আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে, ১৯৬৭ সালে মহাজাতি সদনে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে শেষবার সংগীত পরিবেশন করেছিলেন ইন্দুবালা দেবী। তাঁকে বলা হতো নজরুলগীতির সম্রাজ্ঞী এবং বাংলার বুলবুল। নজরুলের গান যে বাঙালির ঘরে ঘরে সমাদৃত হয়েছে সে ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা রামবাগানের ইন্দুবালার। কেন রামবাগান অঞ্চলের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে? এই অঞ্চল তো কলকাতার কোনও অভিজাত এলাকা নয়। কিন্তু উত্তর কলকাতার এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই নজরুলের গান দুই বাংলায় মুখরিত হয়েছিল।
ইন্দুবালা দেবীর মা রাজবালা দেবী প্রথম জীবনে ছিলেন ‘দ্য গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’ বা ‘বোসে’স সার্কাস’এর শিল্পী। কবি-নাট্যকার মনোমোহন বসুর দ্বিতীয় পুত্র মোতিলাল বসু ছিলেন এই সার্কাসের প্রাণপুরুষ। ইন্দুবালা দেবীর মা রাজবালা দেবী সার্কাসে দারুণ খেলা দেখাতেন। রাজবালার আরেক বোন ট্রিম্বকরাও দেবলের সার্কাস দলে যোগ দেন। বোস সার্কাস কোম্পানির মোতিলাল বসু রাজবালাকে বিবাহ করেন। কিন্তু পরে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ইতিমধ্যে ১৩০৫ বঙ্গাব্দের ১৯ কার্তিক অমৃতসরে ইন্দুবালার জন্ম। মোতিলালবাবুর সার্কাস কোম্পানি সেখানে খেলা দেখাতে গিয়েছিল। এর পর রাজবালা সার্কাস থেকে সরে এসে সংগীতচর্চায় মন দেন। ফলে ইন্দুবালাও গানের আলো বাতাসে বড়ো হন।
ইন্দুবালা গান শেখা শুরু করেন গৌরীশঙ্কর মিশ্রের কাছে। তিনি সে সময়র শ্রেষ্ঠ গায়িকা-সুন্দরী গহরজানের কাছেও নাড়া বেঁধেছিলেন। পরে তালিম নিয়েছেন জমীরুদ্দীন খাঁ এবং এলাহি বক্সের কাছেও।
১৯২৭ সালে আকাশবাণী প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পরের দিন থেকেই রেডিওয় নিয়মিত গান করেছেন ইন্দুবালা দেবী। ক্রমশ তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর গলা খেলতো অসাধারণ। সূক্ষ্ম দানাকারির কাজে অল্পবয়স থেকেই দারুণ পারদর্শী। ছোট্ট সুরের মোচড়ে রাগরূপ খুলে দেওয়া তাঁর বৈশিষ্ট্য ছিল। কিছুদিন পরেই রেকর্ডে তাঁর গান শুনে প্রশংসা করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে গান দিতে রামবাগানের বাড়িতে আসেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিজে।
এক শিক্ষিত সুদর্শন যুবকের সঙ্গে ইন্দুবালার বিবাহ হয়, কিন্তু সেই যুবকের পরিবার জানতে পেরে তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। সম্পত্তি হারানোর ভয়ে ইন্দুবালা দেবীর স্বামী ফিরে যান নিজের পরিবারে। নিজের এই পরিচয় বা অতীতকে কখনও আড়াল করেননি বাংলার বুলবুল ইন্দুবালা।
তাঁর কণ্ঠে নজরুলের গান পৃথিবীজোড়া সমাদর পায়। রেকর্ডে প্রথম তাঁর নজরুলগীতি ‘অঞ্জলি লহ মোর’ এবং ‘আজ বাদল ঝরে সন্ধ্যায়’ আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ ছাড়া ‘কাজরী গাহিয়া চলে গোপললনা’, ‘কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী’— এরকম অসংখ্য গান উল্লেখ করা যায়। ঠুমরি অঙ্গের গানে ইন্দুবালা দেবীর ছিল বিশেষ দখল। মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ নাটকে কাজী সাহেবের গান ‘তিমির বিদারী অলখ বিহারী কৃষ্ণ মুরারি আগতৈ’ সারা বাংলা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বড়ো বড়ো মিছিল-মিটিংএ ‘তিমির বিদারী’ গানটি গাওয়া হতো। কাজী নজরুলও একের পর এক গান ইন্দুবালাকে দিয়ে গাইয়েছেন। একইসঙ্গে ইন্দুবালা গেয়েছেন ঠুমরি, চৈতি, গজল, দাদরা, শ্যামাসংগীত, কীর্তন, রামপ্রসাদী প্রভৃতি। মঞ্চে অভিনয়ও করেছেন। যাঁদের সঙ্গে বাংলা মঞ্চে কাজ করেছেন, তাঁরা হলেন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার, দানীবাবু, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, অহিন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ।
সে সময় সংগীত বা অভিনয়কে আশ্রয় করে যাঁরা জীবন কাটিয়েছেন, তাঁদের প্রতি তথাকথিত বাঙালিবাবুরা ঘৃণার মনোভাব পোষণ করতেন। রামবাগানের কাছেই কলকাতার বিখ্যাত সোনাগাছি অঞ্চল। কিন্তু ইন্দুবালা কখনও এই বাড়ি ত্যাগ করেননি। বরং তাঁর গান শুনতে এসেছেন বা যোগাযোগ করেছেন গৌরী বসু, সমরেশ বসু, মুজফফর আহমেদ, গৌরকিশোর ঘোষ, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, মণীন্দ্র রায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ। আজও ইন্দুবালা দেবী কিংবদন্তির আরেক নাম।
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২৫ মে ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত