স্থাবর-অস্থাবর সবরকম সম্পত্তি নিয়ে আমাদের চুলোচুলি থেকে খুনজখম, মামলা মোকদ্দমা সবকিছু আছে, কিন্তু ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস বা বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার নিয়ে আমরা একটা কথাও বলি না। এই অধিকার সম্পর্কে ধারণা না থাকার জন্য যারা সবচেয়ে বেশি ঠকছেন, সেই গরীব লোকশিল্পীদের এ বিষয়ে প্রায় কোন ধারণা নেই বললেই চলে। বাংলার বাউল, পটুয়া, ছৌ, নাটুয়া, ডোকরা, রায়বেঁশে, মুখোশ শিল্পীদের অনুষ্ঠান ও শিল্পকর্ম নিয়ে অবাধে বাণিজ্য করে চলেছেন কিছু মানুষ, কিন্তু শিল্পীদের তার থেকে কোন আয় হচ্ছে না।
গ্রামে বাউল-ফকিরদের কিংবা পটুয়াদের মেলায় গিয়ে মাঝেমধ্যেই দেখি এক শ্রেণির ভিডিওগ্রাফার, আলোকচিত্রীদের ভিড়। সংবাদ মাধ্যমের লোক সেজে এরা নানা ভঙ্গীতে লোকশিল্পীদের ছবি তুলছেন, তাদের পণ্য বা গানের ভিডিও করছেন। মিউজিক ভিডিও থেকে শুরু করে টেলি ফিল্ম, বই, পোর্টাল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিজ্ঞাপনে সেগুলি যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু শিল্পীদের অপরিচয়ের অন্ধকার ও আর্থিক দুর্দশা তাতে দূর হচ্ছে না।
বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকারের প্রয়োগ তাদের এই বঞ্চনা ও প্রতারণা থেকে বাঁচার একটা রাস্তা হতে পারে। এর মাধ্যমে শিল্পীরা তাদের কাজ বা পরিবেশনা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, নিজেদের কাজের উৎকর্ষ বা সুনাম বজায় রাখতে পারেন, নতুন উদ্ভাবনী কাজে উৎসাহী হতে পারেন। নকল করা, বেআইনিভাবে প্রকাশ করা বা ইন্টারনেটে ছড়ানো আটকাতেও এই অধিকার জরুরি। এর সাহায্যে কোন শিল্পী কেউ তার অনুষ্ঠানের ভিডিও করতে পারবেন কি পারবেন না সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অথচ দেশের সরকার তো বটেই যে সব উৎসাহী ব্যাক্তি ও সংগঠন লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রসার ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছেন তারাও এনিয়ে ভাবেন না।
বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার হল হস্তশিল্প বা লোকসংস্কৃতি যাই হোক না কেন একটা নির্দিষ্ট পরম্পরাগত ঐতিহ্যের অধিকার। পুরুলিয়ার ছৌ নাচ, বাঁকুড়ার বিকনা ও দরিয়াপুরের ডোকরা শিল্প, বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্প, দক্ষিণ দিনাজপুরের কাঠের মুখোশ এবং পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের মাদুর শিল্প সবকিছুই এই অধিকারের আওতায় রয়েছে। শিল্পীদের অনুমতি ও তাদের সঙ্গে আইনসিদ্ধ চুক্তি ছাড়া এগুলি কোনভাবেই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যায় না।

আইন তো আছে কিন্তু মানছে কে? তাই আমরা দেখি বীরভূমের জয়দেব কিংবা নদীয়ার কদমখালির লালন মেলার ভিডিও বেপোরোয়াভাবে মিশছে শহরের বাউলের প্রমোশনাল ভিডিওর সঙ্গে। ছবি বা সিরিয়ালে ছৌ-এর বীররসের নৃত্যের পটভূমির সামনে চলেছে ভিলেনের সঙ্গে নায়কের লড়াই। বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে এটা একেবারেই বেআইনি। কারণ প্রতিটি লোকঐতিহ্যের একটা পটভূমি আছে, একটা চর্চা আছে, পরিবেশনার একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। এগুলি সেই রীতিনীতি মেনেই পরিবেশন করতে হয়। পরম্পরার বিকৃতি মানে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি।
এই ভিডিওগুলি বা ছবির প্রায় কোন জায়গাতেই যে শিল্পীদের দেখানো হচ্ছে তাদের নাম, যে জায়গায় এটা অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার নাম দেওয়া হয় না। এমনকি এটা যে কোন ভিডিও বা ফিল্মে বা মিউজিক ভিডিওতে ব্যবহার করা হবে তার জন্য শিল্পীদের কাছ থেকে কোন অনুমতিও নেওয়া হয় না। এ এক অদ্ভুত নৈরাজ্য! অর্থ দেওয়া তো দূরের কথা, এব্যাপারে শিল্পীদের সংগঠন, সমবায়, ক্লাস্টার বা অনুষ্ঠানের আয়োজক সংস্থার সঙ্গে কোন চুক্তি বা অনুমতি নেওয়া হয়নি!

কপিরাইট, শিল্পীদের অধিকার, ট্রেড মার্ক সবকিছুই বৌদ্ধিক সম্পত্তি বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির আওতায় চলে আসে। এগুলি রক্ষা করতে পারে একজন শিল্পীর অধিকার। লোকশিল্পীই হোন বা সাধারণ শিল্পী, বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার রক্ষার লড়াই বা বিপণনে এই তিনটিই তাদের অস্ত্র। সারা পৃথিবী জুড়ে বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার রক্ষার লড়াইতে এই তিনটি বিষয়ের ওপর বেশি জোর দেওয়া হলেও আমাদের দেশে অবস্থাটা বেজায় ঢিলেঢালা। অনেক ব্যান্ড একটা লোকগান বা লোকশিল্পের কিছু দৃশ্য তাদের প্রমোশনাল ভিডিওতে ঢুকিয়ে দিয়ে তা জমজমাট করে তোলার চেষ্টা করছেন। এটাও কিন্তু শিল্পীদের বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার রক্ষার অধিকারের ওপর আঘাত। বৌদ্ধিক সম্পত্তি আইন এটা রুখতে পারে।
বৌদ্ধিক সম্পত্তির অধিকার ও তা কীভাবে রক্ষা করতে হয় সে কাজে আমাদের দেশ প্রায় শৈশবে পড়ে রয়েছে। হালফিল তা নিয়ে সরকার, সংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং লৌকিক পরম্পরা নিয়ে যারা কাজ করেন তারা সক্রিয় হচ্ছেন। এই উদ্যোগ আরও জোরদার হলে আমাদের লোকশিল্পের মঙ্গল।