মিলেমিশে চলতে মানুষ যেন ভুলে গেছে, ভুলে গেছে বোঝাপড়াটাই আসল কথা। তা না থাকলে জগৎসংসারের সবকিছুই অচল। দেশ-জাতি-সরকার তো দূরের কথা এমনকি পাড়ার ক্লাবও চলবে না। একথা আমরা জানলেও মানিনা। কারণ তা মানার শিক্ষা বা বোধ আমদের নেই। এই বোধ আসার জায়গাটাও নষ্ট করে দিয়েছি আমরা নিজেরাই। প্রশ্ন হল, এই বোধ আসবে কোথা থেকে? আসবে অন্যের সংস্কৃতি ও পরম্পরা বা ঐতিহ্যকে চেনা ও জানার মধ্যে দিয়ে। এভাবেই একটা জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে চিনতে শেখে, বুঝতে পারে তাদের মনের গঠন। তা বুঝলেই তো জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়। সেখানে কোন আনুষ্ঠানিক আড়ষ্ঠতা থাকেনা।

আসলে সাক্ষরতার সঙ্গে শিক্ষাকে গুলিয়ে ফেলাতেই যাবতীয় গোলমালের শুরু হয়েছে। শিক্ষা মানে শুধু সাক্ষরতা নয়, পরস্পরের সংস্কৃতিকে জানা ও বোঝাটাও একটা শিক্ষা। নিজেদের সংস্কৃতি ও পরম্পরা জানার পাশাপাশি অন্য দেশের সংস্কৃতি ও পরম্পরাকে না জানলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়না। চোখের সামনে দেখছি অপরিচয়ের কারণে জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে তৈরি হচ্ছেনা কোন সংযোগ বা সাংস্কৃতিক বিনিময়। এই অজ্ঞতা থেকেই বাড়ছে একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি। কোন মানুষ, সম্প্রদায়, দেশকে আমরা শুধু বিশেষ ধর্মীয় পরিচিতির মোড়কেই পুরে ফেলছি!

ভুবনগ্রাম মানে একটা ঐক্যবদ্ধ সমাজ। বোঝাপড়ার সংস্কৃতি না থাকলে সে চলতে পারেনা। মানুষের সঙ্গে মানুষের ; জনগোষ্ঠীয় সঙ্গে জনগোষ্ঠীর; দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক থাকতেই হবে। অন্যের শিল্প, সংস্কৃতি ও পরম্পরাগুলিকে না জানলে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়না। ফিলহাল এই ব্যাপারটাই বেশ ঘেঁটে গেছে। এর জন্য আমরা সবাই দায়ী। কোন দল, সরকার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এটা তাদের কাজও নয়। এটা একমাত্র আমার আপনার মত মানুষের সমস্যা। সমস্যা হল, ঝোলাধারী রাজনৈতিক কর্মী বা ব্রিফকেসধারী আমলা কেউই ব্যাপারটা মানতে চান না। এব্যাপারে মেলা, কনসার্ট, গ্রন্থাগার, মিউজিয়াম, ধর্মীয় সংগঠন সবার ভূমিকা আছে। কারণ কোন অগ্রগতি বা উন্নয়ন শুধু আর্থিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল নয়। তা একইসঙ্গে একটা জনগোষ্ঠীর ভাবনারও নির্মাণ। ইতিহাস বলছে শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্ভর উন্নয়ন টেঁকেনি। কারণ তা সমাজের সব অংশের মানুষকে স্পর্শ করতে পারেনি। উল্টোদিকে তা দেশ ও জাতিগুলির মধ্যে বিভেদ ও অসহিষ্ণুতা বাড়িয়েছে।

এই বোঝাপড়া বাড়ানোর কাজটা কিন্তু নানা ছোটখাটো বিষয়কে ধরে স্থানীয় স্তর থেকেই করা যায়। হাতের কাছে রয়েছে বহু উজ্জ্বল উদাহরণ। বর্ধমানের প্রত্নস্থল মোগলমারীতে প্রত্নসম্পদ চুরির বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে স্থানীয় একটি ক্লাব। তারা এগুলি রক্ষার গুরুত্ব গ্রামবাসীদের বুঝিয়েছেন। ফলে গ্রামবাসীদের একাংশ যারা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে দুর্লভ ঐতিহাসিক সামগ্রীগুলি শিল্পতস্করদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছিলেন তারা এখন এই কুকর্ম থেকে বিরত হয়েছেন। নিজেদের ঐতিহ্যগুলির রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন তারা। এই উদ্যোগগুলিকেই আরও প্রসারিত করতে হবে। নিজেদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করার মধ্যে দিয়েই বাড়বে অন্যের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করার বোধ। অতীত হয়ে যাবে বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস কিংবা মন্দির মসজিদে হামলার ঘটনা।