প্রভাব (influence) ও প্রভাবশালী (influential) শব্দদুটি বেশ তাৎপর্যময়। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নবীন হলেও, শব্দদুটির ধার ও ভার কেমন সে আমরা প্রতিনিয়ত এখন সংবাদমাধ্যমের কল্যানে অনুধাবন করছি।
কথা, সে কথা নয়। এমন নয় যে অতি-বিরল কোন শব্দদ্বয় আমাদের বোধে এই প্রথম ধাক্কা দিল! ছিল, বেশ পোক্ত ভাবেই। তেমন করে বলে উঠিনি। কেন? কারণ এ তো জানাই। ক্ষমতাবানরা, আমাদের কথ্য ভাষায় বড়লোকরা বিশেষ সুযোগ সুবিধে পাবে, আলাদা আদর-যত্নে পোষিত হবে এ তো জানা কথা। বড়লোক তো বটেই, অধুনা ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে পারে যারা তারাই প্রভাবশালী। ‘প্রভাব’ আমাদের প্রভাবিত করেছে। তাই মুখ খুলছে একটু একটু।
প্রভাব এবং প্রভাবশালীরা ‘বিচার ব্যবস্থাকে’ কতটা প্রভাবিত করতে পারে, সে কথা আমাদের জানার কথা নয়, কারণ আমরা অনেকেই আইনজ্ঞ নই। ওটা আইনজ্ঞদের এক্তিয়ারের বিষয়। তাই সে কথা তোলা থাক। কিন্তু তাই বলে কি ‘প্রভাব’ কিছুমাত্র অপ্রতিভ হয়, কিংবা ‘প্রভাবশালীরা’!
একদমই না। মনে করে দেখুন সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ মহাবীর কাকু কিংবা রাম বাহাদুর এর কথা। স্কুলের গেট টপকে একটু ওধার হয়েছি টক, কুল বা আলুকাবলি খেতে, ব্যস চল বড়-দিদিমণি, হেড-মাস্টারের কাছে। তারপর যা হত সে খবর নাইবা হল বলা! এখন মনে হয় মহাবীর কাকু কিংবা রাম বাহাদুর কম প্রভাবশালী ছিল !
এমন করে যৌবন ও প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় এসে ছেলেবেলার প্রভাবশালী কাকুদের ছেলেমানুষ মনে হয়। এমনকি পাড়ার স্ব-ঘোষিত অভিভাবক, অভিভাবিকা মাসিমা, পিসিমাদের এবং দাদাদের খুবই তুচ্ছ মনে হয়। অথচ শাসন, বকা, কানমলা খেয়ে বড় হওয়া কৈশোর-যৌবনের কাছে, এরা তো প্রভাবশালীই ছিলেন! মাসিমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হিন্দি গানের কলি ভাজলে নালিশ হত, সদ্য গোঁফ গজানো মুখে সিগারেট দেখলে, সিনেমা হলের সামনে নায়িকার ছবির সামনে একপলক তাকালে যে কি চিত্তির হত, তা অনেকের স্মরণে থাকবে নিশ্চয়ই! এমন সব প্রভাব ও প্রভাবশালী কর্মতৎপরতা আমাদের কিংকর্তব্যবিমুঢ় করেনি। রাগ হত, খুবই রাগ হত, কিন্তু ওই মাসিমাই যখন বিজয়া দশমীর দিন সন্তান স্নেহে ঘুগনি আর নাড়ু খাওয়াতেন, তখন সব রাগ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যেত।
জনজীবনের পরতে পরতে প্রভাব আর প্রভাবশালীর দৌরাত্ম এখন অন্য অর্থ বহন করে। স্নেহ, মমতা, সহমর্মিতা, ভালবাসা নিরপেক্ষ এই শব্দদ্বয় মানুষকে এক ধ্বস্ত সময়ের সাক্ষী করে তুলেছে। এখন স্কুলে, হাসপাতালে ভর্তি হতে, এমনকি রীতিমাফিক সরকারি সাহায্য পেতেও প্রভাব লাগে, প্রভাবশালীর সাহায্য লাগে। দল লাগে, দলের আজ্ঞাদাস না হলে প্রভাব কলা দেখায়, প্রভাবশালীর কালির রং বদলে যায়! গোঁফ দিয়ে নয়, রং দিয়ে যায় চেনা। চি চিং ফাঁক এর মন্ত্র প্রভাবের এবং প্রভাবশালীর ক্ষমতার দ্যোতক হয়ে ভয় দেখায়, আবার অভয় দেয়। তাই বাংলা শব্দভাণ্ডারে ‘দলদাস’, ‘অভয়দাস’! যুক্ত হয়।
আমাদের নিত্যদিনের জীবন অভিজ্ঞতার জলছাপ এমনই। মুখহীন (face-less) মানুষের মৃতদেহ পড়ে থাকে ৩০ ঘন্টা, হাসপাতালে বেডের অভাবে চাতালেই মৃত্যু হয় মূমুর্ষু মানুষের, আর তখনই ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে সরকারি বা বেসরকারি পাঁচতারা সুবিধাযুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য বেড পেয়ে যায় ‘প্রভাব’!
এবং এক্ষেত্রে গোত্রবিচার হয়না। অনেকটা শাসকশ্রেণীর দ্বন্দ্বের ক্লাসিকাল সংজ্ঞার মত, কেউ হারেনা, কেবল তখত বদল হয়। এ ওকে দেখে, সে তাকে। প্রভাব ও প্রভাবশালী র স্থান বদল হয়, সু্যোগের প্রাপ্তি থেকে কেউ বঞ্চিত হয়না। এই করোনা কালে যেমন। হাজার হাজার মানুষ যখন বিনা চিকিৎসায় অসহায় মৃত্যুর অপেক্ষায়, তখন প্রভাবশালীদের ‘দক্ষিন কলকাতা ও বাইপাসের পাশের ‘পাঁচতারা হাসপাতালে ভর্তি হতে পলক ফেলতে হচ্ছেনা! বাম-ডান তত্বের উদগাতাদের কেউ কিন্তু এই সুযোগ নিতে পিছপা না। একেই তো বলে প্রভাব! আইনের জটিল ব্যাখ্যা ছাড়াই কি এ এক সহজ-সত্য নয়!
এমত কারনেই প্রভাব ও প্রভাবশালী শব্দদ্বয় আমাদের ব্যবহারিক কথ্যে জায়গা করে নিচ্ছে। শৈশবের প্রভাব আর বর্তমানের প্রভাব এক নয়, এক নয়, বোঝ যে জানো সন্ধান।