কালকের ম্যাচ দেখতে দেখতে নয় বছর আগের একটা ম্যাচের কথা খুব করে মনে পড়ছিলো। নেহেরু কাপ ফাইনালের ভারত বনাম ক্যামেরুন। ওই ম্যাচে প্রায় দ্বিগুণ শক্তির ক্যামেরুনের বিরুদ্ধে কোভারম্যান্সের ভারত দু-খানা অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে খেলতে নেমেছিলো। ওই সময়টা আমার কৈশোর পর্ব। অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল উন্নতির পিছনে রব বানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তাই রব বান আর কোভারম্যান্স এই ডাচজুটির বিনিয়োগ হয় সেই সময়। নেহেরু ফাইনালে দেখছিলাম, কোভারম্যান্স কিভাবে তাতাচ্ছে সুনীল-নবিদের। কালকের ম্যাচের দলটির সাথে নয় বছর আগের ওই দলটির একজনমাত্র খেলোয়াড় অপরিবর্তিত আছেন—সুনীল ছেত্রী। কালের নিয়মে বাকী সবাই অবসর নিয়েছেন। তবু প্রীতম-শুভাশিস-সন্দেশ-গুরপ্রীতরা কেমন যেনো নবি-গৌরমাঙ্গিদের রেখে যাওয়া ব্যাটনটা হাতে তুলে নিলো যেনো। ইগর স্টিম্যাককে যেনো কোভারম্যান্স কানে কানে বলে দিলেন—ম্যাচটা এই ভাবে খেলো। কালকে সৌভাগ্য লিখেছিলো—Indian Fans know to suffer. সত্যিই হাউটন-সুখবিন্দর-আর্মান্দো-কোভারম্যান্স-কনস্ট্যানটাইন-ইগর স্টিম্যাক—প্রায় পনেরো বছর হয়ে গেলো আমার নীলদেশের বল খেলা দেখাটা। বিজয়ন থেকে বাইচুং, বাইচুং থেকে সুনীল, গৌরমাঙ্গি থেকে সন্দেশ, সুব্রত থেকে গুরপ্রীত—ব্যাটন বদলাতে দেখেছি বারবার।
প্রদীপের গোলে প্রথম নেহেরুকাপ জয় দেখেছি। এশিয়া কাপে উন্নীত হওয়া দেখেছি। বহু সাফ গেমস জিততে দেখেছি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গৌরমাঙ্গি-সুব্রত পালের মাত্র চারগোল খাওয়া দেখেছি। প্রাক্তন এশিয়ান চ্যাম্পিয়নের বিরুদ্ধে ১৮০ মিনিটে মাত্র এক গোল খাওয়াও দেখলাম। আমরা কোনোদিন বিশ্বকাপ খেলবো কিনা জানিনা। আমাদের ফেডারেশনটায় আর প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীরা আসবেন কিনা সেটাও জানিনা। শুধু এটুকু জানি, আমরা, এই সমর্থক জাতেরা নিজেদের মধ্যেই ব্যাটন চেঞ্জ করে চলেছি। হাউটনকে খিস্তেছি, কোভারম্যান্সকে খিস্তেছি, স্টিফেনকে খিস্তেছি, ইগরকেও খিস্তাচ্ছি। হাইপ্রোফাইল কোচ আসাটা আমাদের কাছে গর্বের। কাতারের কাছে ১৮০ মিনিটে এক গোল খাওয়াটা আমাদের কাছে গর্বের। ঠিক যেমন আঠার সমুদ্রে আটকে পড়া, মরা আরশোলার কাছে পৌঁছানোর জন্য পিঁপড়ের দল একটা একটা করে কাঁকড় ফেলে রাস্তা তৈরি করছিলো, আমরাও তেমনি এই গর্বের ভগ্নাংশ সাজিয়ে ভাবছি হয়তো এভাবেই একদিন ওই সোনার পরীর সিংহদুয়ার পেরিয়ে যাবো।

ভারতে সায়েন্টিফিক অ্যাকাডেমী হাতে গোনা। হাবিবুরদার সাথে কথা হচ্ছিলো, উনি বললেন, ভারতে অনেক অ্যাকাডেমী হচ্ছে মনে হলেও আদতে ওগুলো কোচিং সেন্টার। ছেলেমেয়েদের ডায়েট, স্কুলিং, জিম, সুইমিং-এর ব্যবস্থা নেওয়া হয়না। তার উপর বেশীরভাগেই ফাইভ-এ-সাইড কিংবা সেভেন-এ-সাইড ম্যাচ খেলা হয় ছোটো মাঠে। একটা দেশের সরকার পিছিয়ে পড়া ফুটবলের জন্য একাডেমী গড়ে তোলবার একটা মানস্বরূপ জমিও দিতে পারেনা। অথচ আমরা ভাবছি এই পনেরো বছরের গর্বের ভগ্নাংশ জুড়ে জুড়েই সোনারপরীর টুর্নামেন্ট খেলবো। অথচ আমরা ভাবছি ইগরের বদলে আরও হাইপ্রোফাইল কেউ এলে রাতারাতি সুনীলরা জাপান-কাতারকে অলআউট অ্যাটাকে খেলে দেবে। আমরা সমর্থকের জাত। ব্যাটন বদলে চলি। কোচ খিস্তাই। হাউটন-কোভারম্যান্স-স্টিফেন-ইগরের লম্বা ফর্দ আরও বাড়িয়ে চলি। অথচ, যখন অনেক দেরী হয়ে যাবে তখন আমরা ভাববো, এই সীমিত ক্ষমতায় এই লম্বার কোচের ফর্দটা যা যা কিনে দিয়ে গেছে আমাদের, ওর চাইতে বেশী হয়তো কিছুই করা সম্ভব ছিলোনা। অথচ, যখন অনেক দেরী হয়ে যাবে তখন আমরা ভাববো, সীমিত অ্যাকাডেমীর দেশে, সলমন খানকে ফুটবল আইকন করা দেশে পেপ গুয়ার্দিওলাকে আনলেও কিছু হতোনা।
আমরা সমর্থকের জাত। আঠায় আটকে পড়া আরশোলাটা খেতে আমরা কাঁকড় জমিয়ে জমিয়ে পথ গড়ে তুলি। অথচ যখন অনেক দেরী হয়ে যাবে তখন আমরা ভাববো, গর্বের ভগ্নাংশ আর ব্যাটন চেঞ্জ করে করে সোনারপরীর সিংহদুয়ার পেরোবার অলীক কল্পনা না করে একটা টর্চ জ্বেলে রাস্তার এদিক-ওদিক অন্ধকার গুলো খোঁজাটা ভীষণ দরকার ছিলো।
আমরা ব্যাটন বদলে আলো জ্বালতে চাই। আমরা টর্চ জ্বেলে অন্ধকার খুঁজতে যাইনা। অথচ অনেক দেরী হয়ে যাবে সেদিন।