একটা সময় মনে করা হয়েছিল, সেটা উনিশ শতকের শেষ দিক; যে পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু সেই ধারণা সত্য নয়। এই আধুনিক যুগও সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। পুঁজিবাদী ও নয়া উদারবাদ বিশ্বব্যবস্থার কালেও দাসত্বের শেকলে বন্দি বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষ। এর মধ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ ভারতীয়। সময়ের সঙ্গে বদলেছে পৃথিবী, পরিবর্তনের তালে সভ্যতারও বদল ঘটেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে বিশ্বের আনাচে কানাচে। কিন্তু এই পালটে যাওয়া সময়ে আধুনিক বিশ্বের কোথাও কোথাও লুকিয়ে রয়েছে দাসত্ব নামক কলংক। সেই দাসত্ব আধুনিক। আর সেই আধুনিক দাসত্বেও মানুষ মানুষকে জোর করে বা হুমকি দিয়ে শ্রম দিতে বাধ্য করছে। এর মধ্যে চাপিয়ে দেওয়া বিয়ে, পাচারের শিকার বা যৌনকর্মী হতে বাধ্য করা বা ঋণগ্রস্ত হওয়ার সংখ্যাই বেশি।

অস্ট্রেলিয়ার একটি সংস্থা ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন (Walk Free Foundation) তাদের বিশ্ব দাসত্ব সূচক এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, গত কয়েক বছরে প্রায় ২.৯ কোটি মহিলা আধুনিক দাসত্বের শিকার হয়েছেন। একাধিক দেশে এই মহিলাদের মধ্যে বেশিরভাগ মহিলাকে শ্রমিক, জোর করে বিয়ে, চাকর, বন্ডেড লেবার, যৌন কর্মী হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান পৃথিবীতে প্রতি ১৩০ জন মহিলার মধ্যে ১ জন আধুনিক দাসত্বের শিকার। তার থেকেও বড় ঘটনা, পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনও সময়ের তুলনায় ঠিক এই সময়েই সবথেকে বেশি সংখ্যক মেয়েরা আধুনিক দাসত্বের শিকার হয়েছেন। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, আমাদের দেশে বলপূর্বক যৌন নিপীড়নের ক্ষেত্রে ৯৯ শতাংশই মহিলা, একই সঙ্গে জোড় করে বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ৮৪ শতাংশই মহিলা।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন ১৬২ টি দেশের তথ্য নিয়ে তৈরি যে বিশ্ব দাসত্ব সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, সেখানেও দেখা গিয়েছিল ভারতেই সবথেকে বেশি মানুষ দাসত্বের জীবন কাটান, সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় দেড় কোটি। তারপরেই ছিল চীন আর পাকিস্তানের নাম।ওই সমীক্ষাতেও বলা হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঋণের দায় মেটানোর জন্য যেমন বিনা-পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে বাধ্য করে, তেমন জোর করে বিয়ে দিয়ে অন্য দেশে পাচার করা হয়। এর তিন বছর পর ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স-২০১৬ জানিয়েছিল, নারী, শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ আধুনিক দাসত্বের শিকার। আর সেই দাসত্বের সংখ্যায় সব থেকে এগিয়ে ভারত। আধুনিক দাসদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাছ ধরার নৌকায় গোলামি করতে হয়, অনেকে গৃহকর্মী হিসেবে বা এমনকি পতিতালয়ে আটকা পড়ে বেরোনোর রাস্তা পান না।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রসংঘের ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন এবং ইন্টার ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড ওয়াক ফ্রি-র যে রিপোর্ট প্রকাশ করে সেখানে জানানো হয়, সারা বিশ্বে ৫ কোটি মানুষ রয়েছেন আধুনিক দাসত্বে। এর মধ্যে ২ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষকে দাস হিসাবে জোর করে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো হচ্ছে এবং ২ কোটি ২০ লক্ষ মহিলাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি নতুন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে ওয়াক ফ্রি অ্যান্টি স্লেভারি অর্গানাইজেশন। তাদের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে গোটা পৃথিবীতে প্রতি ১৩০ জন মহিলার মধ্যে ১ জনই আধুনিক দাসত্বের শিকার।

সম্প্রতি ওয়াক ফ্রি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে চিনে আধুনিক দাসত্বের মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ, রাশিয়ায় ১৯ লক্ষ, ইন্দোনেশিয়ায় ১৮ লক্ষ, তুরস্কে ১৩ লক্ষ এবং আমেরিকায় ১১ লক্ষ। আর ভারত রয়েছে সবার উপরে। ভারতে ফোর্সড লেবারের সংখ্যা ১.১ কোটি! উল্লেখ্য, ৭৮-৭৯ সালে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন এবং ভারতীয় শ্রম ইনস্টিটিউটের করা একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ভারতের দশটি রাজ্যে প্রায় ২৬ লক্ষ মানুষ দাসত্ব করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ সম্মেলনে বিশ্বের মহান নেতারা আগামীকালের জন্য যে লক্ষ্যগুলি রেখেছিলেন, তার মধ্যে ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে আধুনিক দাসপ্রথা, ফোর্সড লেবার এবং মানব পাচারের মতো কলঙ্কজনক ঘটনাগুলিকে মুছে দেওয়া, কিন্তু দুঃখের বিষয় তারপরেও আধুনিক দাসদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক দাসত্ব এখনো খুব সহজ ভাবেই মানুষের সভ্যতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। এবং সেটা মানুষের জীবনের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি কোণে গভীরভাবেই রয়েছে। সেই কারণেই প্রতিদিন, মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, জোর করে মানুষকে দাসত্ব করতে বাধ্য করা হচ্ছে।