| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলা ভাষা প্রয়োগের বাস্তব চিত্র : ড. মিল্টন বিশ্বাস

Reporter
ড. মিল্টন বিশ্বাস / ১০৪৫ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পর আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার মান ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলছি, নির্ভুল বানানে বাংলা লেখার জন্য তর্কবিতর্কে লিপ্ত হচ্ছি আর হরহামেশায় ভুলে ভরা বাংলা লেখা নিয়ে খেদোক্তি করছি। আসলে বঙ্গবন্ধুসহ ভাষাসৈনিকদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে অভিপ্রায় ছিল তার অনেক কিছুই আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে।আমরা সকলেই জানি, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সফল হলেও মাতৃভাষা বাংলাকে সর্বস্তরে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টির প্রচেষ্টা পাকিস্তান আমলে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। যদিও ১৯৫৬ সালে প্রণীত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু কাগজে কলমে বাংলাকে মর্যাদা দিলেও বাঙালি সংস্কৃতি অবহেলিতই থাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে। স্বাধিকার আদায়ে দীর্ঘ সংগ্রামের পর বাঙালিরা লাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, জন্ম নেয় বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশে সকলের আশা ছিল সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার হবে। বিশেষ করে সরকারি দপ্তর, আদালত এসব স্থানে সাধারণ মানুষ বাংলায় কাজ চালাতে পারবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। তবে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে বাংলা ভাষার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলেও বাংলাকে সর্বস্তরের ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।অথচ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। পরবর্তী রাষ্ট্র প্রধানগণ বাংলায় ভাষণ দেননি। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলায় ভাষণ দেন এবং বাংলাকে জাতিংসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জনিয়ে আসছেন।দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলার প্রচলন থাকলেও শিক্ষার্থীরা বাংলা বানান ও বাক্য প্রয়োগে হরহামেশায় ভুল করছে। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে ইংরেজি অবশ্যই জানতে হবে।এজন্য বাংলা ভাষার পাশে ইংরেজি শিক্ষারও প্রসার ঘটানো দরকার। তবে সব আগে প্রয়োজন সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রয়োগ ত্বরান্বিত হওয়া। আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ সালে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত হয়ে ১৯৩টি দেশে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল রাষ্ট্রভাষার দাবি আদায়ের আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি। তাই বলা যায়, ভাষা শহীদদের রক্তে স্নাত হওয়া সত্ত্বেও ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বর্তমান সময়েও আমাদের লড়াই থেমে নেই।

২.

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান থেকে প্রতিবছর বাংলা ভাষা ব্যবহারে সকলকে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বাংলা শব্দের বানান ও উচ্চারণ সম্পর্কে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলে থাকেন, ‘ইদানীং বাংলা বলতে গিয়ে ইংরেজি বলার একটা বিচিত্র প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জানি না, অনেক ছেলেমেয়ের মাঝে এখন এটা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেছে। এভাবে কথা না বললে যেন তাদের মর্যাদাই থাকে না- এমন একটা ভাব।’ শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, প্রমিত বাংলা শব্দের বানান এবং উচ্চারণ সুনির্দিষ্ট। এখানে কোন আপোস চলবে না। বাংলা ভাষাকে মিশ্রিত বা বিকৃত করে বলার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। তবে আঞ্চলিক ভাষাকে কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। কারণ, আঞ্চলিক ভাষাও বাংলা ভাষা, এর নিজস্বতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কথার সূত্র ধরে বলা চলে কেবল নতুন প্রজন্ম নয়, সরকারি- বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে জনগণের কাছে বাংলার চেয়ে বিদেশি ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে চলেছে।

প্রযুক্তির কারণেও বাংলা ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।ভাষাবিদ, কবি, সাহিত্যিক বা ব্যবকরণবিদগণ নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করে ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। কিন্তু এখন অন্য ভাষার নাটক সিনেমা দেখে সাধারণ মানুষই মনের মতো করে শব্দ সৃষ্টি করছেন। ফলে নতুন প্রজন্ম এভাবেই ভুল শব্দ শিখছে।গণযোগাযোগ মাধ্যমেও প্রমিত বাংলার ব্যবহার অনেক কমে গেছে। টেলিভিশনের সংবাদ বা উপস্থাপনার ক্ষেত্রে এখনো অনেক কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হয়। কিন্তু রেডিওতে বর্তমানে তুমুল জনপ্রিয় ডিজে নামক পদবীতে যারা কাজ করেন তাদের ভাষা শুনলে যেকোনো বিদেশি বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার কোন বিদেশি নির্ঘাত অজ্ঞান হয়ে যাবেন। তারা যেভাবে বাংলা উচ্চারণ করেন এবং এতে দুই একটা শব্দ পরপর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন তাতে সাধারণ মানুষের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার উপক্রম হয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলা নাটকে প্রমিত বাংলার জায়গায় আঞ্চলিক ভাষা প্রাধান্য পাচ্ছে। অনেকে এর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, এসব নাটকের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষাগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাংলা নাটক যদি বলা হয় তাহলে সেখানে প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যবহারই কাম্য। অন্যদিকে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইংরেজিপ্রীতি বেশি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইংরেজি শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার কীভাবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠেছে তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যেমন বাংলায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন লেখা থাকলেও তার সংক্ষিপ্ত রূপ ইংরেজিতে ‘ডিএনসিসি’। অর্থাৎ ঢাকা নর্থ সিটি কর্পোরেশন। ঠিক একই পদ্ধতিতে নাম ব্যবহার করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনও (ডিএসসিসি)। অথচ বাংলা ব্যবহার না করার অভিযোগে কোথাও কোথাও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিমূলক সাইন বোর্ড। তাছাড়া হরহামেশায় ইংরেজিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণও করছে সরকারের ভেতরের কিছু ব্যক্তিবর্গ। এভাবে বহু প্রতিষ্ঠানের বাংলা নামের পাশে সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ইংরেজি শব্দের বিশদ ব্যবহার আছে যত্রতত্র। যেমন, ইউনিয়ন পরিষদ ‘ইউপি’, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করর্পোরেশন-বিআইডব্লিউটিসি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন- ইউজিসি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড- এনসিটিবি, নগর উন্নয়ন অধিফতর- ইউডিডি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন- বিটিআরসি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড- এনবিআর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন-বিআরটিসি, ঢাকা পরিবহণ সমন্বয় কতৃর্পক্ষ-ডিটিসিএ, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরেটি- বিআরটিএ প্রভৃতি। এ ধরনের ব্যবহারের অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো ‘ওয়াসা’। ‘ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড সুয়্যারেজ অথরেটি’র সংক্ষিপ্ত রূপ এটি। এ রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে মানুষের মুখে মুখে বিদেশী শব্দ এভাবেই ছড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই হুমকির মুখে পড়বে বাংলা শব্দ, যা জাতি সত্তার মৌলিক উপাদানের ওপর হুমকি স্বরূপ। যে কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তা থেকে নিস্তার পেতে হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এসব তৎপরতার অবসান ঘটানো দরকার। কারণ, কথায় কথায় এসব সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করছে সর্বস্তরের মানুষ। যা কেবল বাংলা ভাষা প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করছে না, এর মধ্য দিয়ে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি অসম্মান করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। উল্লেখ্য, মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের ১৬৯৬/২০১৪ নং রিট পিটিশনে প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী সকল প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিল বোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে হাইকোর্টের আদেশটি ডিএনসিসি এলাকায় নিশ্চিত করার দায়িত্ব ডিএনসিসি কতৃর্পক্ষকে দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের শুরুতে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৭ দিনের মধ্যে নামফলক, সাইন বোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লিখতে বলা হয়। হাইকোটের্র আদেশ এবং ডিএনসিসির গণবিজ্ঞপ্তি বাস্তবায়ন না করার অপরাধে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯ অনুযায়ী অনেক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও সরকারি অফিসগুলো ইংরেজি শব্দ নিয়েই বহাল তবিয়তে আছে।

কয়েক বছর আগে বিচারপতির পদত্যাগপত্রে বাংলা বানান ভুল নিয়ে হৈচৈ হয়ে গেল। আবার উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখতে পেলাম সরকারি সাইন বোর্ড, রাস্তার প্ল্যাকার্ড, পোস্টার, ব্যানারে বানান ভুল নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বাংলা একাডেমি কর্তৃক সঠিক বানানের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকলেও মানতে নারাজ অনেকেই। এ জন্য ঢাকার প্রধান সড়কের পাশে ফার্মেসি ও ফটোস্ট্যাটের দোকানের প্রত্যেকটির সাইন বোর্ডে লেখা ‘ফার্মেসী’, ‘ফটোষ্ট্যাট’ ইত্যাদি। কয়েকটি দোকানে স্টোরের জায়গায় ‘ষ্টোর’ লিখে রাখা হয়েছে। রাস্তা সংলগ্ন বেশকিছু রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ে যেগুলোতে লেখা ‘রেষ্টুরেন্ট’। একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের নামের বানানে ভুল করে মর্ডান না লিখে ‘ণ’ ‘মর্ডাণ’ লেখা রয়েছে। অথচ আমরা জানি, কোন বিদেশি শব্দে ণ, ষ এবং ঈ কার হবে না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম পুণ্যস্থান ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণ। কিন্তু সেখানেও বানান ভুল দেখতে পাবেন। মেডিক্যালে ঢুকেই নজরে আসে ‘বার্ন এবং সার্জারি’ (বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট) বানান ভুল। একটু পেছন ফিরলেই চোখে মিলবে ইমারজেন্সি কমপ্লেক্সের ‘ইমারজেন্সি’ ভুল বানান। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের বানান ভুল করে ‘সুপ্রীম’ লেখা। জাতীয় প্রেসক্লাবের কর্মচারী ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন বানানটাই ‘ষ’ দিয়ে লেখা।

আবার একই শব্দ একেক সাইন বোর্ড বা দেয়ালে লেখা হচ্ছে একেক রকম। এতে একদিকে যেমন বাংলা ভাষার বিকৃতি ঘটছে তেমনি শিশুর ভাষা বিকাশে ত্রুটি ঘটছে বলে ভাষা বিশেষজ্ঞদের অভিমত। শিশুরা আগ্রহ নিয়ে সাইন বোর্ডগুলো পড়ে। আর সেখানে যদি ভুল থাকে তবে সেটি তাদের মনে গেঁথে যায়। অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত আর্টিস্ট দ্বারা যখন কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল কিংবা বাসা বাড়ির কাজ করা তখন সে সব সাইন বোর্ড, ব্যানার ও দেয়াল লিখন বাংলা বানানে ভুলে ভরা থাকছে। সাইন বোর্ড হচ্ছে চোখের ঝিলিক; প্রতিষ্ঠানের আয়না। প্রতিষ্ঠানের পরিচয় যদি ভুল বানানে থাকে তাহলে প্রথমেই একটা বিরূপ ধারণা চলে আসে। যেমন, ফার্নিচারের দোকানগুলোতে দেখা যায় ফার্নিচার শব্দটিই একেক দোকানে লেখা আছে একেক রকম। ‘মদিনা ফার্নিসারস’, ‘প্যারামাইন্ট ফার্নিশার্স’, ‘হোম ফার্নিশার্স’ বানানে লেখা হয়েছে শব্দটি। অটোমোবাইলসের সাইন বোর্ডে লেখা আছে ‘এহানে মুবিল, গিরিজ, পিট্রোল’ (এখানে মবিল, গ্রিজ, পেট্রোল) পাওয়া যায়। ‘রহমান অটোমোবাইলসের’ জায়গায় লেখা আছে ‘রয়মান অটোমোবাইল’, গ্রিজকে লেখা আছে ‘গিরিজ’, অকটেনকে লেখা আছে ‘অটেন’। মোবাইলের দোকানের সাইন বোর্ডে দেখা যায়, ‘কলিম ইন্টারপ্রাইজ’- তাতে আরো লেখা ‘এখান থেকে ফিলিক্স লোড, এজি লোড করা হয়। মোবাইল টু মবেল ২ টাকা। বিকাষ করা হয়।’ বাসা ভাড়ার বিজ্ঞাপনেও ভুল লেখা চোখে পড়ে। যেমন, ‘এখানে ঘোর ভারা দেয়া হবে। পানি, গস সুবিধাসহ।’ ছাত্রাবাসগুলোর সাইনবোর্ডে লেখা আছে, ‘মেছ ভাড়া দেয়া হবে।’ যারা এসব বাংলা লেখে তাদের কেবল বর্ণমালা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে কাজ করতে হয়। বানান নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। তবে যারা লিখে নিচ্ছেন তাদেরও রয়েছে বানানে অদক্ষতা। অর্থাৎ অসচেতন মানুষের কারণে বাংলা ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শহরকেন্দ্রিক তরুণ-যুব সমাজের মধ্যে সুন্দর এবং শুদ্ধ করে বাংলা বলার ক্ষেত্রেও অনীহা লক্ষণীয়। বাংলা হিন্দি এবং ইংরেজি মিলিয়ে খিচুড়ি করতে ওস্তাদ ওরা। কোনোটাই ঠিক হয় না। আসলে মাতৃভাষার মর্যাদার প্রতি তাদের যেন কোনো অঙ্গীকারই নেই। পৃথিবীর উন্নত জাতি তাদের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির ব্যাপারে কোনো আপস করে না। কিন্তু আমাদের দেশে রক্তরঞ্জিত বাংলা বর্ণমালার অবমাননা দেখা যায় সর্বত্র।এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলা প্রয়োগে ভুলের রাজত্ব লক্ষণীয়।ভুল বানান, ভুল বাক্যের ছড়াছড়ি থাকে পোস্টের পর পোস্টে।দৃষ্টান্ত দেওয়া থেকে বিরত থাকলাম।

কেবল সোশ্যাল মিডিয়া নয় খ্রিষ্টীয় বছরের প্রথম দিনে বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া বিনামূল্যের বই নিয়ে ২০১৭ সালে ছিল তুমুল বিতর্ক। ছিল কবিতার বিকৃতি আর বানান ভুলের ছড়াছড়ি। এমনকি মুদ্রণের মান ও অলংকরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল তখন। প্রথম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে অক্ষরজ্ঞান সূচিতে পাঠ ১২-তে ‘ও’ অক্ষর চেনানোর উপকরণ হিসেবে ‘ওড়না’কে ব্যবহার করা হয়েছিল। ‘শুনি ও বলি’ পাঠে ‘ও’ অক্ষর চেনাতে ওড়না পরা এক কন্যাশিশুর ছবি দিয়ে লেখা হয়েছিল- ‘ওড়না চাই’। প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ের লেখা ও ছবিতে ‘ছাগল গাছে উঠে আম খাচ্ছে’বোঝাতে চেয়েছিলেন লেখক। বাংলা পাঠ্যবইটির ১১ পাতায় অ’তে অজ (ছাগল) বোঝাতে গিয়ে ছাগলের ছবি জুড়ে দেয়া হয়। সংশোধন করা না হলে ছাগলের গাছে উঠে আম খাওয়ার মতো অসম্ভব বিষয় শিখতে হতো শিশুদের। তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটি বিকৃত করা হয়েছিল। ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে’ না লিখে লেখা হয়েছিল ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে?’ এ ছাড়া ‘মানুষ হইতে হবে- এই তার পণ’ না লিখে ‘মানুষ হতেই হবে- এই তার পণ’ লেখা হয়। ‘হাতে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান’ এই লাইনে ‘খাট’ শব্দটির বানান বদলে দিয়ে লেখা হয়েছিল ‘খাটো’। এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইয়ের ৭৮ পাতায় ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ’ লেখায় মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি কখনো ‘মুক্তিযুদ্ধ’ আবার কখনও ‘মুকতিযুদ্ধ’। ‘বঙ্গবন্ধু’ বানানটি ভেঙে ঙ-গ আলাদা আলাদা করে লেখা হয়। যা হোক, এসব সমস্যা সমাধান করা হয়েছিল অতি দ্রুত। কিন্তু ভুলে ভরা বাংলা ভাষার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়। আমরা মনে করি, পাঠ্যপুস্তকে কোন ধরনের ভুল গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুদের কাছে উপস্থাপিত কবিতা বা লেখার কোন ভুল বা বিকৃতি ভবিষ্যতেও পরিহার করতে হবে।

আসলে বাংলা ভাষার বিকৃতি ঘটছে সর্বত্রই। এফএম রেডিওতে বাংলা ভাষাকে ইংরেজি স্টাইলে উচ্চারণ করা হচ্ছে। ভুলে ভরা বানানে প্রতিবাদলিপি প্রেরিত হয়েছে দৈনিক পত্রিকায়; কয়েক বছর আগে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নে ভুল দেখা গেছে। তখন বিজ্ঞান পরীক্ষায় ছিল ব্যাকরণগত ভুল। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের এক ফেস্টুনের ছবিতে দেখা গেছে বানান ভুলের ছড়াছড়ি। শিক্ষা, ‘মেরুদণ্ড’ এমন সাধারণ বানানেও ভুল হতে দেখা গেছে সেখানে। পাওয়া গেছে ভুলে ভরা উত্তরপত্র মূল্যায়ন নির্দেশিকাও।

আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে নির্দেশনা মোতাবেক অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে নিজস্ব ওয়েবসাইট। কিন্তু এসব ওয়েবসাইটে রয়েছে অনেক ভুল। ওয়েবসাইটগুলো মানছে না বাংলা একাডেমির প্রমিত ‘বাংলা বানান রীতি’। জাতীয় সংসদের নিজস্ব ওয়েবসাইটের বাংলা সংস্করণে ইংরেজি শব্দের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার দেখা গেছে। অথচ এসব শব্দের বাংলা অর্থ রয়েছে। আবার এসব শব্দের ব্যবহারের রয়েছে ভুল। ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, ট্যাবগুলোর মধ্যে রয়েছে হোম, লাইব্রেরি। অথচ চাইলেই হোমের পরিবর্তে ‘প্রচ্ছদ’ আর লাইব্রেরির পরিবর্তে ‘গ্রন্থাগার’ শব্দটি ব্যবহার করা যেত। এসব প্রমাণ করে বাংলা শব্দ ব্যবহারে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয়জয়কার সর্বত্র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের ভালোবাসার বাংলা ভাষা তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে দিন দিন। এর জন্য মূলত দায়ী আমরাই।

৩.

বিশ্বে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত আছে।তার মধ্যে অন্যতম আমাদের বাংলা ভাষা।ব্যবহারের দিক থেকে আমাদের মাতৃভাষার অবস্থান চতুর্থ।কালের বিবর্তনে আমাদের ভাষার শব্দ সম্ভার ও গদ্যরীতির দিন দিন পরিবর্তন লক্ষণীয় হলেও ভুল প্রয়োগে ভাষার মর্যাদাহানী হচ্ছে।মূলত ভুলে ভরা বাংলা ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার জন্য প্রথমে দরকার সচেতনতা; প্রমিত বানানরীতি অনুসরণ করা এবং ইংরেজি শব্দের গ্রহণযোগ্য বাংলা পরিভাষা ব্যবহার আবশ্যক; উপরন্তু বিদেশি শব্দের যথার্থ পরিভাষা তৈরি এবং সেগুলোর বানানরীতি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। তাছাড়া প্রযুক্তির প্রসারের যুগে বাংলাকে ইন্টারনেটের এক্সপ্রেসওয়েতে আরোহণ করতে হবে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগ ও জনগণের উদ্যম দুটোই জরুরি।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “বাংলা ভাষা প্রয়োগের বাস্তব চিত্র : ড. মিল্টন বিশ্বাস”

  1. জাফর মিয়া says:

    স্যার, যথার্থই বলেছেন।মুখে আমরা ভাষা দিবসে
    বাংলা বন্দনা করি,কিন্তু বাস্তবে করি অবহেলা।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev