আমরা দাঁড়িয়েছিলাম দুই সর্দারের ঠিক পিছনে। দুর্বোধ্য পাঞ্জাবী ভাষায় চাপা স্বরে কদাচিৎ কথা বলছেন ওঁরা। ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে দেখি অন্তত ১৫ মিনিট আমরা চারজন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। অনড়।
গান্ধিপরিবারের খাবার ঘরের মেঝে জোড়া সাদা জমির ওপর রঙীন কাজ করা কার্পেট পাতা — আগেই বলেছি। এর বাইরে দায়িত্বে থাকা সুবেশ তরুণী তোতাবুলি আওড়ায় — “প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো এই কার্পেট। এলাহাবাদের আনন্দ ভবন থেকে নিয়ে আসা। খাস পার্সিয়ান।”পাশের অ্যান্টি চেম্বারে গদি ও হাতলওলা আনকোরা চারটি চেয়ার পাতা। ১৯৮৪ -র ৩০ অক্টোবরই এই চেয়ারগুলি আনা হয়েছিল। ইন্দিরাজীর তাতে বসা হয়ে ওঠেনি। সুবেশ তরুণী আরও জানালেন প্রায় বছর তিরিশ আগে এখন যে রাস্তা দিয়ে শহীদ বেদীতে যেতে হয় সেখানে যাবার আগে চমকে-থমকে দিত ইন্দিরার কণ্ঠস্বর — “আই অ্যাম প্রাউড অব ইন্ডিয়া…।” রঙীন ছবিতে ঝলমল করে উঠত প্রিয়দর্শিনীর মুখ। পর্দায় মূর্ত ইন্দিরা। স্বদেশে ও বিদেশে। উনি হাসছেন, হাঁটছেন, কথা বলছেন, ভাষণ দিচ্ছেন।

এক নম্বর সফদরজং রোড দিল্লির ট্যুরিস্ট ম্যাপের আদলটা পাল্টে দিয়েছে। যন্তর মন্তরে বহুদিন হলো ট্যুরিস্ট বাস আর থামে না। পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে একঝলক দেখতে দেয় চালক। আরএক প্রান্তে কুতুব মিনার, অন্যপ্রান্তে লাল কেল্লা। মাঝে গান্ধি স্মৃতি, তিনমূর্তি ভবন ইত্যাদির ভিড়ে এক নম্বর সফদরজং রোড ও এক নম্ব আকবর রোডের দুটি বাংলো নিয়ে “ইন্দিরা গান্ধি মেমোরিয়াল”। ট্যুরিস্ট বাস থেকে নামে যতজন, তার কয়েকগুণ বেশি মানুষ হেঁটে-ছুটে আসে ইন্দিরার কাছাকাছি। আর আসে বলেই দিনে দিনে জমে উঠেছে ব্যাবসা। ফুলওলা থেকে ছবিওলা। বিক্রি হয় ইন্দিরার ছবি। জীবনে, মৃত্যুর। উদ্যোগী প্রকাশকের ছাপা হিন্দি-ইংরেজি চটি বইয়ে ইন্দিরার সংক্ষিপ্ত জীবনী আজও বিক্রি হচ্ছে হই হই করে। দিল্লি সমাধি শহর। কয়েকটি অস্বাভাবিক মৃত্যু আরও কয়েকটি সমাধি নিবেদন করেছে রাজধানীকে। স্মৃতি ফিকে হয় ক্রমশ। সত্যি? কিন্তু উদ্যোগ? সব জায়গায় তো তা সমান নয়! ইন্দিরা মেমোরিয়াল-এর এক মাইলের মধ্যেই দীনতর হচ্ছে “গান্ধি স্মৃতি”। গান্ধির স্মৃতিতে প্রহরী নেই। ঢোকার মুখে চায়ের ঝুপড়ি, দেহাতি আড্ডাখানা ও প্রাকারকে ঘিরে পার্মানেন্ট ইউরিন্যাল, প্রাচীন, প্রবীণ এবং স্মৃতিভারে নূয়ে পড়া মানুষদের ব্যথিত করে নিশ্চয়। একদা বিড়লা হাউস বলে পরিচিত গান্ধিজীর স্মৃতি বিজড়িত ভবন এটি। এখানেও ফটক আছে প্রহরী নেই, বই বিক্রির কাউন্টার আছে, ক্রেতা নেই, দর্শনীয় বস্তু আছে দর্শনার্থী কম। তিনমূর্তি ভবনে আনাগোনা “গান্ধি স্মৃতি”-র থেকে বেশি। তবে নেহরুর থেকে বেশি টান প্ল্যানেটোরিয়ামের। স্মৃতি ফিকে হয় কি? নইলে সব আকর্ষণের অর্ধেক ইন্দিরা আজও কেড়ে নেন কেমন করে।

ইন্দিরা গান্ধি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট যখন গঠিত হয়, দায়িত্ব তখন মহম্মদ ইউনুসের কাঁধে। গান্ধি পরিবারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত ট্রেড ফেয়ার অথরিটি অব ইন্ডিয়ার তৎকালীন চেয়ারম্যান এই ‘ইউনুস চাচা’-র কাছ থেকেই মেমোরিয়াল গড়ার প্রথম প্রস্তাবটি এসেছিল বলেও শোনা যায়। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথমে ভাঙাচোরা শুরু হয় একতলার এই বাংলোটির। পরবর্তিকালে ইউনুস চাচা দিল্লির দ্রষ্টব্যের তালিকার প্রথম সারিতে এনে ফেলেছেন এক নম্বর সফদরজং রোডকে।

দুই সর্দারের কথা আগেই জানিয়েছি। ঢোকার সময় দাঁড়িয়েছিলাম দুই সর্দারের ঠিক পিছনে। বেরোবার সময় একেবারে পাশাপাশি। আলাপ তখনই। দুজনের মধ্যে যিনি বয়স্ক, পরিচয় জানিয়েছিলেন, লুধিয়ানায় উলের কারবারি। সর্বজিৎ সিং। সঙ্গী যুবকটি ভাইপো, সুবিন্দর। সর্বজিতের তামাটে চোখমুখে সাদা গোঁফ-দাড়ি, সাদা পোশাক ও শ্বেতশুভ্র পাগড়ি পঁয়ষট্টি বছরের এই মানুষটিকে শান্ত এবং সৌম্য করে তুলেছে। একমুঠো লাল গোলাপের পাপড়ি শহীদ বেদিতে ছড়াতে দেখেছি এই মানুষটিকে আরও অনেকের সঙ্গে। জীবনের আগাগোড়া শিখ ধর্ম থেকে অবিচ্যুত সর্বজিতের ‘ইন্দিরা গান্ধি মেমোরিয়াল’-এ এটি ষষ্ঠ প্রবেশ। এবার এসেছেন ভাইপোকে নিয়ে। আঠারো বছরের পেশীবহুল, ক্ষীণ কটি এবং স্বল্পবাক সুবিন্দর জ্যাঠামশাইকে পিছনে রেখে গাড়িতে গিয়ে বসে। সর্বজিৎও চলে যাচ্ছিলেন। যাবার আগে বলে গেলেন “ঘুরে ফিরে এখানে আসি। আসবও। আর সবসময় আনার চেষ্টা করি সুবিন্দরদের মতো রাগী উদ্ধত যুবকদের। গান্ধিজী এবং ইন্দিরাজীর স্মৃতির সামনে দাঁড় করিয়ে ওদের বলতে বলি, “এস, রক্ত নয়, ঘৃণা ঝরাই। মন পবিত্র হোক, প্রেমে পূর্ণ হোক হৃদয়”।

ওঁরা চলে গেলেন। একে একে আরও অনেকে। এক নম্বর সফদরজং রোডের ফটকে তবু দীর্ঘ প্রতীক্ষা। নানা প্রদেশের, নানা স্বভাবের, নানান ভাষাভাষীর ভিড়। জানতে ইচ্ছে হয়, এঁদের মধ্যে কারা ওই শহীদ বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁচের খাঁচার দিকে তাকিয়ে নিরুচ্চারে বলে ওঠেন, — “বেশ কিছুকাল হোল চ’লে গেছো, প্লাবনের মত/একবার এসে ফের,…”