আফগানিস্তান থেকে কোনো রকম জান নিয়ে রাশিয়ায় ফেরত (১৯৮৯) আসা রুশ পাইলট ক্যাপটেন নিকোলাস পরিচালিত হেলিকপ্টারে আমরা কজন শান্তিরক্ষী এখন কম্বোডিয়ার অ্যাংকর ওয়াট মন্দিরের উপর দিয়ে উড়ছি। বিখ্যাত কবি অ্যালেন গিনসবার্গ সাতশো বছরের প্রাচীন এই মহামন্দিরের উপর দিয়ে একদা উড়তে চেয়েছিলেন- ‘‘আই উইশ আই কুড ফ্লাই ওভার দি জঙ্গল”….। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তিন শান্তিসেনা বিশ্বের বৃহত্তম মন্দিরের উপর দিয়ে দিব্যি উড়ছি পাখির মতো। তবে নিকোলাসের ফ্লাইং নিয়ে আজ আমরা বেশ চিন্তিত। কারণটা অবশ্য ওঁর প্রবল ভদকা আসক্তি নয়। আসলে কয়েকদিন আগে (৩০ এপ্রিল, ১৯৯২) মুজাহেদিনদের হাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল পতনের পর থেকে নিকোলাসের মেজাজটা ভীষণ বিগড়ে আছে।
কম্বোডিয়ার এই শান্তিরক্ষা মিশনে (আনটাক) হেলিকপ্টার সহায়তার দায়িত্বে রয়েছে রাশিয়া। রুশ পাইলটদের অনেকেই ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে যুদ্ধ (জঙ্গে রুশস্কি) করেছে। দুর্ধর্ষ মুজাহিদ গেরিলারা স্টিনজার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার শত শত হেলিকপ্টার গানশিপের বারোটা বাজিয়েছিল। তাই আফগানিস্তান নিয়ে তাদের মাঝে প্রচণ্ড ট্রমা কাজ করে। সিয়ামরিপের গ্রান্ড হোটেল কর্তৃপক্ষ থেকে শুনেছিলাম, সিএনএন টেলিভিশনে কাবুল পতনের দুঃসংবাদ শুনে পানাসক্ত রাশান পাইলটরা হোটেলের বারে নাকি উত্তেজিত হয়ে ছোটখাট ভাংচুরও চালিয়েছিল। চিলের মতো উড়ে এই রুশ ঘাস ফড়িংটি হঠাৎ বেশ নীচে নেমে আসে। এবার ভয় হলো মন্দিরের সবচেয়ে উচু টাওয়ারে ধাক্কা টাক্কা দিয়ে না জানি আজ প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ কেলেঙ্কারি ঘটে যায়। অবশেষে সিয়ামরিপের আসমান থেকে হেলিকপ্টারটি পশ্চিমে থাইল্যান্ড সীমান্তের দিকে দ্রুত উড়ে যায়। মুজাহিদ- আতংকগ্রস্ত নিকোলাসের বেপরোয়া ফ্লাইং দেখে ভাবতে থাকি, আজ সহি সালামতে সিয়ামরিপে ফিরে আসতে পারবো তো?
অনেক বছর পর আবার কাবুল পতনের আলোচনা শুনছি। তাই ১৯৯২ সালের ডায়েরির পাতায় লেখাগুলো মনে পড়লো। ১৯৭৮ সালের পর থেকে (সাওর বিপ্লব) হতভাগ্য আফগানরা আর শান্তির মুখ দেখেনি। বিশেষত ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর আগ্রাসনের পর থেকেই এখন পর্যন্ত যুদ্ধ/গৃহযুদ্ধ চলছে। ভয়ংকর রুশ দখলদারিত্ব অবসান শেষে মুজাহেদিন গোষ্ঠী ক্ষমতা গ্রহণের পর (১৯৯২) শুরু হলো হয়েছিল গৃহযুদ্ধ, নৈরাজ্য, বিভিন্ন দলের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এই সুযোগে ১৯৯৬ সালে উগ্রপন্থি তালেবান গোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করেছিল। রণক্লান্ত আফগান জনগণ প্রথম দিকে তাদের স্বাগতও জানালেও একপর্যায়ে তালেবান শাসন হয়ে পড়েছিলো শ্বাসরুদ্ধকর। জনগণ তালিবানদের ধর্মীয় ও পশ্চাৎগামী রাষ্ট্রীয় শাসনের চরম কাঠিন্যের শিকার হয়েছিলো। এর সঙ্গে ওসামা বিন লাদেনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জটিল পরিস্থিতিতে, ২০০১ সালে শুরু হলো ভয়াবহ মার্কিন আক্রমণ (ওয়ার অন টেরর)। তালেবানদের হটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তায় নর্দান অ্যালায়েন্স ক্ষমতা দখল করলেও আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে এলো না।
উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কারমূলক ও উদার নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও মার্কিন-ন্যাটো বাহিনীর ভয়ংকর ও নির্বিচার বোমাবর্ষণ, বিদেশী বাহিনীর অমানবিক আচরণ, হত্যাকাণ্ড, আফগান শাসক গোষ্ঠীর চরম দুনীর্তি ও ঐতিহ্য বিরোধী কর্মকাণ্ড শান্তি আনয়নে ব্যর্থ হয়েছে। ২০ বছর পর দেশটি আবার তালেবান দখলের দ্বারপ্রান্তে। প্রায় দুই দশক ব্যাপী তালেবান বিরোধী প্রচণ্ড দমন অভিযানের পরও তালেবানদের পুনরুত্থান কেন হলো? এর উত্তর খোঁজাও গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৪ সালে আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরিচালনায় জাতিসংঘের ভলান্টিয়ার (ইউএনভি) হিসেবে কাজ করেছিলেন কবি জাহিদ হায়দার। উল্লেখ্য, কম্বোডিয়ার শান্তিমিশনে জাহিদ হায়দার বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ইউএনভি হিসেবে কাজ করেন। দেশে ফেরার পর দেখা হলে, কবি জাহিদ হায়দার আফগানিস্তানের পরিস্থিতির ব্যাপারে বলেছিলেন ‘‘সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ বর্ণিত আফগানিস্তান ও বর্তমান আফগানিস্তানের তেমন কোন পার্থক্য নেই।’’
লেখক ও অসাধারণ পণ্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘‘দেশে বিদেশে” ও ‘‘শবনম” আফগানিস্তানে (১৯২৭-১৯২৯) তাঁর অভিজ্ঞতার উপর লেখা অসাধারণ দুটি গ্রন্থ। সৈয়দ মুজতবা আলীর ছেলে সৈয়দ মোশাররফ আলী (ফিরোজ) রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে পড়তেন। আমি এই কলেজে ভর্তির অনেক আগেই ফিরোজ ভাই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। প্রাক্তন ক্যাডেটদের (অরকা) বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, আড্ডায় ও অনুপম সান্ধ্য সামাজিকতায় তাঁর সঙ্গে অনেক গল্প হয়। কাবুলের এক চোখ ধাঁধানো সুন্দরীকে কেন্দ্র করে লেখা বিখ্যাত প্রেমের উপন্যাস ‘‘শবনম” এর একটি বিষয় জানার উৎসাহ ছিল। একদিন ‘‘শবনম” বিষয়ে গল্প করার সময়ে আমার কিছুটা রহস্যময় ইঙ্গিত লক্ষ্য করে এক সময়ের মেধাবী ও সুদক্ষ ব্যাংকার ফিরোজ ভাই হেসে বলেন- ‘আরে এটা স্রেফ ফিকশান, বাস্তব ঘটনা নয়।’
“দেশে বিদেশে” বাংলা ভাষার এক অমূল্য গ্রন্থ। আফগানিস্তানের অনেক বিষয়ে বইটি এখনও প্রাসঙ্গিক। সে দেশের ধর্ম ও ঐতিহ্যের গুরুত্ব বিষয়ে এক স্থানে মুজতবা আলি লিখেছেন- ‘‘পাগড়ি নিয়ে হেলাফেলা করতে নেই। গরীব আফগানের মামুলী পাগড়ি নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া করতে গিয়ে (বাদশা) আমানুল্লার রাজমুকুট খসে পড়লো।”প্রয়াত প্রখ্যাত কূটনীতিক ও কলামিস্ট ফারুক চৌধুরী ব্রাকের উপদেষ্টা হিসেবে ২০০২ সালে আফগানিস্তান সফর করেন। ‘দেশে বিদেশে’র প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তিনি লিখেন- ‘‘সৈয়দ মুজতবা আলিতেই ফিরে যেতে হয়। আফগানিস্তানের হাল হকিকত সম্বন্ধে তার চিন্তার ব্যাপ্তি ছিল বিস্ময়কর, যা তিনি তার অসাধারণ অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন। সেই কথাগুলো আফগানিস্তানের বেলায় আজও হুবহু প্রযোজ্য। প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই যদি বাংলা জানতেন, তাঁর হাতে এক কপি ‘‘দেশে বিদেশে” তুলে দেওয়ার প্রয়াস নিতাম।” উল্লেখ্য, ব্রাক (ইন্টারন্যাশনাল) এই দেশটির আর্থ সামাজিক উন্নয়নে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্ষুদ্র ঋণ) চমৎকার অবদান রাখছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সত্তরের দশকে (১৯৭২-১৯৭৩) উদার আফগানদের আতিথেয়তা লাভ করে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান থেকে ফিরেছিল শত শত বাংলাদেশী। এর চমৎকার বয়ান আমরা পাই লেঃ কর্ণেল এম এ হামিদ এর ‘‘পাকিস্তান থেকে পলায়ন’’ গ্রন্থে। আফগানিস্তানের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের রয়েছে ঐতিহাসিক, সামাজিক, কৃষ্টিগত ও ধর্মীয় অনুভূতি কেন্দ্রিক গভীর এক সহমর্মিতা। তবুও বিভিন্ন কারণে (মূলত যুদ্ধ) বাংলাদেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের উল্লেখযোগ্য কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। ১৯৭৫ সালের মার্চে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট সরদার মোহাম্মদ দাউদ খান বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আফগানদের আতিথেয়তা, সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য আফগান নেতাকে ধন্যবাদ জানান। বঙ্গবন্ধু আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। অদ্যাবধি এটিই ছিল দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রথম ও শেষ সাক্ষাৎ।
১৯৮৯-৯০ সালে আফগানিস্তানে ‘‘অ্যানগোম্যাপ” নামে একটি শান্তিমিশন পরিচালিত হয়েছিল। এই মিশনের কাজ ছিল জেনেভা চুক্তি মোতাবেক সকল রাষ্ট্রের একে অপরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না-করণ বিষয়ে পর্যবেক্ষণকরণ, আফগানিস্তান হতে সোভিয়েত বাহিনীর প্রত্যাবর্তন মনিটর করা এবং শরনার্থীদের প্রত্যাবর্তন তদারকি করা। এই মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুই জন অফিসার সদরদপ্তরে স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অনেক আফগান নাগরিকদের সঙ্গে আমার ইন্টারএ্যাকশন হয়েছে। তাদের মাঝে দেখেছি আফগানিস্তানের শান্তির জন্য আকুল আকুতি। জন্মভূমি নিয়ে তাঁদের স্বপ্নের কথা আমাকেও কখনো কখনো আবেগায়িত করেছে। সরকারি কার্যব্যাপদেশে কুয়েত থাকাকালীন (অপারেশন কুয়েত পুর্ণগঠন) এক আফগান পরিবারের সঙ্গে আমাদের অন্তরঙ্গতা হয়। কাবুল প্রবাসী আফগান যুবক হাসান মাসুদ কুয়েতের একটি ব্যাংকে চাকুরি করতো। বৈকালিক ভ্রমণকালে মাঝে মধ্যে কখনো খাইতান পার্কে, কখনো মেরিনা সমুদ্রতীরে তাদের সঙ্গে দেখা হতো। আমার ৬ বছরের কন্যার সঙ্গে হাসান মাসুদের মিষ্টি মেয়ে ফারহার প্রবল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। যদিও ওরা একে অন্যের ভাষা তেমন বুঝতো না। আমি ও কাবুলওয়ালা মাসুদ যখন আফগানিস্তানের গল্পে মশগুল থাকতাম, তখন দুই নবীন সখি লাজুক ভঙ্গিতে হাত ধরে ঘুরে বেড়াত। দুই ক্ষুদে ফুলপরীর কলহাস্যে মুখরিত হতো উদ্যানের ফুল, বৃক্ষ, লতা, জলের ফোয়ারা।
আফগানিস্তানের বর্তমান ভয়ংকর গৃহযুদ্ধের বাস্তবতায় আবার মনে পড়ছে শান্তির জন্য আফগানদের আকুল আকুতি। এতো দিনে ফারহা হয়তো কলেজ পড়ুয়া স্মার্ট এক তরুণী। ভাবছি কুয়েতের ফারহা কবে তাঁর পিতৃভূমি আফগানিস্তানে ফিরে যেতে পারবে। বিদেশী দখলদারিত্ব, ছায়াযুদ্ধ, সর্বনাশা গৃহযুদ্ধ, দারিদ্র, সন্ত্রাস, ধর্মান্ধতা ও ধর্ম-বিরোধিতা মুক্ত হয়ে কবে আফগানিস্তান শান্তিময় ও বাসযোগ্য হবে। জাতিয় ঐক্য, আফগান ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে নিজেদের নেতৃত্বে গড়ে উঠবে প্রাণবন্ত মানবিক সমাজ ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। শ্বেত মর্মরে গাঁথা বাদশা বাবরের সমাধি উদ্ভাসিত হবে বাসন্তি চন্দ্রিমায়, মাহফিলে কবিরা গাইবে হাফিজের কবিতা। সহস্র মসজিদের মিনার থেকে ভোরের আযান ছড়িয়ে পড়বে দিক-বিদিক। থাকবে না বিদেশী বিমান আক্রমণের ভয়, আফগান গ্রামে গ্রামে জমবে বিয়ের তুমুল উৎসব। পপি চাষের পরিবর্তে নিপুণ আফগান বুনন শিল্পীরা কার্পেটে ফুটিয়ে তুলবে অপরূপ লাল গোলাপ। উগ্রপন্থার বদলে আফগানিস্তান থেকে রপ্তানি হবে হাজার হাজার টাটকা টিউলিপ ফুলের গুচ্ছ।
কবে সেদিন আসবে? কবে? সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম। ভালো থেকো ফারহা।
লেখক : মোঃ বায়েজিদ সরোয়ার, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। bayezidsarwar792@gmail.com