নরেন্দ্র মোদী-র নেতৃত্বে এনডিএ সরকার শপথ নিয়েছিল ২০১৪ সালের ২৬ মে। আজ ২০২০ সালের ৬ অক্টোবর। ২৩২৬ দিন বয়স হলো। এই সময়ে দেশের অবস্থা প্রতিদিন খারাপ হচ্ছে। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা তলিয়ে যাচ্ছে।
দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যাকে জিডিপি বলে তা প্রতিদিন কমছে। স্বাধীনতার পর কখনও এমন অবস্থা হয় নি। ট্রাক, ছোটো গাড়ি, বাইক থেকে বিস্কুট— সব শিল্পের অবস্থা খারাপ। কেনার মতো টাকা লোকের হাতে নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির জন্য কর্মসংস্থান হচ্ছে না। রেল, ব্যাঙ্ক, বিমা, ডাকঘর—এমন সব কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রায় বন্ধ। অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি-সহ বেশ কিছু কেন্দ্রীয় সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান এই বিজেপি সরকার বেচে দিতে চাইছে। ভাবতে পারেন রেল বেচে দিতে চাইছে। দেশের সেনারা যে অস্ত্র নিয়ে লড়াই করবে সে কারখানাগুলোও বেচে দিতে চাইছে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত স্বদেশি শিল্পের প্রতীক বেঙ্গল কেমিক্যালের কর্মীরা পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠানটিকে লাভের মুখ দেখিয়েছেন। লক্ষ্মীছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার সেটাও বেচে দিতে চাইছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনই লক্ষ্মীছাড়া’। দুই বিঘা জমি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ এ কথা লিখেছিলেন। আজ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, ওএনজিসি, বেঙ্গল কেমিক্যাল বেচার অভিসন্ধি দেখলে হতচ্ছাড়াদের বিরুদ্ধে কত কথাই না রবীন্দ্রনাথ লিখতেন।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রের কথা বলি—ভোটের পর বিরোধী দলের সরকার হতে পারে বা সরকার হয়েছে বুঝেই কেন্দ্র চক্রান্ত করে বিজেপির সরকার গড়ে ফেলছে। অরুণাচল, গোয়া, মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটক সে কথাই বলে। বহুদলীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদ মানতে চাইছে না। কেন্দ্র সব রাজ্যে বিজেপির সরকার চাইছে। শাহেন শাহ বলেছেন, দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় লাভ হয়নি। কি মারাত্মক কথা। একদলীয় শাসন চালুর প্রস্তাবনা মাত্র।
কাশ্মীরে কি হলো। সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা বাতিল বিজেপি যে করবে তা জানা কথা। কারণ, বিজেপির পূর্বসূরি জনসংঘ প্রথম থেকেই এই দাবি করে আসছিল। প্রতিটি লোকসভা ভোটের ইস্তাহারে বিজেপি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সংবিধানের একটা ধারা বাতিল করতে গেলে সংবিধান মেনেই তো তা করতে হবে। সংবিধানের ৩৬৮ নম্বর ধারাতেই বলা আছে, কীভাবে কোনও ধারা যোগ বা বিয়োগ করা যায়। কী নিয়ম? সরকার বিল এনে সংসদের ২টি কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা পাস করাবে। তারপর দেশের ৫১ শতাংশ রাজ্য বিধানসভায় সেটি অনুমোদিত হবে। তারপর রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন। জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধী সংবিধানের ৪২তম সংশোধন করেছিলেন। অনেকগুলি ধারা একসঙ্গে যোগ-বিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু ৩৬৮ নম্বর ধারা মেনেই সেটা হয়েছিল। আবার ১৯৭৭ সালের মার্চে মোরারজি দেশাই সরকার আসার পর সংবিধানের ৪৪ ও ৪৫তম সংশোধন করে ৪২তম সংশোধনের অনেক কিছু নাকচ করেছিলেন। সেটাও ৩৬৮ নম্বর ধারা মেনে হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০১৯ সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা বাতিল হলো একদম বেআইনিভাবে। আগেই রাষ্ট্রপতির সই হয়ে গেল। পুরো বেআইনি ব্যাপার। সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো, বিচারপতির বিচার করবে যারা আজও জাগেনি সেই জনতা। তাই সুপ্রিম কোর্ট এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পিটিশন পেয়েও বললো, এটা পরে শুনানি হবে। রামমন্দির নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলা নিয়ে সিবিআই-এর লক্ষ্নৌ আদালত যে রায় দিল তা অদ্ভুত। কী মারাত্মক বিচার! মানুষ যাবেন কোথায়? কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুয়াহাটিতে গিয়ে বললেন, ৩৭০ নম্বর ধারা বাতিল করেছি। কিন্তু ৩৭১ নম্বর ধারা বাতিল করবো না। দুটো ধারার কার্যকরী কথা একই। তা হলো, ৩৭০ নম্বর ধারাবলে কাশ্মীর এবং ৩৭১ ধারাবলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাইরের লোক জমি কিনতে পারবেন। ৩৭০ বাতিল হলে ৩৭১ নয় কেন? আসলে সারা দেশের হিন্দুদের মধ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরও বিদ্বেষ ও ক্ষোভ চাগিয়ে দেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ রাজ্যসভায় বেআইনীভাবে পাস করানো হলে কৃষি বিল। বিরোধীরা ভোটাভুটি চেয়েছিলেন, বিজেপি ফ্লোর ম্যানেজাররা বুঝেছিল ভোট হলে তারা হেরে যাবে তাই রাজ্যসভার টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়ে কম ধোনি ভোটেই পাস করিয়ে নিল। কারন সরকার আদানি, আম্বানি, আইটিসি কম্পানিদেরকে কথা দিয়েছিল যে করেই হোক এই অধিবেশনে কৃষিবিল পাস করাবে। রাজ্যসভার মর্যাদাকেই ধুলিস্যাৎ করা হলো।
মোদী সরকার দ্বিতীয় পর্বের গোড়াতেই বেড়াল মেরে আরএসএসের লক্ষ্যপূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার বলছেন, সারা দেশেই এনআরসি লাগু করবো। বাপ-ঠাকুরদার আমলের ভিটেমাটিতে বসবাসকারীদের বলা হচ্ছে এই কার্ড আনো, ওই কার্ড আনো। কার্ড জোগাড় করতে না পেরে কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। অসমে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে।
কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের সময় সংবিধান মানেনি। আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও কোনও নৈতিকতা মানছে না। তাই রাজ্যসভায় তেলেগু দেশমের ৬ জন সদস্যের ৪ জনকে বিজেপি কিনে নিলো। ফলে রাজ্যসভায় এখন এক নম্বর দল হয়েছে। বিহারে নীতিশকুমারের নেতৃত্বাধীন জনতা দল (সংযুক্ত)কে দুর্বল করার জন্য বিধানসভা ভোটের আগে চিরাগ পাসোয়ানকে দিয়ে ষড়যন্ত্র করাচ্ছেন। সংসদের উভয়কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার জন্য আঞ্চলিক দলগুলোকে শেষ করতে চাইছে। যাঁরা বহুদলীয় শাসনের বদলে একদলীয় শাসন চান তাঁরা যে সংবিধানের নির্দেশিত ফেডারেল ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেবে না সেটা সহজেই বোঝা যায়। সব মিলিয়ে গণতন্ত্র অতি বিপন্ন। তাই তিন জন আইএএস অফিসার গণতন্ত্র বিপন্ন করার অভিযোগ তুলে মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের সালাম জানাই। এখনও অনেকে বুঝতে পারছেন না, আরএসএস ও তার রাজনৈতিক শাখা বিজেপি কী মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছে। বহুত্ববাদ শিকেয় তুলে এক দেশ, এক জাতি, এক দল, এক ভাষা— এই স্লোগান দিয়ে দেশটার বারোটা বাজাবে।
সামাজিক ক্ষেত্রে দলিতদের উপর উচ্চবর্ণের অত্যাচার বিগত ৫ বছরে বেড়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে ২৫ বছর ধরে সেটা একটু কমেছিল। উন্নাও থেকে হাথরস কি শিক্ষা দেয়?
সাংস্কৃতির ক্ষেত্রেও দেখুন হাথরসের ঘটনার পর বিজেপি বিধায়ক বললেন, মহিলারা সংযত হলে ধর্ষনের ঘটনা ঘটবে না। অর্থাৎ ওই নেতা বলতে চাইছেন, মহিলারা সালোয়াড় কামিজ অথবা জিনস-টপ পরে কলেজে বা কর্মক্ষেত্রে যাবেন না। শারি পরে শুধু রান্না করবেন আর সন্তান দেখভাল করবেন। দেশটা যতটুকু এগিয়েছিল ততটাই পিছিয়ে দিতে চাইছে।
এসব আমরা মানতে পারবো না। যতক্ষণ আছে প্রাণ জঞ্জাল সরানোর জন্য চেষ্টা করে যাবো। একই সঙ্গে বলি, সাথী, কিষাণ, মজদুর ভাইসব হুঁশিয়ার। ভারতবাসী সতর্ক হন।