আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা আসলে সরকারি ঘোষণার তুলনায় ১০গুণ বেশি। এই তথ্য জানিয়েছেন, সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের গবেষকরা। ওয়াশিংটনের গবেষণা সংস্থাটির মতে মৃত্যু বেড়েছে দ্বিতীয় ঢেউ-এ। শুধু সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন সেরো সমীক্ষা এবং বাড়ি বাড়ি ঘুরে যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে তার থেকেই এই হিসেব পাওয়া গেছে।
নিহত, আহত, ক্ষতিগ্রস্থ সবকিছুর সংখ্যা কমিয়ে বলাটা প্রায় সব সরকারেরই যেন একটা সাধারণ নিয়ম। অতিমারির সময়ে কিছু দেশের সরকার যেন সে ব্যাপারে একটা রেকর্ড তৈরি করেছেন। তবে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে আমাদের ভারত। দেখেশুনে বব ডিলানের গানটা একটু ঘুরিয়ে বলতে ইচ্ছে করে – আর কতজন মরলে পরে তবে সে ‘অনেক’ হবে। বাস্তব অবস্থাটা ঢাকতে গিয়ে এরা মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন। মৃতের সংখ্যাকে অনেক কমিয়ে দেখানো হচ্ছে।

সরকারি হিসেবে ২০২১ এর জুন অবধি ভারতে কোভিডের মৃতের সংখ্যা ৪ লক্ষ। সরকারি তথ্য সবসময় প্রকৃত সংখ্যার পিছনে পিছনে হাঁটছে। কারণ তাদের কাছে তথ্য আসছে অনেক দেরিতে। বেসরকারি হিসেব নয়, নিজেদের নির্ভরযোগ্য সুত্রের সঙ্গেও তাদের হিসেব মিলছে না। স্টেটস সিভিল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম, ইন্ডিয়ান সেরো-প্রিভিলেন্স সার্ভে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এজ স্পেসিফিক ইনফেকশন মর্টালিটি রেটস; কনজিউমার পিরামিড হাউসহোল্ড সার্ভে – সবার থেকেই পিছিয়ে আছে সরকারি হিসেব। তার ফলে বাস্তব চিত্রটাই পাওয়া কঠিন। অথচ এখন প্রকৃত তথ্য পেতে হলে এই সমীক্ষাগুলির সহায়তা নেওয়াটাই নিয়ম। এটা না করায় প্রকৃত ছবিটা সামনে আসছে না, ব্যহত হচ্ছে রোগ নিরাময়ের কাজ। কিছু সাংবাদিক ও গবেষকের একান্ত প্রচেষ্টায় সেকেন্ড ওয়েভে অবস্থাটা একটু বদলেছে।
সিভিল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের পরিসংখ্যান থেকে আমরা অন্ধ্র, বিহার, ছত্তিশগড়, কর্ণাটক, কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, এবং উত্তরপ্রদেশের হিসেব পাচ্ছি। সরকারি হলেও এরও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ সিভিল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম সবসময় মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখায়। ২০১৯ এ মাত্র ৮৬ শতাংশ মৃত্যুর হিসেব নথিভুক্ত করা হয়েছিল, যদিও প্রকৃত সংখ্যাটা ছিল আরও বেশি। আটটা গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের মৃত্যুর হিসেব কম হওয়া, দেশের সামগ্রিক মৃত্যুর সংখ্যাটাই ভুল করে দেবে। জাতীয় পর্যায়ে কোভিড মৃত্যুর হিসেব জানার ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হল ২০২০ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ এর জানুয়ারি পর্যন্ত হওয়া থার্ড সেরো সার্ভে এবং ২০২১ মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে জুনের প্রথম ভাগ অবধি চলা সাম্প্রতিক হু এইমস সার্ভে। তাতে দেখা যাচ্ছে মার্চের মাঝামাঝি (ফার্স্ট ওয়েভ) পর্যন্ত সংক্রমণের হার ছিল ২৫ শতাংশ এবং জুনের শেষে (সেকেন্ড ওয়েভ) তা দাঁড়ায় প্রায় ৬৫ শতাংশ।

আমাদের দেশের মৃত্যুর হার হিসেব করার ব্যাপারটা বড়ই দুর্বল, সংক্রমণে মৃত্যুর হারের হিসেবের একইরকম দুরাবস্থা। আমরা তাই সংক্রমণে মৃত্যুর আন্তর্জাতিক হার দেখে হিসেব করি। এই হিসেবে দেখা যাচ্ছে কোভিডের ফার্স্ট ওয়েভে দেশে মারা গেছেন ১.৫ মিলিয়ন মানুষ। আরও ২.৪ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছে সেকেন্ড ওয়েভে। এইসব তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিজ্ঞান নির্ভর বিশ্লেষণ করেই এগোতে হবে। এক্ষেত্রে ন্যাশনাল হেলথ মিশন সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির পাওয়া তথ্য বিচার করেই এগোতে হবে আমাদের। হিসেব কম দেখিয়ে রোগ তাড়ানো যাবেনা। তথ্যের ভিত্তিতে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে সরকারকে। অস্বীকার করলেই তথ্য মিথ্যে হবেনা।