প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে বিজেপির বড়-ছোট-মাঝারি সব নেতা ও মন্ত্রীদের মুখে এখন একটাই কথা, অনুপ্রবেশকারীতে দেশ ভরে যাচ্ছে। দেশের মানুষ আজ যে দুরবস্থায়, এই যে মূল্যবৃদ্ধি, এত যে বেকার, এ সবের কারণ অনুপ্রবেশ। প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ ঘটছে। অনুপ্রবেশকারীরা এ দেশের মানুষের রুটি-রুজি-রোজগার থেকে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা কেড়ে নিচ্ছে আর দেশের মানুষকে পোহাতে হচ্ছে অশেষ দুর্ভোগ। তাই বিজেপি অঙ্গিকার করেছে অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করে তাদের তাড়িয়েই ছাড়বে বিনিময়ে ফিরিয়ে আনবে দেশের মানুষের রুটি-রুজির গ্যারান্টি। প্রশ্ন এ পর্যন্ত কত জন বাংলাদেশী অবৈধভাবে এ দেশে ঢুকেছে? কোনো তথ্য বা পরিসংখ্যান কেন্দ্র সরকার বা বিজেপির কেউই বলছেন না। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি বাংলায় এসে অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এ রাজ্যে ২ কোটি অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। কিন্তু এখন প্রধানমন্ত্রী থেকে যে কোনো স্তরের বিজেপি নেতারা মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, স্বাস্থ্য-শিক্ষা-চিকিৎসা সংকট থেকে শুরু করে নারী নির্যাতনের মতো দেশবাসীর জীবনের গুরুতর সমস্যাগুলি বাদ দিয়ে শুধু অনুপ্রবেশ নিয়েই অনর্গল বলেই চলেছে অথচ অনুপ্রবেশকারীরা সংখ্যায় কত সেটা কেউই বলছে না।
অনুপ্রবেশ সব দেশেই কম-বেশি হয়ে থাকে। সারা দুনিয়াতেই অনুপ্রবেশ সমস্যা আছে। হাতে-পায়ে শেকল বাঁধা অবৈধ ভারতীয় অভিবাসী আমেরিকার বিমান থেকে দফায় দফায় আহমেদাবাদ ও অমৃতসর বিমানবন্দরে নামছে; এ দৃশ্য তো আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি। সেদিন আমেরিকার সরকার ওইসব ভারতীয়দের প্রতি অমানবিক আচরণ করেছিল কিন্তু আমাদের দেশের সরকার সেদিন কোনো প্রতিবাদ করেনি। পাশাপাশি একথাও ঠিক যে বাংলাদেশ থেকেও এ দেশে অনুপ্রবেশ ঘটে। যদিও সীমান্ত এলাকার দায়িত্বে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। কিন্তু এ কথা সুবিদিত যে, দীর্ঘকাল ধরেই বিএসএফ অনুপ্রবেশ এবং চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত। কেন্দ্র সরকার সে কথা ভালো করেই জানে। কিন্তু গত ১১ বছর ক্ষমতায় থাকা মোদী সরকার কী এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? সাধারণ পর্যটকরাও যে স্থলসীমান্ত পেরোতে কাস্টমস ও সেন্ট্রাল এক্সাইজের লোকেদের হেনস্থার শিকার হয় সেকথাও সকলে জানে।
আসলে অনুপ্রবেশ বিজেপির এক জিগীর। বিজেপিও জানে যে সাধারণভাবে গরিব দেশ থেকে ধনী দেশে দরিদ্র মানুষ কাজ আর রুজির টানে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বেআইনিভাবে পাড়ি দেয়। একইভাবে ভারত থেকেও বহু মানুষ আমেরিকা-সহ অন্যান্য উন্নত দেশে যায়। আমেরিকায় ভারতীয় অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে সবথেকে বেশি গুজরাটের মানুষ। সম্প্রতি ট্রাম্প যে সব বেআইনি বিদেশীদেশিদের ফেরত পাঠিয়েছে তাদের মধ্যে সর্বাধিক মানুষ গুজরাটের। মোদী সরকাছের কাছে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা না থাকলেও আমেরিকা সরকারের কাছে বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের তথ্য পরিসংখ্যান আছে। আসলে বাংলাদেশীরা অধিকাংশ মুসলমান বলে বিজেপির টার্গেট। মুসলিম নয় বলেই নেপাল, ভুটান, মায়ানমার থেকে আগত মানুষদের নিয়ে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিটা জমে না। আসলে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারী বাংলাভাষী বলে যে আক্রমণের লক্ষ্য করা হচ্ছে তার কারণ তারা মুসলমান বলে। তাছাড়া গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলিমদের যেভাবে ধরপাকড় করে হেনস্তা করা হচ্ছে সেটা পরিকল্পিত। বিজেপি গোটা দেশে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে যে বাংলাদেশি মুসলিমরা এসে জমি, চাকরি দখল করছে। আদিবাসী, হিন্দু মেয়েদের বিয়ে করে প্রচুর সন্তান উৎপাদন করছে। ফলে কিছু দিনের মধ্যে তারা দেশটাই দখল করে নেবে। এসব কথা বা ধারণার প্রচার ভোটের স্বার্থে মেরুকরণের জন্য। ভারতে ১৪৫ কোটি মানুষের মধ্যে ২৩ কোটি মুসলমান। বাংলাদেশের মোট ১৭ কোটি মুসলমান ভারতে চলে এলে সংখ্যাটি হবে ৪০ কোটি। তার মানে অনুপ্রবেশ স্রেফ রাজনৈতিক জিগির ছাড়া আর কিছুই নয়।
পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ থেকে যারাই এসেছেন বিজেপি নেতারা কিন্তু তাদের সবাইকে অনুপ্রবেশকারী বলছেন না। দেশভাগ এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যাঁরা এ দেশে এসেছেন, বিজেপি নেতারা তাঁদের ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করছেন। হিন্দুদের বলছেন শরণার্থী আর মুসলমানদের বলছেন অনুপ্রবেশকারী। বস্তুত দেশভাগের সময়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা এদেশে এসেছিলেন তাঁরা মূলত হিন্দু। আর বহু মুসলিম দেশভাগের আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং পরে বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এ দেশ থেকে বাংলাদেশে চলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এসেছে মূলত হিন্দুরাই। তা হলে বিজেপি যে কোটি কোটি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীর কথা বলছে তারা কবে ঢুকল? প্রমাণ করার মতো কোন তথ্য না থাকলেও বিজেপি মুসলমান অনুপ্রবেশের ফলে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির জুজু দেখাচ্ছে। যদিও জনগণনার রিপোর্ট সরকারের হাতে রয়েছে। অনুপ্রবেশের পরিমাণ বেশি হলে তো জনগণনায় তা ধরা পড়বেই। কারণ কোথাও অনুপ্রবেশ ঘটলে সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেশের গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের থেকে তো বেশি হবে। বিজেপি নেতাদের কথামতো অনুপ্রবেশের সংখ্যা যখন কোটি কোটি তখন দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও সেই অনুপাতে বেড়েছে। কিন্তু জনগণনার পরিসংখ্যান সেকথা বলছে না। ১৯৯১ সালের গণনায় দেশে জনসংখ্যাবৃদ্ধির হার ছিল ২৩.৯ শতাংশ। ২০০১-এর গণনায় দেখা যাচ্ছে ২১.৫ শতাংশ। অর্থাৎ কমেছে। ২০১১-র গণনায় দেখা যাচ্ছে ১৭.৬ অর্থাৎ বৃদ্ধির হার আরও কম। পৃথকভাবে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯১ সালের গণনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ২৪.৭৩ শতাংশ। ২০০১ সালের গণনায় তা নেমে হয় ১৭.৭৭। ২০১১ সালে আরও নেমে হয় ১৩.৯৩ শতাংশ। তাহলে মোদী আর বিজেপি নেতাদের কথা অনুযায়ী যে কোটি কোটি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী এ দেশে প্রতিদিন ঢুকে ভোটার তালিকায় নাম তুলে নাগরিক হয়েছে, তারা সব গেল কোথায়?