আজ ১৯ জুলাই ২০২১। ৫২ বছর আগে এই ১৯ জুলাই তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৪টি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর সেই ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ ছিল দেশের অর্থনীতির একটা মোড় ঘোরানো পদক্ষেপ। সেই পদক্ষেপের ২০ বছর পর দেখা গেল সারা ভারতেই ওই ১৪টি ব্যাঙ্কের শাখা অনেক বেড়েছে, কর্মী সংখ্যাও অনেক বেড়েছে, আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে, আমানতের পরিমানও বেড়েছে। যারা এই খবর পড়ছেন তাঁরাও তাঁদের পাড়ায় কোনও না কোন রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের একটা শাখা পাবেনই।
আমফান বা ইয়াসে বিধ্বস্ত পরিবারগুলির বেশির ভাগেরই কোনও না কোন ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে। জাতীয়করণের আগে কিছু উচ্চবিত্ত মানুষ ব্যাঙ্কে টাকা রাখতেন। সেই টাকা নিয়ে শিল্পপতিরা ব্যবসা চালিয়ে মুনাফা করতেন। সেই অবস্থা জাতীয়করণের পরেও আছে, নতুবা দেশে শিল্পের প্রসার হবে না, ব্যাঙ্ক ব্যবসা চলবে না। পার্থক্য হলো—তখন ওই বেসরকারী মালিকানাধীন ব্যাঙ্কগুলি শুধু শিল্পপতিদেরকেই ঋণ দিত। এখন ফুটপাথে যে ভারতবাসী ছেঁড়া জুতো মেরামতের কাজ করেন, দীঘার সমুদ্রের ধারে যিনি মাছভাজা বিক্রি করেন, গ্রামে যে প্রান্তিক চাষী চাষ করেন তারাও ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পান। বিগত ৫০ বছরে কত কোটি মানুষ যে নিজ উদ্যোগে ব্যাঙ্কের ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছেন তার নির্দিষ্ট হিসেব নেই।

তবে এর পেছনে আছে ব্যাঙ্ক ঋণের সুবিধে। গরিব পরিবারের কত ছেলে-মেয়ে ব্যাঙ্কের ঋণ নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন তারও হিসেব নেই। কিন্তু প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আছে। সেই রাষ্ট্রয়ত্ব ব্যাঙ্ক শিল্পকে ধ্বংস করতে চাইছে কেন্দ্রের মোদী সরকার। বেসরকারী ব্যাঙ্কগুলি গ্রামে শাখা খোলে না। তারা শহর ও মফস্বলে ব্যবসা করে। তাতেই বছরে তারা ২০/২৫ হাজার কোটি টাকা লাভ করে। ব্যাঙ্ক ব্যবসায় যদি বেসরকারী ক্ষেত্রকে ঢুকতে না দেওয়া হতো তাহলে এই বিরাট পরিমান লাভ রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের তহবিলেই যেত। কেন্দ্রীয় সরকার এখন ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ক-সহ কয়েকটি ব্যাঙ্ককে বেসরকারিকরণ করতে চাইছে, আবার ৩/৪টি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের সংযুক্তি ঘটিয়েছে। এই সংযুক্তির ফলে এখনই কোনও অফিসার বা কর্মী ছাঁটাই না হলেও ৫/১০ বছরের মধ্যে যারা অবসর নেবেন, তাদের জায়গায় আর কাউকে চাকরি দেওয়া হবে না। তাতে ব্যাঙ্ক কর্মীর সংখ্যা কমবে।

রবিবার ১৮ জুলাই ২০২১ অলইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক অফিসার্স কনফেডারেশন একটি সভার আয়োজন করেছিল, আলোচনার বিষয় ছিল ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ কি জনস্বার্থে? ভার্চুয়াল এই সভায় সকল বক্তাই বলেন, ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণে উপকার হবে কিছু বড় কর্পোরেট হাউসের। সাধারণ মানুষের কোনও সুবিধে হবে না। অর্থনীতিবিদ অমিয় বাগচী বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কগুলি সাধারণ মানুষের আমানতকে সুরক্ষা দিয়েছে, গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নে ভূমিকা নিয়েছে। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন, আইআইএম কলকাতার অধ্যাপক পার্থপ্রতিম পাল, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রশান্ত রায়, সেন্ট জেভিয়ার্সের অধ্যাপক রঞ্জনেন্দ্র নাগ, আজিম প্রেমজী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিকো দাশগুপ্ত প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু।
তাদের সকলের বক্তব্যেই ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের বিপদজনক দিকগুলি উঠে আসে। বলা হয় যাদের জন্য অনাদায়ী ঋণের পাহাড় জমেছে সেই কর্পোরেটদের কাছেই কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কগুলিকে বেচে দিতে চাইছে। ব্যাঙ্ক অফিসার্স কনফেডারেশনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৌম্য দত্ত বলেন, ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে অফিসার্স এবং কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করবেন। এই আন্দোলনের প্রস্তুতিতেই জনগণের মধ্যে চেতনা বৃদ্ধিতে বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হচ্ছে।