লোক সমাজে প্রচলিত একটা কথা আছে, “টাকা পয়সা ডান হাত দিয়ে আসে আর বাম হাত দিয়ে যায়।” অর্থাৎ, আমরা ডান হাত দিয়ে ভালো কাজ করি আর বাম হাত দিয়ে উল্টোটা। তাই হয়তো শিশুদের বাম হাতে খাওয়া বা লেখার ব্যাপারটা অনেক অভিভাবক সহজে মেনে নেন না। অথচ বাঁ হাতিরা ডান হাতিদের মতোই সর্ব ক্ষেত্রেই যথেষ্ট পারদর্শী।
এই বিষয়ে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য প্রতি বছর ১৩ই আগস্ট আন্তর্জাতিক বাঁহাতি দিবস (International Left Handers Day) পালিত হয়। এটি এমন ব্যক্তিদের স্বতন্ত্রতা তুলে ধরার একটি দিন যারা তাদের দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করতে ডানের চেয়ে বাম হাত বেশি ব্যবহার করে। এই স্বতন্ত্রতার পাশাপাশি, দিনটি বাম-হাতি হওয়ার সুবিধা এবং অসুবিধাগুলি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ায়।
লেফট-হ্যান্ডার্স ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেটেডের প্রতিষ্ঠাতা ডিন আর ক্যাম্পবেল ১৯৭৬ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক বাঁহাতি দিবস পালন করেন। এবং তারপর থেকে প্রতি বছর এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

ইউনাইটেড কিংডমে, দিনটি উদযাপনের জন্য বাম-বনাম ডান হাতের খেলার ম্যাচ এবং বাম-হাতের চা পার্টির মতো ২০টিরও বেশি ইভেন্টের আয়োজন করা হয়।
পৃথিবীতে নব্বই ভাগ মানুষই ডানহাতি, দশ শতাংশ মানুষ কেবল বাঁ-হাতি হন। এর কারন হিসেবে গবেষকরা বাঁ-হাতি হওয়ার কারণ হিসেবে ৪০টির মতো জীন শনাক্ত করেছেন। প্রচলিত আরেকটি গবেষণার ফল জানলে আপনি চমকে উঠতে পারেন, জন্মগ্রহণের সময় শতকরা ৭৫ ভাগ শিশুই বামহাতি হওয়ার বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিবেশ ও জীবনযাপন পদ্ধতি মিলিয়ে শিশু ডানহাতিতে পরিণত হয়। গর্ভাবস্থায় এবং প্রসবের সময় সন্তানের অবস্থান এবং প্রিম্যাচিউর (অর্থাৎ ২৪ সপ্তাহের আগে এবং জন্মগত ওজন ১.৫ কেজির কম) হলে বাঁ-হাতি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁ-হাতিদের ডান পাশের মস্তিষ্ক বেশি ব্যবহৃত হয়। এ জন্যই সাধারণত বাঁ-হাতিরা বেশি উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। ক্রিস এমসি ম্যামস ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডানহাতি ও বাঁ-হাতিদের ওপর লেখা একটি বইতে উল্লেখ করা আছে, বাঁ-হাতিদের জীবনের সাফল্য, প্রাপ্তি বা কৃতিত্বপূর্ণ কাজ ডানহাতিদের তুলনায় ঈর্ষণীয়। বলা হয়ে থাকে, তাঁদের আইকিউ বেশি এবং সংগীত ও গণিতে তাঁদের পারদর্শিতা ডানহাতিদের চেয়ে ভালো।

বিশ্বজুড়ে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং সেলিব্রিটি রয়েছেন যারা বাঁহাতি। তাঁদের মধ্যে মাদার টেরেসা, স্যার আইজ্যাক নিউটন, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, ওয়াল্ট ডিজনি, চার্লি চ্যাপলিন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, পাবলো পিকাসো, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি … ছিলেন বাম-হাতি।
সারা বিশ্বে নারী-পুরুষ মিলিয়ে দশ থেকে বারো শতাংশ মানুষ বাঁ-হাতি। আর এই সংখ্যায় বিখ্যাত মানুষদের সংখ্যাটি কিন্ত কম নয়। রাজনীতি থেকে শুরু করে বিনোদন, শিল্প থেকে শিক্ষা …জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাম হাতি ব্যক্তিত্বের জয়জয়কার দেখা যায়। যেমন ধরুন —
বারাক ওবামা : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বাঁ হাতি। তবে ওই দেশের বাঁ হাতি রাষ্ট্রপতিদের তালিকাটি বেশ একটু বড়ো। জেমস গারফিল্ড, হাবার্ট হুভার, হ্যারি ট্রুম্যান। রোনাল্ড হুভার, জর্জ বুশ, বিল ক্লিন্টন এই বাঁ হাতি তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
নরেন্দ্র মোদী : বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আসলে বাঁ হাতি। তবে, লেখালেখির ক্ষেত্রে ডান হাতটাই ব্যবহার করেন নরেন্দ্র মোদী। খাবার খাওয়া কিংবা খেলার সময় তিনি ব্যবহার করেন বাঁ হাত। নরেন্দ্র মোদীর মতো মহাত্মা গান্ধীও বাঁ হাতি ছিলেন।
অমিতাভ বচ্চন : বিশ্বের বিখ্যাত বাঁ-হাতিদের একজন ভারতের বিগ বি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রাপ্ত অমিতাভ বচ্চন। তবে অমিতাভকে শুধু বাঁহাতি বললে কমই বলা হয়, যথার্থ অর্থেই তিনি ‘সব্যসাচী’। ডান ও বাম—দুই হাতই প্রায় সমান চলে শেহেনসার। তবে শুধু অমিতাভ নন, বলিউডের অনেকেই বাঁহাতি। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ‘ছোটা বচ্চন’ অভিষেক বচ্চন। এ ছাড়া, দক্ষিণী সুপারস্টার রজনীকান্ত, সোনাক্ষী সিনহা, সানি লিওন, আদিত্য রায় কাপুর, অভয় দেওল-সহ অনেকেই রয়েছেন এই তালিকায়।

করণ জোহর : ধর্মা প্রোডাকশন হাউসের কর্ণধার তথা পরিচালক, প্রযোজক করণ জোহরও বাঁহাতিদের দলেই পড়েন।
কপিল শর্মা : জনপ্রিয় কমেডিয়ান কপিল শর্মাও একজন বাঁহাতি।
অপারা উইনফ্রে : হোস্ট হিসেবেই তাঁকে বিশ্ব চেনে। সবথেকে বেশি টক শোর সঞ্চালক উইনফ্রেকে মিডিয়া সাম্রাজ্যের রানি হিসেবেই স্বীকৃত দিয়েছে বিশ্ববাসী। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া উইনফ্রে বিশ শতকের সবথেকে ধনী আফ্রো-আমেরিকান।
রতন টাটা : ভারতের অন্যতম শিল্পপতি রতন টাটা। গত কয়েক দশক ধরে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য, তিনিও একজন বাঁহাতি। ২০১৫ সাল থেকে টাটার একাধিক ট্রাস্ট ভারতীয় বাঁহাতি কৃতীদের একটি বিশেষ বৃত্তি (Scholarship) প্রদান করে।
বিল গেটস : বিশ্বের চতুর্থ ধনী ব্যক্তি বিল গেটস বাম হাতি ।
মার্ক জুকারবার্গ : ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকার বার্গও বাঁহাতি ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বিশ্ব ধনীর তালিকায় তিনি পঞ্চম।
স্টিভ জোবস : অ্যাপেলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জোবসও বাঁহাতি। আইটি ওয়ার্ল্ডে তিনি একজন গুরু হিসেবেই খ্যাত। যারা তাদের বাম হাত বেশি ব্যবহার করে তারা টেনিস, সাঁতার, বক্সিং এর মতো খেলাধুলায় দুর্দান্ত। এছাড়াও, ডানহাতি লোকদের সাথে তুলনা করলে তারা মাল্টিটাস্কিংয়েও দক্ষ।

শচিন তেন্ডুলকর : ভারতীয় ক্রিকেটের ভগবান মাস্টার ব্লাস্টার শচীন তেন্ডুলকার বাঁ-হাতি। একটি বিশেষ দিনে তিনি টুইট করে জানান, বাম-হাতি ব্যাপারটি তিনি এনজয় করেন। তিনি বাম হাতে লেখেন, ডান হাতে ব্যাট করেন।
আপনাদের প্রিয় সকলের “দাদা” সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে বিষয়টা একেবারেই উল্টো। তিনি বাঁ হাতে ব্যাট করেন ও ডান হাতে লেখেন। এ ছাড়াও যুবরাজ সিং, জাহির খান, ইরফান পাঠান বাঁ হাতি ক্রিকেটার।
কেবল মানুষই নয়, অনেক পশু-পাখিও বাঁ-হাতি বৈশিষ্ট্য হয়। অক্টোপাসের শুধুমাত্র একটি ডান হাত আছে। মেরু ভাল্লুকদের প্রাথমিকভাবে বাঁ-হাতি বলে মনে করা হয়। এক গবেষণায় বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ান ক্যাঙ্গারুরা সব বাঁ-হাতি। সেখানে বলা হয়, দ্বিপদী প্রাণীর ক্ষেত্রে হয়তো এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু চতুষ্পদী প্রাণীরা এ ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না।
সমাজে একটিকথা চালু আছে — ”লেফট ইজ অলওয়েজ রাইট”। আসলে গোটা দুনিয়ায় এত গুণী বা বিখ্যাত মানুষদের সংখ্যাটি এতটাই বেশি, তাই হয়তো এই ধরণের কথা আপনা হতেই সত্যতা স্বীকার করে। সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ধ্যান ধারণা, ধর্মীয় অনুভূতির কারণে বাম হাতিদের নিয়ে যে সকল ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, আজ সেগুলিকে সঠিক কারণ দর্শানোর দিন।।
Source : Various articles and journals have been referred for the Writeup.
খুব খুব ভালো লাগল। দারুণ প্রতিবেদন।
অনেক ধন্যবাদ ❤️
খুব সুন্দর প্রতিবেদন,,,,, অভিনন্দন জানাই আপনাকে
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????