লক ডাউনের আগের কথা। আন্দাজে মনে হলো, অন্তত ১০০ মানুষের পিছনে দাঁড়িয়ে আছি। নিশ্চল। সঙ্গে আমার এক আত্মীয় কাম বন্ধু। তাঁর আবার ফটোর নেশা। না মোবাইলে নয়। রীতি মতো দামী ক্যামেরায়। লাইনটা আগে-পিছে টেরে বেঁকে গেছে। কোলে-কাঁখে শিশু নিয়ে লাইনেই বসে গেছে কেউ কেউ। একেবারে সামনের দিকে জটলা, ঠিক যেমনটা খেলার টিকিটের কিংবা সিনেমার কাউন্টারের সামনে দেখা যায়। দুপুর দুটো-আড়াইটে হবে। নিউ দিল্লি থেকে জম্বু রাজধানীর সময় রাত ৮ বা ৯টা নাগাদ হবে। হাতে অনেকটা সময়। তারই সদব্যবহার।
এক নম্বর সফদরজং রোডের মূল ফটকে সজাগ প্রহরী। বন্দুক ও বেয়নেটধারী। মেটাল ডিটিকটরের খাঁচাটি তেমনই রয়েছে, যেমন রাখা শুরু ১৯৮২ সালের মাঝামাঝি থেকে। পাশে সাদা পোশাকের রক্ষক জনা পাঁচেক। ডানদিকে ঠাণ্ডা জলের কল। তবে মিনারেল ওয়াটারের বোতলের দৌলতে সেখানে ভিড় বেশ কম। তবু শান্ত অথচ ক্লান্ত মানুষের লাইন ছেড়ে এক নিঃশ্বাসে তৃষ্ণা মেটানোর সু-বন্দোবস্ত। দেখতে দেখতে ট্যুরিস্ট বোঝাই আরও কটি বাস এসে থামল সফদরজং রোডের ওপর। পিছনে লাইন বাড়ে। এঁকে বেঁকে।

দু-দফায় এ বাড়িতে বিশটা বছর থেকেছেন ইন্দিরা গান্ধি। প্রথম দফায় চৌষট্টি থেকে সাতাত্তর। তারপর আশি থেকে চুরাশির একত্রিশে অক্টোবর। সাদা একতলা ব্রিটিশ আমলের সরকারি বাংলো স্নো হোয়াইট পেন্ট-এ মাখামাখি। রক্তকরবী আর বোগেনভিলা মিলেমিশে লতিয়ে-নেতিয়ে-এলিয়ে ছায়া ছায়া করে রেখেছে গাড়িবারান্দার সামনেটুকু। সবুজে মাখামাখি আশপাশে নামগোত্রহীন অজস্র পাখির আনাগোনা। দিল্লি সশস্ত্র পুলিশের কনস্টেবলরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভিড় সামলায়। অবাঞ্ছিত প্রবেশ রোখে। শতখানেক মানুষের দীর্ঘ নীরব থমকানো মিছিল। কারণ তখন ভেতরে রয়েছেন অন্য দেশ থেকে আগত একদল প্রতিনিধি। সেই কারনে লাইন লম্বাটে হয়। দেখে মনে হয়, হঠাৎই যেন আমরা সভ্য হয়ে গেছি। কারও যেন কোনও তাড়া নেই। খর তাপ সত্ত্বেও নিরুত্তাপ-নিরুত্তেজ মানুষ — পুজোর ডালি হাতে দক্ষিণেশ্বর বা কালীঘাটের মন্দিরে চাতালে যেমনটি দেখা যায়।

গাড়ি বারান্দার ডান হাতে ‘ইন্দিরা গান্ধি মেমোরিয়াল’-এর প্রবেশদ্বার। তেরচাভাবে ইন্দিরার বিশাল একটা ছবি বাইরে থেকেই চোখে পড়ে। এপাশে বাঁ দিকে অভ্যর্থনা কক্ষ। প্রিয়দর্শিনীর দর্শনার্থীদের ওখান থেকেই শেষ ছাড়পত্রটি নিতে হতো। স্মৃতিসৌধে প্রবেশের অনুমতি মিলল যখন, লাইনের শেষ ততক্ষণে বেঁকে চুরে অদৃশ্য। দফায় দফায় পঁচিশ-তিরিশ জনের অনুমতি। লাল গোলাপের পাপড়ি আর ধূপের ধোঁয়ায় শুরু থেকেই একটা মন্দির মন্দির ভাব। কাঠের প্যানেল করে দেয়ালে লাগানো নানা বয়সের নানা মাপের ইন্দিরা। শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং প্রৌঢ়ত্বের স্মৃতি লাফে লাফে এগিয়ে গেছে। এখানে আগত তরুণ-তরুণী প্রয়োজনে একে অপরকে ব্যাখ্যা করে দেয়, কোন ছবির কী প্রেক্ষাপট। কোন ছবির তাৎপর্য কতখানি। ফিসফিসিয়ে সেই ব্যাখ্যা এখনও চলে… আগামীতেও চলবে।

আগে ছিল কিনা জানি না, তবে ‘ইন্দিরা গান্ধি মেমোরিয়াল’-এর প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই গোটা একতলা সাদা বাড়িটা শীতে গরম, গরমে ঠাণ্ডা। ঢুকেই পাশাপাশি তিনটি ঘরে ছবি আর পেপার কাটিং-এ বোঝাই। তারপরেই ইন্দিরার ড্রইংরুম। একপাশের ইট-পাথরের দেয়াল ভেঙে কাঁচ বসানো হয়েছে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত। ঘরের ভিতর উজ্জ্বল আলো। ড্রইংরুমের একপাশে সোফা সেট, অন্যদিকে বইয়ের পাহাড়। তারপরের কক্ষে আছে রাজীব গান্ধীর স্মৃতি সমূহ। শৈশবে বোর্ডিং-এ থাকার সময় কোন এক সন্ধ্যায় বা সকালে মা-কে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করে আঁকা বাঁকা হাতের লেখায় রচিত চিঠি। দাদুর সঙ্গে নানা মুহূর্তের ছবি। মারা যাবার পর পরনের পাজামা ও জুতো — শতছিন্ন, রক্তের দাগ কালো হয়ে আসা। এসব দেখে সবুজ লনের পাশ দিয়ে বাঁধানো পথ পেরিয়ে চাতাল। সেখানে ইন্দিরার প্রিয় অর্কিডের প্রদর্শনী। প্রতিদিন সময় করে উনি নাকি নিজে হাতে পরিচর্যা করতেন ওগুলির। তার পাশেই গান্ধি পরিবারের খাবার ঘর। সেই বিশাল লম্বা টানা টেবিল — সোনিয়ার কথা অনুযায়ী, যেখানে খেতে বসে হিন্দি ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় কথা বলাটা ছিল গান্ধি পরিবারের কাছে অপরাধের শামিল। খাবার ঘরের মেঝে জোড়া সাদা জমির ওপর রঙীন কাজ করা কার্পেট। পাশেই ছোট্ট একফালি ঘর। ইন্দিরার অ্যান্টি চেম্বার। সকালের সাক্ষাৎপ্রার্থীদের ওই অ্যান্টি চেম্বারেই নাকি এনে বসানো হতো। প্রাতরাশ সেরে ইন্দিরা আসতেন। প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে ঘর থেকে বেরিয়ে সবুজ লনের বুকচেরা পাথুরে পথ ধরে এগোতেন আকবর রোডের বাংলোর দিকে। সফদরজং রোডের বাংলোয় বসবাস, আকবর রোডের বাংলোয় অফিস। অফিসের পাশেই প্রশস্ত লনে বছরভর আলোছায়ার খেলা। তিরতিরে ছায়া মাড়িয়ে ইন্দিরা মিলতেন একেক দিন একেক দলের সঙ্গে। প্রায় প্রতিদিনই দলে দলে হাজির হতেন সাধারণ মানুষ। উনি যেতেন, কথা বলতেন, ছবি উঠত। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ওখানেই হাজির ছিলেন দলবল ও টিভি ক্যামেরা নিয়ে পিটার উস্তিনভ। ইন্দিরাও যাচ্ছিলেন সেদিকেই। সতবন্ত-বেয়ন্তেরা যেখানে ওঁর যাত্রা ভঙ্গ করে। টিভির ক্যামেরা ছিল সেখান থেকে গজ পঁচিশেক দূরে মাত্র।

‘ইন্দিরা গান্ধি মেমোরিয়াল’-এর প্রতিষ্ঠার পর এই পথটি এখন বন্ধ। ওই পাথুরে রাস্তাকে বেড় দিয়ে ডানদিক থেকে এগিয়ে গেছে আরও একটি রাস্তা। সে পথেই এখন এগোতে হয় সবাইকে। বেশিক্ষণ দাঁড়াবার অনুমতি নেই কোথাও। এখানেও নয়। দেখতে দেখতেই এগোনো, এগোতে এগোতেই দেখা। এভাবে এগিয়েই বধ্যভূমি। ইন্দিরা মেমোরিয়ালের শেষ এবং প্রধান দ্রষ্টব্য যেটি। গুলিবিদ্ধ ইন্দিরা যেখানে পড়েছিলেন, পাথুরে পথের সেই অংশটুকুর ওপর কাঁচের এক খাঁচা পাতা। হাঁটা পথের ওপর জমাট বাঁধা রক্ত শুকিয়ে কালো ছোপ ছোপ হয়ে গেছে। রক্তের সেই কালচে ভাব যাতে কালোই থাকে চিরটাকাল, সে উদ্দেশ্যেই ওই খাঁচা তৈরি। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে তৈরি ওই কাঁচের খাঁচা সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধকারী। সেদিন গুলি ছুটেছিল ঝাঁকে ঝাঁকে। সেইসব গুলির ফাঁকা শেল যেখানে যেখানে পড়েছিল, সে জায়গাগুলি সাদা রং দিয়ে গোল গোল করা। কাঁচের খাঁচাকে সামান্য পিছনে রেখে টানটান দাঁড়িয়ে দুই সশস্ত্র প্রহরী। প্রতিদিন। অষ্টপ্রহর। তাঁদের আগেই কাঁচের বেড়া একটা। সেই বেড়ায় হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা ইন্দিরার বহু প্রচারিত সেই শেষকথা — “ইফ আই ডাই আ ভায়োলেন্ট ডেথ অ্যাজ সাম ফিয়ার অ্যান্ড আ ফিউ আর প্লটিং …।” তারই সামনে তৈরি হয়েছে বেদি। আঁচলা ভরে ফুল দেন প্রতিদিন কেউ না কেউ। সে সময় তোতাবুলি আওড়ায় গাইড, “ইন্দিরাজী উধারসে ইধার আ রহী থী…। ওইখানে তাঁকে গুলি মারা হয়, এইভাবে তিনি লুটিয়ে পড়েন,” ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপরের ঘটনা সকলের জানা। পলকহীন চোখে সকলে তাই চেয়ে থাকে কালচে হয়ে যাওয়া রক্তের দিকে। কেউ কেউ করজোড়া।