“দিনের বেলা আকাশে যেমন সূর্যের চেয়ে উজ্জ্বল কোন তারা থাকে না, ঠিক তেমনি ক্রীড়া_সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এমন কোন উৎসব নেই যা অলিম্পিকের চেয়ে বড়ো।” — মহাকবি হোমার।
আজ ২৩ জুন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক দিবস। এ বছর অলিম্পিক দিবসের থিম হলো, “Together, for a Peaceful World”, যার সাথে থাকবে সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাশট্যাগ #MoveForPeace এবং #OlympicDay। এই দিবস উদযাপনের উদ্দেশ্য হলো, খেলাধুলার মাধ্যমে একটি উন্নত বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে এবং মানুষকে শান্তিতে একত্রিত করতে হবে।
অলিম্পিকের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরে পুরনো। কথিত আছে গ্রিসে খ্রিস্টপূর্ব ৭৭৬ অব্দে শুরু হয় অলিম্পিক। চলেছিল প্রায় ১১০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে। মূলত তখন প্রাচীন গ্রিক নগরের রাজ্যগুলিই প্রতিনিধিত্ব করতো। পরে পোলোপোনেসিয়ান, হেলেনিক, রোমান সভ্যতা এর অঙ্গীভূত হয়ে পরে।

আবার অন্য একটি সূত্র বলে, খ্রিস্টপূর্ব ১২৫৩ অব্দে কিংবদন্তি হারকিউলিস অলিম্পিয়াডের সূচনা করেন।
হারকিউলিস তার বারোটি মহাকাব্যিক অভিযান শেষে তার পিতা জিউসের সম্মানে অলিম্পিক স্টেডিয়াম তৈরী করেন। এই কাজ শেষ করার পরে হারকিউলিস সোজা ২০০ কদম হেঁটে যান এবং একে স্টেডন হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে এটা দূরত্ব মাপার একক হিসেবে প্রচলিত হয়।
গ্রিক দেবদেবীর আবাসস্থল অলিম্পাস পর্বতের পাদদেশে প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হতো অলিম্পিয়াডের যাবতীয় ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান।তবে ৩৯৩ সালে রোমসম্রাট থিওডেসিয়াস এক বিশেষ ডিক্রি জারি করে অলিম্পিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। এরপর ক্রমে ক্রমে গ্রিস ও রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। লুপ্ত হয় অলিম্পিয়াড।
দীর্ঘ বারো শতাব্দীর পর ফরাসি, জার্মান, ডাচ প্রত্নত্বত্তবিদরা সুপ্রাচীন ঐতিহ্যমন্ডিত অলিম্পিকের ইতিহাসকে খুঁজে বের করলেন। অলিম্পিয়া খুঁজে পাওয়ার পাচঁ দশক পরে ফরাসি দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ব্যারণ পিয়ের দ্য কুবেরত্যাঁ ১৮৯৪ সালে প্যারিসে প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি। প্রথম সভাপতি হন দিমেত্রিওস ভাইকেলাস (Dimitrios Vicelles)। ১৮৯৬ সালের ২৫ শে মার্চ গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে আধুনিক অলিম্পিকের সূচনা হয়। শুরু হয় আধুনিক সভ্যতার জয়যাত্রার ইতিহাস।

যে ইতিহাস একদিন লুপ্ত হয়ে গেছিলো তা মানুষের সামনে উদ্ঘাটিত হলো নতুন বিস্ময় নিয়ে। প্রাচীণ গ্রিসের চারণ কবি পিন্ডার আমাদের জন্য রেখে গেছেন খেলাধূলা, শরীরচর্চা নিয়ে রচিত সব লোকগাঁথা। খেলা নিয়ে আঁকা ব্যাসিলাইডিসের চিত্রমালার উদ্ধার সম্ভব হয়েছে প্যাপিরি লোকগাথার মর্মোদ্ধার করে। পিন্ডার রচিত প্যাপিরির লোকগাথা না হলে প্রাচীনকালের ঐ বীরেরা আজ বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যেতেন।
কুবেরত্যাঁর নেতৃত্বে গঠিত তত্কালীন অলিম্পিক কমিটির লক্ষ্য ছিলো — (১) ক্রীড়া ও শরীরচর্চার মাধ্যমে মানুষের নৈতিক ও দৈহিক উৎকর্ষের বৃদ্ধি (২) ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকতর উন্নত ও শান্তিপূর্ন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা (৩) সারা বিশ্বে অলিম্পিজম আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জীবনবোধ বা বিশ্বচেতনা গড়ে তোলা এবং (৪) প্রতি চারবছর অন্তর এই মহান উৎসবের মাধ্যমে গোটা দুনিয়াকে একত্রিত করে মানবজগৎকে প্রকৃত সত্যচরণে সঙ্ঘবদ্ধ করা।
১৯৪৭ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায় আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সদস্য ডক্টর গ্রাস স্টকহোমে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির ৪১ তম রিপোর্টে প্রথম প্রস্তাব করেন, যে একটি নির্দিষ্টি দিনে অলিম্পিক দিবস হিসেবে পালন করা হোক। এর ঠিক এক বছর পর, ১৯৪৮ সালে অলিম্পিক আয়োজক কমিটি ২৩ জুনকে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক দিবস হিসেবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

২০২২ সালের ২৪ তম শীতকালীন অলিম্পিক গেমস ৪-২০ ফেব্রুয়ারি চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক হবে ২৬ শে জুলাই থেকে ১১ অগস্ট অবধি ২০২৪ সালে, প্যারিসে।
অলিম্পিক দিবস খেলাধুলা, স্বাস্থ্য এবং একসাথে থাকার উদযাপন। সাম্প্রতিক সময়ে, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি আইওসি রিফিউজি অ্যাথলেট স্কলারশিপ এবং আইওসি রিফিউজি অলিম্পিক দলের মাধ্যমে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী ক্রীড়াবিদদের সাহায্য করে।
কুবেরত্যাঁর স্বপ্ন ব্যর্থ হয়নি। অলিম্পিক আন্দোলন আজ বিশ্বের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে। নানা দেশে সামাজিক অস্থিরতা, সন্ত্রাসবাদের ভ্রুকুটি সত্বেও মানবাত্মার জয়গানে মুখরিত ছিল এবারের অলিম্পিক, গোটা দুনিয়ার ৯১টি দেশের অংশগ্রহণে সেই চিরন্তন সত্যটিই প্রতিফলিত।
“সিটিয়াস, অলটিয়াস, ফরটিয়াস”— অলিম্পিকের এই বীজমন্ত্র যত দিন যাচ্ছে ততই আরো বেশি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ন হয়ে উঠছে মানব জীবনে।।
তথ্যঋণ : ক্রীড়া সাংবাদিক জয়দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এবং অন্যান্য মিডিয়া আপডেট।।
Good job
খুবই সুন্দর লেখা। অভিনন্দন।
*কালজয়ী অলিম্পিক* চমৎকার সুন্দর প্রতিবেদন
ইতিহাস প্রয়োজন ইতিহাস আয়োজন ইতিহাস
বতর্মান,আপনার লেখা সবাইকে আকর্ষণ করে
পাঠক পরিতৃপ্ত হয় তথ্যের পরিস্ফুরণে।অলিম্পিক
আজকের আকর্ষণ*এক আকাশ মুগ্ধতা *
চমৎকার প্রতিবেদন। খুব ভালো লাগল।