গত বছর করোনার প্রকোপ আর তার সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউনের ফলে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছিলেন। পেট চালাতে কয়েক হাজার মানুষ তাদের নিজস্ব পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের সঞ্চয় গিয়ে ঠেকেছিল তলানিতে।
চলতি বছরে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা, নতুন করে লকডাউনে কয়েকমাস আগের পুরনো ছবিটাই আরও ভয়াবহ হয়ে ফুটে উঠছে। এমনিতেই চলতি বছরের প্রথম চার মাসের মধ্যে দেশের বেকারত্বের হার এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ ছিল। তার ওপর গত কয়েকদিন আগে দেশের বেকারত্বের হার হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি’র সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এমনটাই জানাচ্ছে।
দেশে ঠিক এই সময়ের বেকারত্ব কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে সেটার আন্দাজ মিলবে তা সিএমআই-এর পরিসংখ্যানে চোখ বোলালেই। এই মে মাসের গত সপ্তাহ বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪.৪৫ শতাংশ। তার ঠিক আগের সপ্তাহেই দেশের বেকারত্বের হার ছিল ৮.৬৭ শতাংশ। তার মানে ঠিক এক সপ্তাহে বেকারত্বে হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সংস্থাটি জানাচ্ছে, গত ৪৯ সপ্তাহের মধ্যে দেশের বেকারত্বের এই হার সর্বোচ্চ।
সিএমআইই-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী এপ্রিল মাসে দেশের শহরাঞ্চলে বেকারত্বের হার ছিল ৯.৭৮ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে সেই হার ছিল ৭.১৩ শতাংশ। সংস্থাটি জানাচ্ছে, মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে দেশের প্রায় ৭৫ লক্ষ কর্মী কাজ হারিয়েছেন। লকডাউন শুরু হয়ে যাওয়ার পর থেকে মানুষ নতুন করে কাজ খুঁজতে পারছেন না। ফলে সব কর্মক্ষেত্রেই কর্মীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়েছে। ফলে এপ্রিল মাসেই প্রায় ১১ লক্ষ কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হয়েছে।

এর পাশাপাশি আরেকটি ছবিরও দেখা মিলছে। চলতি বছরের গোড়ায় যে অবস্থা ছিল তার থেকে গত দু-এক মাসে নতুন করে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ। আসলে এই ধরণের ব্যবসাগুলির সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকেন অনেকেই, তাদের অনেকেরই রোজগার এখন পুরোপুরি বন্ধ। সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এই মে মাসে। এই বেকারত্বের হার গত চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে লকডাউন যদি লম্বা হয় তাহলে বেকারত্ব যে চরম সীমায় পৌঁছবে সে কথা বলাই বাহুল্য।
ইতিমধ্যে করোনার বড়সড় ধাক্কা লেগে গিয়েছে জিডিপি বৃদ্ধির হারেও। বিভিন্ন সংস্থার সমীক্ষা ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে যে সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল, তা ২.৮ শতাংশ থেকেও কমে গিয়েছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। কেন্দ্র দু-তিন মাস আগেও অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের যে আশাঢ়ে গল্প শুনিয়েছিল এবং যে লক্ষ্যে লকডাউনকে শেষ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী, তা এত জোরে ধাক্কা খেয়েছে যে যা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রের নেই। এমনিতেই পর্যাপ্ত করোনা টিকার ব্যবস্থা করতে তারা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে নিজেদের গাফিলতিতেই। তাতে মানুষের মধ্যে তীব্র অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ায় প্রায় সব ক্ষেত্র থেকেই বিনিয়োগকারীরা মুখ ঘুরিয়েছেন, ফলে বিনিয়োগ এখন গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। অর্থনীতিবিদরা এই অবস্থা দেখেই ২০২১-২২ অর্থবর্ষে ভারতীয় অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের আশা কার্যত নেই বলেই মনে করছেন।
লকডাউন মানেই দেশে বেকারত্ব বাড়বে, একথা তো জানাই, কিন্তু কোথায় গিয়ে পৌঁছবে? যখন গোটা বিশ্বজুড়ে প্রকোপ ছিল তখন দেশে বেকারত্বের হার পৌঁছেছিল ২৭.১১ শতাংশ। ফের দেশে করোনাঢ় দ্বিতীয় ঝড় রুখতে দেশের সমস্ত অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্ম থেমে যাওয়ায় সঙ্কট নতুন করে তীব হয়েছে। উন্নতির রাস্তা আপাতত বন্ধ। চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহতেই বেকারত্বের হার ২৭.১১ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। যেটা মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছিল ৬.৭৪ শতাংশ। তারমানে এক ধাক্কায় ২১.০৫ শতাংশ বেড়েছে।
গত বারের করোনা ও লকডাউনের চাপ কাটিয়ে উঠেও দেখা যায় চলতি বছরের গোড়ায় প্রায় ১ কোটি মানুষ দেশে কাজ হারিয়েছেন। বছরের শুরেতে শীতের সময়টা মূলত কৃষি কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়ই গম ও রবি ফসল ফলানোর সময়। কিন্তু এ বছর সেই কাজ জোটেনি অধিকাংশ মানুষের। যার ফলে একটি বড় অংশের মানুষ কাজ হারিয়েছেন। কাজের বাজারের খারাপ চেহারাটা আগের বছরের পর থেকে প্রায় সব ক্ষেত্রেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। এবার আরও ভয়ঙ্কর।
বেকারত্বের পাশাপাশি মহামারির কারণে মানুষের মৃত্যু, লকডাউন সবমিলিয়েই মানুষের উপর প্রভাব পড়ে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ৩.৪ কোটি বেকারের পরিসংখ্যান দিয়েছিল সিএমআই। তার পাশাপাশি যারা কাজ হারিয়েও ফের কাজে ফিরে যেতে চায় না এমন মানুষের হিসাবও দেওয়া হয়। যার পরিমাণ হল ১.৯ কোটি। অর্থাৎ সবমিলিয়ে মোট বেকারের পরিমাণ ২০২১ সালের এপ্রিল মাসেই ছিল ৫.৩ কোটি। এই মুহুর্তে সেই সংখ্যাটা যে কি বিপুল আকার ধারণ করেছে এবং আগামী দিনে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবতে ভয় করে।
শুধু কি করোনা, কেন্দ্রের গাফিলতি, মোদির ও তাঁর দলের হিন্দুয়ানি, অযোগ্য লোকেদের পক্ষে কি এই অবস্থা সামাল
দেওয়া সম্ভব, কিন্তু এখনো ২০২৪ পর্যন্ত জ্বলতে হবে, মরতে হবে।
আগামী দিন যে কি অবস্থা দেখতে হবে এখন ভাবতে গিয়ে শিউড়ে উঠছি, অথচ ওদের কোনও হেলদোল নেই, এমন শাসক
দল পৃথিবীর কোথাও আছে!