এই তো সেদিনও রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখেছি বাক্সবন্দি একটি ছেলের শরীরে তরোয়াল ঢুকিয়ে দেওয়ার খেলা। একটি লোক হাতে তরোয়াল নিয়ে নানা কথা বলে লোক জড়ো করল। তারপর ভিড় জমতেই ছেলেটিকে সবার সামনেই পুরে দিল বাক্সের মধ্যে। তারপর সেই বাক্স কালো কাপড় দিয়ে মুড়ে অর্থহীন নানা মন্ত্র বলা শুরু করল। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো ভিড়ের চোখে মুখে কি হয় কি ভাব ফুটে উঠলে লোকটি কালো কাপরে ঢাকা বাক্সের মধ্যে তরোয়ালটি চালিয়ে দিল আর ভেতর থেকে বেরিয়ে এল ছেলেটির আর্তনাদ। লোকটি ভিড়ের সামনে রক্তাত্ত তলোয়ালটিও ঘুরিয়ে দেখাল। গলায় তরোয়াল বেঁধা অবস্থায় ছেলেটি বাক্স থেকে মুখ বাড়াতেই লোকটি মাটিতে রাখা থালায় সবাইকে পয়সা ফেলতে বলল। বেশ কিছু টাকা পয়সা থালায় পড়লে লোকটি আবার ছেলেটিকে বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে কালো কাপড় দিয়ে সেটা ঢেকে দিল। কিছুক্ষণ পর সেই তরোয়ালবিদ্ধ ছেলেটি সুস্থ দেহে বাক্স থেকে বেরিয়ে আসত। এটাই দুনিয়ার সবচেয়ে পুরনো জাদুর খেলা।
জাদু একটি পারফরমিং আর্ট। একজন পারফরমার কৌশলে একাধিক উপকরণ ব্যবহার করে দর্শকদের চোখে ধোঁকা দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব, আছে কে নেই করে দেয়। এভাবে দর্শকদের আনন্দ দেওয়াই হল জাদু বা ম্যাজিক। যিনি জাদু প্রদর্শন করেন তিনি জাদুকর বা ম্যাজিসিয়ান। ‘জাদু’ শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে গ্রিক শব্দ ‘ম্যাজেইয়া’ থেকে এসেছে। জাদু-র সংস্কৃত শব্দটি হল ইন্দ্রজাল, মানে দেবতা ইন্দ্রের জাল। শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয় যেমন ভেলকিবাজি, ভোজবাজি, মায়া, ফাঁদ, গায়েব, ধোঁকা এমনকি জাদু।
অনেককাল আগে পর্যন্ত মেলাগুলিতে বিনোদনের একটি সাধারণ উৎস ছিল জাদু প্রদর্শন। জিন ইউজেন রবার্ট-হাউডিন ১৮৪৫ সালে প্যারিসে একটি জাদু থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রায় একই সময়ে জন হেনরি এন্ডারসন লন্ডনে জাদু প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ছোট-বড় নাট্যমঞ্চে জাদু প্রদর্শন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে বিনোদনের এই ফর্মটি নাট্যমঞ্চ থেকে টেলিভিশনে জায়গা পায়।

অথর্ব বেদের শ্লোক থেকে পুরাণ, কিংবদন্তি- ভারতের সর্বত্র নাকি ইন্দ্রের জালের মতোই জাদু ছড়িয়ে আছে। দুনিয়াজুড়ে ভারতীয় জাদুর কদর বহু আগে থেকে। ভারতীয় জাদুর দলগুলি ব্রিটিশ আমলেও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মেলা, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ডাক পেত। দক্ষিণ ভারতের রাম স্বামী আমেরিকা, ইউরোপ, ইংল্যান্ডে পারফর্ম করে ওই সময়ে দুনিয়ার বিখ্যাত জাদুকর হয়ে ওঠেন। ওরিয়েন্টাল ট্রুপের জাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিল বিভিন্ন শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষ। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ মাদ্রাজ, দিল্লি, লখনউ, লাহোর শহরের জাদুকরদের শূন্যে দড়ি ছুড়ে দেয়া এবং সেটা শূন্যেই ঝুলে থাকা, তারপর সেই দড়ি ধরে মানুষ কিংবা কোনও প্রাণীর বেয়ে ওঠা দেখে দর্শকরা অবাক হয়ে যেত। সাধু-সন্ত-ফকিররা জীবন্ত অবস্থায় কবরস্থ হয়ে কয়েক মাস পর আবার জীবিত হয়ে উঠতেন। মাটিতে ফলসহ আম গাছ তৈরি- এসব জাদুর খবরে বিদেশের পত্র পত্রিকার পাতা ভরে যেত।
সুদূর অতীত থেকেই ভারতীয় জাদু ছিল বিস্ময়কর। অলৌকিক কাণ্ড ঘটাতে কে বেশী সিদ্ধহস্ত, সে প্রতিযোগিতায় নামতেন সুফি ও যোগীরা। বৌদ্ধ ও জৈন পণ্ডিতরা দার্শনিক তর্কে জিততেও জাদুর সাহায্য নিতেন। ভারতীয় এ ধরনের জাদুবিদদের দারুণ চাহিদা ছিল প্রাচীন রোমে। আব্বাসীয় খলিফার আমলে বাগদাদে ভারতীয় জাদুবিদ্যার নানা কলাকৌশলের আরবি অনুবাদের বই বিক্রি হত।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে হেরোডটাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ, ভূগোলবিদ, বণিক, মিশনারি, অভিযাত্রী, তীর্থযাত্রীরা ভারতবর্ষকে অদ্ভুত প্রাণী, সাধু-সন্ত, গণত্কার, সাপুড়ে, এবং জাদুকরদের ভূমি বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা জাদুর মাধ্যমে মন্দিরের মেঝেকে উঁচু-নিচু করে সাগরের ঢেউয়ের মতো করে দেখাতেন। এক বিদেশি পর্যটকের সামনে এক ভারতীয় জাদুকর ঘনক আকৃতি ধারণ করলে সেই পর্যটক মূর্ছা গিয়েছিলেন। মালাবার উপকূলে জাদুকররা মুক্তোশিকারি ডুবুরিদের মন্ত্র পড়ে মানুষখেকো কুমিরের হাত থেকে বাঁচাতেন।

গ্রিক পর্যটক অ্যাপোলোনিয়াস তক্ষশীলা ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তাঁর বিবরণীতে ভারতের নানা অদ্ভুত কাণ্ডকারখানার কথা লিখেছিলেন, ‘আমি দেখেছি ভারতের ব্রাহ্মণরা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থেকেও সেখানে নেই’। পরিব্রাজক ইবন বতুতা এদেশে জীবন্ত কবরস্থ হয়ে বেঁচে থাকার কাণ্ডকারখানার উল্লেখ করেছেন। নিকোলাও মানুচ্চি সম্রাট শাহজাহানের আমলে ভারতে এসে মোগল দরবারে চাকরি পেয়েছিলেন। তাঁর বিবরণীতে নানা ধরনের জাদু, ডাকিনীবিদ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। মানুচ্চি ছাড়াও সে সময় মোগল দরবারে চিকিৎসক ছিলেন ফাসোয়াঁ বার্নিয়ার। তিনি লিখেছেন ভারতের ফকিররা স্বর্ণ তৈরি করতে পারেন। ৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে শিয়া পণ্ডিত আল নাদিম লিখেছেন, ভারতীয় জাদুকররা গ্রহ-নক্ষত্রের হিসাব কষে মন্ত্রঃপূত কবচ ব্যবহার করে নানা ধরনের আশ্চর্য কাণ্ড দেখাত। নাদিম বাব্বাহ নামে একজন ভারতীয়ের জাদুমন্ত্র ও মায়বিদ্যা নিয়ে লেখা বই পুরো আরব দুনিয়ায় পরিচিত ছিল। আরবে ভারতীয় জাদুবিদ্যার বইয়ের অনুবাদ ও ব্যবহারের আরো নিদর্শন আছে। এবং আরব ও পারস্য থেকে সেই সব বই রোমেও হাজির হয়েছিল।
বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা দেখে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় বাজিকরদের ইংল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করত। কালা পানির ট্যাবু ভেঙে অনেকেই হাজির হয়েছিলেন। ইংল্যান্ডের রাস্তায় বিজ্ঞাপনে লেখা হত ‘আসছে ভারতীয় বাজিকররা, যারা তলোয়ার গিলে ফেলে’। কাশ্মীরের তরুণ খোদা বক্স লন্ডনে ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য এক্স-রে আইজ’ নামে শো করতেন। তিনি ইচ্ছেমতো দম আটকে রাখতে পারতেন, আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতেন, বিষ খেয়েও সুস্থ থাকতেন, আর পারতেন চোখ বাধা অবস্থায় যে কোনও বইয়ের পাতার পর পাতা বলা দিতে। পিসি সরকারের অনেক আগে থেকেই ভারতীয় জাদু দুনিয়া জয় করে নিয়েছিল।