মোদি জমানায় বছরের পর বছর সুদ কমেছে স্বল্প সঞ্চয়ে। তলিয়ে গিয়েছে ব্যাঙ্ক জমার সুদও। এদিকে জিনিসপত্রের দাম আগুন। বাজারে কেনাকাটা করতে গেলেই হাতে ছ্যাঁকা লাগছে। এবার কি বাড়বে স্বল্প সঞ্চয়ে সুদের হার? পয়লা জানুয়ারি বর্ষবরণের প্রাক্কালে এহেন সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ, এই তিন মাসের স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার শুক্রবার বিকেলেই ঘোষণা করবে কেন্দ্র।

কেন্দ্রের নীতি – সুদ কমাও
স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার তলানিতে এসে ঠেকেছে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির ফলে। মোদি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, ব্যাঙ্ক ও পোস্ট অফিসের সুদ দারুণ ভাবে কমিয়ে দেওয়া, যাতে টাকা জমা নেওয়ার খরচ কমে যায়। এর ফলে ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি খুব অল্প সুদে উদ্যোগপতি তথা কর্পোরেটদের ঋণ দিতে পারছে। কমছে কর্পোরেটের পুঁজি সংগ্রহের খরচ। পুঁজিপতি-বান্ধব নরেন্দ্র মোদি-নির্মলা সীতারামণ জমানায় তাই কেভিপি, মাসিক আয় প্রকল্প বা টাইম ডিপোজিট সহ জনপ্রিয় সব সঞ্চয় প্রকল্পেরই সুদের হার বিগত বছরগুলিতে কমানো হয়েছে নির্মম ভাবে।

তলানিতে সুদের হার
মোদি জমানার ঠিক আগে ২০১৪ সালের এপ্রিলে ১, ২ ও ৩ বছরের টাইম ডিপোজিট বা স্থায়ী আমানতে সুদের হার ছিল ৮.৪ শতাংশ। বর্তমানে তা হয়েছে ৫.৫ শতাংশ। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ৫ বছরের টাইম ডিপোজিটে সুদ ছিল ৮.৫ শতাংশ, বর্তমানে ৬.৭ শতাংশ।
২০১৪ সালের এপ্রিলে রেকারিং ডিপোজিট ও মাসিক আয় প্রকল্পে সুদ মিলত ৮.৪ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে যথাক্রমে ৫.৮ ও ৬.৬ শতাংশে।
২০১৪ সালের প্রথম ভাগে ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট বা এনএসসি-তে সুদ ছিল ৮.৫০ শতাংশ, বর্তমানে ৬.৮০ শতাংশ।
সিনিয়র সিটিজেন্স সেভিংস স্কিমে ২০১৪ সালের এপ্রিলে সুদ মিলত ৯.২০ শতাংশ, বর্তমানে ৭.৪০ শতাংশ।
২০১৪ সালের এপ্রিলে কিষান বিকাশ পত্র বা কেভিপি-র সুদ ছিল ৮.৭ শতাংশ, বর্তমানে তা ৬.৯ শতাংশ।
পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ডে ২০১৪ সালের এপ্রিলে সুদ দেওয়া হতো ৮.৭০ শতাংশ, এখন তা ৭.১০ শতাংশ।
২০১৪ সালের এপ্রিলে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনাতে ৯.১০ শতাংশ সুদ মিলত, এখন সে হার ৭.৬০ শতাংশ।
মনে রাখা দরকার, বিপুল হারে সুদ কমানো হয়েছিল ২০২০-র এপ্রিলে, যখন করোনা লকডাউনে মানুষের দুর্দশা চরমে। পরবর্তীতে জিনিসপত্রের চড়া দাম সত্ত্বেও সুদ বাড়ানো হয়নি। ইতিমধ্যে মাথা চাড়া দিয়েছে দারুণ মূল্যবৃদ্ধি।

মূল্যবৃদ্ধি লাগাম-ছাড়া
চলতি বছরের জুলাইতে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১১.১৬ শতাংশ, নভেম্বরে হয়েছে ১৪.২৩ শতাংশে। ২০২১ সালের জুলাইতে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৫.৫৯ শতাংশ, নভেম্বরে এই হার ৪.৯১ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যানে প্রায় পাঁচ শতাংশ খুচরো মূল্যবৃদ্ধি দেখালেও প্রতিদিনের জীবনে মানুষ বুঝছেন, প্রকৃতপক্ষে তা অনেক বেশি। শাক-সবজির দাম দ্বিগুণ হয়েছে গত দু’তিন মাসে, ভোজ্য তেল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম আকাশ-ছোঁয়া।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নীতি অনুযায়ী ৪ শতাংশ খুচরো মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। এর থেকে ২ শতাংশ কম-বেশি হলে সহনসীমার মধ্যে রয়েছে বলে মনে করা হয়। চলতি বছরের প্রায় পুরো সময়টা জুড়েই খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ৪ শতাংশের অনেকটা ওপরে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসে টাকা জমা রাখলে তা আসলে কমে যাচ্ছে। কারণ, যে হারে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, দাম বাড়ছে তার থেকে বেশি গতিতে। কেন্দ্রের উপর চাপ বাড়ছে সুদের হার বাড়ানোর। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে স্বল্প সঞ্চয়ের সুদের হার ঘোষণা হবার কথা ৩১ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে। এবার কেন্দ্র কি করে, তা দেখতে মুখিয়ে আছেন সুদ-নির্ভর জনতা।