অর্থনৈতিক অসাম্য তো ছিলই, অতিমারি সামনে আনলো বিশ্বে রোগ নিরাময়ের অসাম্যকেও। বিশেষজ্ঞরা এখন বলছেন, উন্নত দেশগুলি টিকাকরণ ও অন্যান্য সুরক্ষার মাধ্যমে নিজেদের দেশের মানুষজনকে যতই কোভিডমুক্ত করার চেষ্টা করুক না কেন, পৃথিবীর একটি দেশেও কোভিড থাকলে সেখান থেকে পরবর্তী পর্যায়ে সংক্রমণ ছড়ানোর বিপদ থেকেই যাবে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথ স্কুলের বিশেষজ্ঞরা খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছেন— ভ্যাকসিন সাপ্লাইয়ে গ্লোবাল কোঅর্ডিনেশন গড়ে তোলা না গেলে অসুস্থতা ও মৃত্যু কমবে না। এক্ষেত্রে অসাম্য সমাজ-অর্থনীতি-স্বাস্থ্য সবকিছুতেই ছাপ ফেলবে।
পাঠকদের মনে রাখতে হবে, কোভিড মোকাবিলায় অসাম্য কমাতেই ২০২০-র এপ্রিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এবং বিভিন্ন দেশের সরকারগুলির উদ্যোগে গড়া হয়েছিল নন প্রফিট সংস্থা কোভ্যাক্স। গোড়ার দিকে চমৎকার এগিয়েছিল ব্যাপারটা। ডোনেশন এবং ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির ২বিলিয়ন ডোজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করেছে কোভ্যাক্সের সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রভাবশালী দেশগুলির কাজকারবার। এরা ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির কাছ থেকে সরাসরি ভ্যাকসিন কিনে নেওয়া শুরু করায় ব্যহত হয়েছে এই প্রচেষ্টা।
অন্যদিকে ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারীরাও ব্যবসার স্বার্থে এদের ভ্যাকসিন বিক্রি করতে বেশি আগ্রহী। কোভ্যাক্সের লক্ষ্য ছিল আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকার একেবারে নিচেরতলার মানুষদের টিকাকরণ করা। এটা করতে গেলে ৪.৯ বিলিয়ন ডলার দরকার। সেই আর্থিক সক্ষমতা কোভ্যাক্স এখনও অর্জন করে উঠতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সহযোগিতার অভাবেই। শুনতে খারাপ লাগবে, তবুও বলি, টাকা ও ভ্যাকসিন না পেলে কোভ্যাক্সের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।

সব দেশের, বিশেষ করে গরিব দেশগুলির মানুষদের ভ্যাকসিন পাওয়া নিশ্চিত করার ব্যাপারটা শুধুই ধনী দেশগুলির বদান্যতা বা দান খয়রাতির ব্যাপার নয়। এটা সারা পৃথিবীর মানুষদের স্বাস্থ্যের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। অতিমারি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা ধনী দেশগুলির নিজেদের স্বার্থেও জরুরি। কোভিড মোকাবিলাকে অবশ্যই একটা দুনিয়াজোড়া প্রচেষ্টা হয়ে উঠতে হবে। কারণ সার্স কোভিড টু’র নতুন নতুন ভ্যারিয়ান্ট তৈরি হচ্ছে রোজ। অথচ ভারতের মত যেসব দেশে টিকাকরণ ঢিমেতালে এগোচ্ছে তাতে ভাইরাসের মিউটেট করার সুযোগ বাড়ছে। তাতে চলতি ভ্যাকসিনগুলির দ্রুত কার্যকারিতা হারানোর সম্ভাবনা বাড়ছে। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
টিকাকরণের সুযোগ কম এমন গরিব দেশগুলিতে এই বিপদ আরও বেশি। সেখানে আশানুরূপ টিকাকরণ না হওয়া বা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হওয়ার বিপদ কিন্তু ধাক্কা দেবে বিশ্ব অর্থনীতিকেও। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ বছর এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। কোভিড টিকাকরণে সাম্য না আনলে এই ঘটনা ঘটবেই। এই সাম্য আনাটাই এখন বিশ্ব অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।