সময়টা আজ থেকে নয় নয় করে ১৭৬বছর আগে ১৮৫০ খ্রীস্টাব্দ। কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার রাস্তার দু’ পাশে তখন চাষের ক্ষেত ও তার ধারে ঘন বন। অবশ্য বন না বলে জঙ্গল বলাই ভালো। তবে ওসব দেখার ভ্রুক্ষেপ নেই এক যুবকের, লোকজন নিয়ে সেই যুবক একটার পর একটা খুঁটি মাটিতে পুঁতে যাচ্ছেন। ধানের ক্ষেত গর্ত করে এত বড় বড় খুঁটি পোঁতার ব্যাপারটা খুব একটা ভাল চোখে দেখলো না স্থানীয় লোকজন। কিসের জন্য ধানের ক্ষেতে বড় বড় গর্ত করে খুঁটি পোঁতা? টেলিগ্রাফ লাইনের তার টানার জন্য জেনেও তাদের বক্তব্য, যাই হোক না কেন,ধানের ক্ষেত গর্ত করে এত বড় খুঁটি পোঁতা মেনে নেওয়া যায় না৷ অতএব পরের দিন যুবক কাজে গিয়ে দেখলেন অনেক খুঁটি রাতের আঁধারে উপড়ে নিয়ে গিয়েছে লোকেরা। কখনও তালগাছের গুঁড়ি অথবা সেগুন কাঠের খুঁটিও বেপাত্তা হয়ে যায়৷ যুবক আবার নতুন খুঁটি বসায়৷ খুঁটি বসানো আর উপড়ে ফেলার ঘটনা পর্যায়ক্রমে চলতে থাকলে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অন্য বিকল্প পথ হিসেবে জলপথকে বেছে নিয়ে টেলিগ্রাফ তার পাতার জন্য স্টিমার কোম্পানিগুলোকে জানালে কিন্তু তারা অসম্ভব চড়া দর হাঁকে। তাতে কী যায় আসে যুবক শিবচন্দ্রের। নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য শিবচন্দ্র চ্যালেঞ্জ হিসেবে জেলেদের মাছ ধরা ডিঙি নৌকা দিয়েই খরস্রোতা নদীর জলের নিচে সাত মাইল লম্বা তার তৈরি করে তা বসিয়ে ফেললেন।
ইংরেজি ক্যালেণ্ডারে ১৮৫১ সালের নভেম্বর মাস, ভারত তথা বাংলার প্রথম টেলিগ্রাফ লাইনের উদ্বোধন হবে৷ ডায়মন্ডহারবারে অপেক্ষা করছেন বঙ্গসন্তান শিবচন্দ্র, আর এক প্রান্তে শহর কলকাতার গভর্ণমেন্ট হাউসে উদগ্রীব হয়ে থাকা বড়লাট লর্ড ডালহৌসি ও সঙ্গে কলকাতা মেডিকেল কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রথম টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কারক ডবলিউ ও’শাগনেসি।

১৮৫১ সালেই ডাঃ ও’শাগনেশি কলকাতা কলকাতা থেকে ডায়মন্ডহারবার, ডায়মন্ডহারবার থেকে কুঁকড়াহাটি কুঁকড়াহাটি ও কুঁকড়াহাটি থেকে খেজুরি পর্যন্ত ৮২ মাইল ব্যাপী টেলিগ্রাফ লাইন বসানোর সর্বপ্রথম অনুমতি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ডায়মন্ডহারবার থেকে প্রথম টেলিগ্রাফের সঙ্কেত পাঠালেন শিবচন্দ্র। ভারতে টেলিগ্রাফের ইতিহাসে অমর হয়ে গেলেন শিবচন্দ্র নন্দী৷
সেই শুরু ভারতের টেলিগ্রাফ ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের।
কে এই যুবক শিবচন্দ্র? হাওড়ার শিবপুরের মধ্যবিত্ত বাঙালি শিবচন্দ্র নন্দী। ডায়মন্ডহারবার-কলকাতা শুধুমাত্র নয়,বরাকর থেকে এলাহবাদ, কাশী, এমন কি কলকাতা থেকে কুঁকড়াহাটি, খেজুরি ও ঢাকাতেও টেলিগ্রাফ লাইন বসিয়েছিলেন তিনি। বাঙালির সাহসিকতা ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে উজ্জ্বল একটি নাম শিবচন্দ্র নন্দী। অভূতপূর্ব কাজের জন্য তিনি ইংরেজদের কাছে পেয়েছেন শুধুমাত্র রায় বাহাদুর উপাধিটুকু৷
হাওড়ার শিবপুরের নিতান্ত গরিব ঘরের সন্তান শিবচন্দ্র নন্দী বাইশ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন কলকাতা টাঁকশালে৷ কারিগরী বিদ্যার দিকে প্রথম থেকেই ঝোঁক দেখে তাঁকে সহকারি করে নিয়েছিলেন ডাঃ ও’শাগনেশি। মনের মত শিষ্য পেয়ে গুরু-শিষ্য টাঁক শালের ল্যাবরেটরিতে বসে টেলিগ্রাফ নিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে থাকেন৷ সাহেব শিষ্যকে বানিয়ে দিলেন টেলিগ্রাফ ম্যান, আদপে তিনি ছিলেন মিন্টম্যান৷ নিঃশব্দে তাঁর জীবন থেকে মুছে গেল টাঁকশালের অধ্যায়৷ লন্ডন থেকে টেলিগ্রাফ লাইন বসানোর অনুমতি এলে লর্ড ডালহৌসি ডেকে পাঠালেন টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কারক উইলিয়াম ও’শাগনেসিকে৷ তিনি আবার তাঁর সহকারি টেলিগ্রাফ এক্সপার্ট বাঙালি ছোকরা শিবচন্দ্রকে নিয়ে হাজির হলেন৷ ঠিক হল প্রথমে তৈরি হবে কলকাতা থেকে ডায়মন্ডহারবার টেলিগ্রাফ লাইন তৈরি হবে৷ ও’শাগনেসি সহকারি শিবচন্দ্রকে নিয়ে মনের স্ফূর্তিতে কাজ শুরু করলেন৷ এভাবেই নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে ডায়মন্ডহারবার থেকে শিবচন্দ্র সর্বপ্রথম টেলিগ্রাফ সঙ্কেত পাঠালেন।
ভারতে টেলিগ্রাফের ইতিহাসে অমর হয়ে গেলেন শিবচন্দ্র নন্দী৷ তাঁর প্রতি বাঙালির একমাত্র শ্রদ্ধার্ঘ্য কলকাতার বড়বাজারের কাছে ছোট্ট একটি গলি যার নাম ‘শিব নন্দী লেন’। এত বড় মাপের কাজ করেও আজ বিস্মৃতির অন্তরালে কার্যত হারিয়ে গিয়েছেন শিবচন্দ্র নন্দী।
ভয়ংকর খরস্রোতা নদীর তলা দিয়ে টেলিগ্রাফের তার পাতার যে গোড়াপত্তন ও খুঁটি পোতা শুরু হয়েছিলো বঙ্গসন্তান শিবপুরের শিবচন্দ্র নন্দীর হাতে, তারই সমসাময়িক সময়ে বাংলার আরএক প্রান্তে জন্ম হল প্রথম টেলিগ্রাফ কেন্দ্রের।যার বেড়ে ওঠা, শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনপ্রাপ্তি সবই প্রাচীন খেজুরিতেই। টেলিগ্রাফ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা ও বহুল ব্যবহারের কার্যক্রম শুরু হল সেই প্রাচীন খেজুরিতেই। তা জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে কয়েক শতক আগে।
ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে সুপ্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দরের গরিমা যখন একটু একটু করে লুপ্ত হতে বসেছে ঠিক সেই সময়েই বঙ্গোপসাগরের হুগলি নদীর মোহনার পশ্চিমদিকে পলি জমে প্রথমে ‘হিজলি’ ও তার কিছু পরে ‘খেজুরি’ নামে দুটি দ্বীপ জেগে ওঠে। দুটি দ্বীপের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া কাউখালি নদীর জন্য হিজলি ও খেজুরি দ্বীপ দুটি পৃথক ছিল। ইতিহাসের কুখ্যাত ‘মগের মুলুক’ হিসেবে পরিচিত হিজলি রাজ্যের অন্তর্গত ছিল আজকের খেজুরি।

শিবচন্দ্র নন্দী
পূর্ব মেদিনীপুরের বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা প্রাচীন জনপদ হিজলি রাজ্যে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে মগ সাহায্যপুষ্ট পর্তুগিজ জলদস্যুরা লুঠসন্ত্রাস আর বিভীষিকার যে রাজত্ব কায়েম করেছিল ইতিহাসে তা মগের মুলুক হিসেবে পরিচিত। কাউখালি নদী একসময় মজে গেলে ‘হিজলি’ আর ‘খেজুরি’ দ্বীপ দুটি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়। ধীরে ধীরে খেজুরি এশিয়া, ইউরোপ-সহ বর্হিবিশ্বের সঙ্গে জলপথের অন্যতম বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত ইউরোপ থেকে এদেশে আসা বড় বড় জাহাজগুলি হুগলি নদীর মোহনায় চর পড়ে যাওয়ায় কলকাতা বন্দরের দিকে আর এগোতে না পারায় বিকল্প ও সুবিধাজনক স্থান হিসেবে বিদেশি বণিকরা বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত খেজুরিকেই বেছে নেয়। বনজঙ্গল কেটে জনবসতি গড়ে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে খেজুরি বন্দর গড়ে ওঠে। খেজুরি বন্দর শহর ক্রমশ বানিজ্য কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত গড়ে উঠতে থাকে। বন্দর অফিস, জাহাজে যাতায়াতকারী যাত্রীদের বিশ্রামাগার, পান্থশালা, হোটেল, কোম্পানির এজেন্টদের বাসস্থান, গীর্জা, শুঁড়িখানা এমনকী গণিকালয় পর্যন্ত। খেজুরির ইতিহাসকার মহেন্দ্রনাথ করণের ‘খেজুরি বন্দর’ বইতে জানা যায়, খেজুরি বন্দর এলাকার মধ্যে বহিরাগত বিদেশীদের বসবাস করার জন্য কালক্রমে বন্দর সংলগ্ন এলাকাটির ‘সাহেব নগর’ নামকরণ হয়েছিল। সাহেবদের অস্তিত্ব না থাকলেও সাহেবনগর নামে গ্রামটি আজও খেজুরির বুকে বর্তমান। বানিজ্য কেন্দ্র থেকে ক্রমশ বানিজ্য নগরীতে পরিনত হয়ে ওঠে খেজুরি।

বন্দর, বানিজ্যিক কেন্দ্র, রাজস্ব ও শাসন-কুঠি প্রভৃতি গড়ে ওঠায় প্রচুর বণিক, নাবিক, পর্যটক থেকে ইংরেজ আধিকারিক, কর্মচারী ও দেশীয় উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ভীড় বাড়তে থাকে। এদের জন্য ও খেজুরির বন্দরের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের কাউন্সিল, গভর্ণর থেকে গভীর সমুদ্রে থাকা জাহাজের নাবিক ও খেজুরি বন্দরে কর্মরত ইংরেজ কর্মচারীদের স্বদেশে পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের আদান প্রদানের জন্য ডাক-ব্যবস্থার আশু প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ১৭৭২ সালে বাংলার নব নিযুক্ত গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের তত্ত্বাবধানে খেজুরিতে ভারতের সর্বপ্রথম ডাকঘর স্থাপন করা হয়। খেজুরিতে সর্বপ্রথম ডাকঘর চালু হওয়ার পর ইউরোপীয় ব্যবসায়ী, যাত্রীসাধারণ, নাবিক, জাহাজের মহাজনদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কার্যসম্বন্ধের জন্য উচ্চ বেতনের এক ইংরেজ কর্মচারী দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তখনকার দিনে খেজুরির গুরুত্ব অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছিল ইউরোপ থেকে আসা সংবাদ বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে। তখনকার দিনে কলকাতা থেকে খেজুরি যাতায়াত চলত নৌকার মাধ্যমে। কলকাতা থেকে প্রচারিত বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রকাশকরা স্নুপ বা দ্রুতগামী ছোট ডিঙি নৌকায় করে খেজুরি বন্দর দিয়ে যে সব জাহাজ সেদিনই স্বদেশে ফিরবে সেইসব স্বদেশগামী জাহাজে করে সংবাদপত্র পাঠাতেন। এছাড়াও খেজুরি বন্দর থেকে ডিঙি নৌকাগুলি গভীর সমুদ্রে ইউরোপ থেকে এসে সমুদ্রে নোঙর করা জাহাজগুলোতে কার্যত একরকম হানা দিয়ে ইউরোপের সর্বপ্রথম তাজা খবর সংগ্রহ করত। নতুন নতুন টাটকা খবর কলকাতায় পাঠানোর জন্য স্বভাবতই ডিঙি নৌকাগুলির মধ্যে হুড়োহুড়ির এক তীব্র প্রতিযোগিতা চলত। এছাড়াও প্রতিদিন খেজুরি ডাকঘর থেকে নৌকার মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় ডাক বিলির ব্যবস্থাও ছিল। দ্রুতগামী সালতি বা নৌকায় সংবাদ আদান প্রদানে জোয়ার ভাঁটা ও আনুষঙ্গিক অসুবিধার জন্য ব্যাঘাত ঘটত। ডাকবাহী নৌকায় দস্যু তস্করদের হামলার ঘটনাও প্রায়শই ঘটত। কলকাতা গেজেটের ১৮০৭ সালের ২৩ আগষ্ট পোস্ট মাস্টার জেনারেল কর্তৃক প্রচারিত এক বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়,যে একটি ডাক নৌকা চিঠিপত্র জাহাজে বিলি করে সাগরদ্বীপের কাছে নোঙর করে অপেক্ষা করার সময় একটি বাঘ নৌকার উপর উঠে এক মাঝিকে কামড়ে তুলে নিয়ে যায়। এছাড়াও বাঘের আক্রমণে নৌকার আরও দুজন গুরুতর আহত হওয়া ছাড়াও নৌকাটি জলে উল্টে গিয়েছিল। অন্য একসময় ‘মেরীমেড’ নামে এক জাহাজের কর্মচারীরা খেজুরির একটি ডাক-নৌকার কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম থেকে গভর্নর জেনারেল এবং তাঁর কাউন্সিলের সকল সদস্যরা ভবিষ্যতে খেজুরির পোষ্ট মাস্টারের অধীন কোন কর্মচারীর কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টির জন্য কঠোর শাস্তির বিষয় ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর কলিকাতা গেজেটে বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমে ঘোষণা করেছিলেন।

এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে মোহনার পথে নানা জায়গায় গার্ড-বোট বা নৌকা-চৌকির ব্যবস্থাও করা হয়। জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দ্রুত ও নিরাপদে প্রেরণের জন্য ১৮১০ সাল পর্যন্ত সেমাফোর পদ্ধতিতে সংকেত দেওয়া হত।তাও শুধুমাত্র দিনের বেলাতেই। সেমাফোর পদ্ধতিটি ছিল অদ্ভুত রকমের। সংবাদ প্রেরণের জন্য কিছু দূর অন্তর মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল। তারই উপরে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে হাত কিংবা পতাকা বিভিন্ন ভঙ্গীতে সঞ্চালিত করে সাঙ্কেতিক চিহ্নের মাধ্যমে সংবাদ দূরত্বে থাকা অন্য এক মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে পাঠানো হত। টেলিস্কোপের সাহায্যে একে অন্যজনের সাঙ্কেতিক চিহ্নগুলি লক্ষ্য করতেন। পতাকা ও হাতের ভঙ্গির দ্বারা ইংরেজি বর্ণমালার ২৬টি অক্ষরকে বোঝানোর চেষ্টা করা হত। এভাবেই খেজুরি ডাকঘরের মাধ্যমে খবর আদান প্রদানের কাজ চলে আসছিল। ১৮৫১ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ ডবলিউ বি ও’শাগনেসি ১৮৫১ সালে ভারতে সর্বপ্রথম টেলিগ্রাফযন্ত্র আবিষ্কার করেন। তাঁর আবিষ্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় সংবাদ পাঠানো ও গ্রহণ করা হত। ১৮৫১ সালেই ডাঃ ও’শাগনেশি কলকাতা থেকে ডায়মন্ডহারবার, ডায়মন্ডহারবার থেকে কুঁকড়াহাটি ও কুঁকড়াহাটি থেকে খেজুরি পর্যন্ত ৮২ মাইল ব্যাপী টেলিগ্রাফ লাইন বসানোর সর্বপ্রথম অনুমতি প্রাপ্ত হন। ১৮৫২ সালে খেজুরি ডাকঘরের তিনতলায় ভারতের সর্বপ্রথম টেলিগ্রাফ কেন্দ্র চালু হয়। টেলিগ্রাফ যন্ত্র চালু হতেই বন্ধ হয়ে যায় আগেকার সেমাফোরের মাধ্যমে সংবাদ আদান প্রদানের বিচিত্র পদ্ধতির কাজ। খেজুরির ডাকঘরের তিনতলায় অবস্থিত ভারতের সর্বপ্রথম টেলিগ্রাফ কেন্দ্র থেকে ড. ও’শাগনেশির আবিস্কৃত পদ্ধতিতে টেলিগ্রাফ চালু থাকার পর ১৯৫৭ সালে বিলেত থেকে আমদানি করা স্যামুয়েল জে বি মোর্সের ডট ও ড্যাসের বর্ণমালা যুক্ত টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা চালু হয়। ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত খেজুরি বন্দরের অস্তিত্ব থাকার পর ১৮৬৪ সালে খেজুরির বিধ্বংসী বন্যায় খেজুরি বন্দরের বিলুপ্তি ঘটে। সেইসঙ্গে বিলুপ্তি ঘটে খেজুরিতে ভারতের সর্বপ্রথম ডাকঘর ও ডাকঘরের সঙ্গে যুক্ত সর্বপ্রথম টেলিগ্রাফ কেন্দ্রটিও। কালের বিবর্তনে সবই খন্ডহরে পরিণত । শিবপুরের শিবচন্দ্র নন্দী যেমন তাঁর কর্ম দিয়ে অমর হয়ে থাকলেও আমরা কতটুকু মনে রাখতে পেরেছি তাঁকে।তেমনই অতীতের গৌরবময় ইতিহাসের নির্মম স্বাক্ষী হয়ে খেজুরির টেলিগ্রাফ কেন্দ্রটি আজ খন্ডহরে পরিণত।
তথ্য ঋণ ও কৃতজ্ঞতা
১। কলকাতার কলহকথা- সুভাষ সমাজদার
২। খেজুরী বন্দর-মহেন্দ্রনাথ করণ
৩। কাঁথির পুরাবৃত্ত – সুনীল ঘোষে
৪। হিজলীনামা-ড.প্রেমানন্দ প্রধান
আমি ১৯৬০ সাল নাগাদ প্রথমেই ডাকঘরে আসি কারণ তখন আমি স্থানীয় খেজুরি আদর্শ বিদ্যাপীঠের নবম শ্রেণী ছাত্র ছিলাম তখনই ডাকঘরের অবস্থা বা ডাকবাংলোর অবস্থা অত্যন্ত ভালো ছিল। ডাক বাংলোতে থাকা যেত। এবং থাকার ব্যবস্থাও ছিল। আর এই ডাকঘরের ভেতর দিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠা যেত। আমরা উপরে উঠে ওপর থেকে সামনের খেজুরি সমুদ্র দেখতাম এই ডাকঘরের নিচে অনেকটা জায়গা জুড়ে সুন্দর জঙ্গল বা গাছ ছিল তার মাঝখানে একটা পুকুর ছিল আমরা ওখানে পিকনিক করতাম। শুধু একবার নয় বেশ কয়েকবারই আমরা এখানে পিকনিক করতে আছি শেষে প্রায় ১৫ বছর আগে ফ্যামিলি নিয়ে এখানে পিকনিক করি এবং তখনও সেই ঘোরানো দিয়ে ওপরে উঠি আমার সঙ্গে কলিকাতার ডাক্তার রামমোহন পারিয়া ও উনার স্ত্রী অজন্তা পারিয়া ও বাহিরি স্কুলের হেডমাস্টার মশাই ওনার স্ত্রী কল্পনা দেবী ছিলেন আমাদের সবার ছবি এখনো পর্যন্ত এই ডাকঘরের ঘোরানো সিড়ির ওপরে আছে।