোষণা করতে হয়৷