প্রথমেই বলে রাখি, কোন ভাষার বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। সেই ভাষাভাষী মানুষকে আমরা শত্রু মনে করি না। ইংরেজ আমলে স্বাদেশিকতার জোয়ার যখন জাগল, তখন কিছু মানুষ ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে জেহাদ শুরু করলেন। যেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মতো ইংরেজি ভাষাও দোষদুষ্ট। সেই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘শিক্ষার মিলন’। শরৎচন্দ্রের মতো মানুষরাও ভুল বুঝলেন রবীন্দ্রনাথকে। ক্ষুব্ধ শরৎচন্দ্র লিখে ফেললেন ‘শিক্ষার বিরোধ’। গত শতকের আশির দশকে ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা’ নীতিকে প্রয়োগ করতে গিয়ে একই ভুল করেছিলেন তখনকার বামফ্রন্ট সরকার। ভুল বার্তা গিয়েছিল মানুষের কাছে। ফলে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছিল ইংরেজি মাধ্যম স্কুল।
বাংলা, ইংরেজির মতো হিন্দিও একটি ভাষা। সেই ভাষার বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে যাঁরা এই ভাষাকে ব্যবহার করে তাঁদের বিভাজন নীতিকে চালু করতে চান। ‘ভাষা সাম্রাজ্যবাদ’ বলে একটা কথা চালু হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবাপন্ন কিছু মানুষ তাঁদের সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার করতে চান ভাষাকে। আপত্তি সেখানে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারও ভাষাকে হাতিয়ার করতে চাইছেন তাঁদের লক্ষ্য পুরণের জন্য। তাঁরা ধ্বনি তুলেছেন ‘হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান’। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী ভারতের কোন রাষ্ট্রভাষা নেই, আছে দাপ্তরিক ভাষা। অথচ শাসকবর্গ মানুষকে বুঝিয়ে দিতে চান যে হিন্দি আমাদের রাষ্ট্রভাষা। সাধারণ মানুষের মনেও তাই সংস্কার তৈরি হয়। সেই যে হিটলারের জিগরি দোস্ত গোয়েবলস বলেছিলেন, বার বার মিথ্যে বলে গেলে মিথ্যেটাকেই মানুষ সত্যি বলে ধরে নেয়!
ইতিহাস ঘাঁটলে বুঝতে পারা যায় ভারতের শাসকবর্গের হিন্দি প্রেম বিজেপি আমলেরই একচেটিয়া ব্যাপার নয়। ভারতবাসীর উপর হিন্দিকে চাপিয়ে দেবার ব্যাপার শুরু হয়েছে স্বাধীনতার আগে থেকেই। ১৯০৫ সালে বাল গঙ্গাধর তিলক দেবনাগরি লিপিতে লিখিত হিন্দিকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের আধিকারিক ভাষাতে পরিণত করার চেষ্টা করেন। হিন্দুস্তানি নয়, হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেবার দাবি জানায় হিন্দু মহাসভা। ভাষা নিয়ে বিতর্ক চলে সংবিধান সভাতেও। সংবিধানের ৩৪৩ ধারায় হিন্দি ও ইংরেজিকে ভারতের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু সংবিধানের ৩৪৪ ধারার মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক বিষ বীজ। এই বীজটি পরে বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছিল শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে।
৩৪৪ ধারায় বলা হয়েছিল ১৫ বছর ধরে দুটি দাপ্তরিক ভাষা থাকবে কিন্তু এই সময়সীমার মধ্যে হিন্দির ব্যবহার প্রসারিত করা হবে। ১৫ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৬৫ সালে হিন্দি হবে একমাত্র সরকারি ভাষা। তামিলনাড়ুর ডি এমকে দলের প্রতিনিধিরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান এবং তামিলরা শুরু করেন ভাষা আন্দোলন। সে আন্দোলন রক্তক্ষয়ী হয়ে ওঠে। তখন সরকার পিছু হঠতে বাধ্য হন। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল প্রতিশ্রুতি দেন যে ১৯৬৫ সালের পরেও হিন্দির সঙ্গে ইংরেজিও বহাল থাকবে সরকারি ভাষা হিসেবে। ১৯৬৪ সালে মৃত্যু হয় জওহরলালের। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী ১৯৬৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এক বেতার বার্তায় জানিয়ে দেন যে নেহেরুর দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার পালন করবে সরকারি ভাষার ব্যাপারে।
কংগ্রেস দলটির মধ্যে হিন্দুত্ববাদী রক্ষণশীল মানুষ যেমন আছেন, তেমনি আছেন বহুত্ববাদী উদার মানুষও। কিন্তু বিজেপি দলটি পরিচালিত হয় কট্টরপন্থী আর এস এসের দ্বারা। সেখানে বহুত্ববাদ ও উদারনীতির কোন স্থান নেই। সাংসদ মহুয়া মৈত্র সংসদে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা ‘ফ্যাসিবাদ কি করে আসে’ তে বিজেপির একনায়কতন্ত্রী মনোভাব ব্যাখ্যা করেছিলেন। নোটবন্দি থেকে নাগরিকপঞ্জি তার প্রমাণ। ভাষার ব্যাপারেও সেই একনায়কতন্ত্রী মনোভাব দেখা যাচ্ছে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রকের আধিকারিক, বিভিন্ন দপ্তর, পুরসভা ও ব্যাঙ্কগুলিকে মোদি সরকার আদেশ দেন যাতে তারা তাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে হিন্দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কেননা গড়ে তুলতে হবে ‘এক দেশ এক ভাষা’। রাষ্ট্রসংঘে হিন্দিকে আধিকারিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হয়।
সম্প্রতি সরকারি ভাষা সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে সুপারিশ করেছে—
১। রাষ্ট্রসংঘে ভারতের সরকারি ভাষা হোক হিন্দি,
২। কেন্দ্রীয় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পঠন-পাঠনের মাধ্যম হোক হিন্দি,
৩। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হিন্দি ভাষাকে আবশ্যিক করতে হবে,
৪। হিন্দিভাষী রাজ্যে হাইকোর্টের কাজ থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ইংরেজির পরিবর্তে ব্যবহৃত হোক হিন্দি,
৫। সরকারি বিজ্ঞাপনের বাজেটের অর্ধেকের বেশি বরাদ্দ করা হোক হিন্দি ভাষার বিজ্ঞাপনে।…
এই সব সুপারিশ ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ। ডি এমকের সভাপতি স্ট্যালিন পরিহাস করে প্রশ্ন করেছেন, ‘ইণ্ডিয়া না হিন্দিয়া?’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী, কেরলের মুখ্যমন্ত্রী হিন্দিকে চাপিয়ে দেবার চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিবাদ করছেন বিভিন্ন গণসংগঠন। তামিলরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁদের ১৯৬৫ সালের আত্মাহূতি বৃথা যাবে না। বিজেপি তাঁদের নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির ব্যাপারে সাময়িকভাবে পিছু হঠেছেন; ২০২৪ সালে তাঁরা ফের ক্ষমতায় এলে জোর কদমে হিন্দির ওকালতি শুরু করবে।
বিজেপির এই হিন্দিপ্রেমকে অলোক রাই বলেছেন ‘হিন্দি ন্যাশনালিজম’। কে এই অলোক রাই? ইনি হিন্দি সাহিত্যের সম্রাট মুনশি প্রেমচন্দের পৌত্র। তিনি বলেছেন এই শাসকরা মানুষের মুখের হিন্দিকে বর্জন করে এক ‘সংস্কৃতভাকধারী’ কৃত্রিম হিন্দি তৈরি করেছেন; মোদি সরকারপোষিত এই হিন্দি কেবল তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, কেরল, কর্নাটকের বিপদ নয়, উত্তর ভারতের পড়ুয়াদের কাছেও অচেনা এক বিদেশি ভাষা বলে মনে হবে। তিনি বলেছেন সরকারপোষিত হিন্দি হল ‘হিন্দি’র সবচেয়ে বড় শত্রু।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক