মুঘল শাহজাদা দারাশিকোর প্রতি চিকিতসাবিদ্যা বিষয়ক ইলাজাতইদারাশিকো বইটি উতসর্গ করেন মুঘল আমলের প্রখ্যাত চিকিৎসক নুরআলদিন শিরাজি। বইটির অন্য দুটি নামেও বিখ্যার টিব্বইদারাশিকো, দাহরাইদারাশিকো। বইতে সে সময় মুঘল রাজত্বে ইস্লামি চিকিতসাশাস্ত্রীদের প্রচলিত জ্ঞান সংকলন করা হয়েছে। নামের উপসর্গে শিরাজি যোগ করার অর্থ হল তার পরিবার ইরানের শিরাজ প্রদেশজাত।
নুরুলদিন মহম্মদ আবদুল্লা সিরাজি সপ্তদশ শতকের মুঘল হিন্দুস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসক। জন্ম ভারতবর্ষে। যতদূর সম্ভব তাঁর পিতা ছিলেন ইরাণী হাকিম আয়ানুল মুলক শিরাজি (মৃত ১৫৯৫)। মায়ের দিকটাও ছিল ইরাণের প্রখ্যাত দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক জালালুদ্দিনএর (মৃত ১৫০২) পরিবার। আয়ানুল মুলক শিরাজি ছিলেন সম্রাট আকবরের দরবারের হেকিম এবং চক্ষুবিশারদ (অপথ্যালমোলজিস্ট)। নুরুলদিন শিরাজির মা আয়ানুল মুলক শিরাজির স্ত্রী ছিলেন আকবরের দরবারের দুজন গুরুত্বপূর্ণ দরবারি ভাই ঐতিহাসিক আবুল ফজল আল্লামি এবং কবি ফৈজির বোন।
নুরুলদিন শাহজাহানের রাজত্বে মুঘল দরবারে প্রবেশ করেন। সেখানে আবার তাঁকে তাঁর পিতার উপাধি আয়ানুলমুলক আর্ষানো হয়। পরে আওরঙ্গজেবের সময় তিনি আগরার দেওয়ানইবুউতাত, রাজ প্রাসাদগুলির কর্মাধ্যক্ষ পদে মনোনীত হন। চিকিৎসা শাস্ত্রের নানান বই লেখা ছাড়াও তিনি রুকাওয়াতই আবুলফজল এবং ফৈজির চিঠিপত্রের সকলনও তিনি প্রকাশ করেন। এছাড়াও একেশ্বরবাদের তত্ত্ব তৌহিদ বিষয়ে পুস্তক মীরাটিব অল উজুদ লেখেন।

ইলাজাতই দারাশিকো ছাড়াও তিনি ফারসিতে শাহজাহানকে উতসর্গ করে লেখেন আলফাজঅলাদওয়িয়া — সে সময়ের মুঘল হিন্দুস্তানে প্রচলিত ওষুধের বিশদ বিবরণ। বইটির হাতিমা অধ্যায়ে চা, কফি এবং চিনা শেকড়বাকড় নিয়ে যা প্রচলিত জ্ঞান, সে সবও লিখিত হয়। এটি উনবিংশ শতক পর্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পড়ানো হত। ফলে এর অনেকগুলি সংকলনও প্রকাশিত হয়। সিরাজির অন্য একটি বইএর নাম আনিসআলমুয়ালিজান চিকিৎস বিষয়ক সকলন। এ ছাড়াও আরবি আর ফারসি চিকিতসাবিষয়ক লব্জ নিয়েও সংকলন লেখেন কোয়াস্তাসঅলআটিব্বা। এটি তিনি আমনুল্লা হানকে উতসর্গ করেন।
শিরাজির কাজ ইওরোপিয়দের নজর এড়ায় নি। বিশেষ করে যখন ইওরোপে তখন মেটিরিয়া মেডিকা সংকলিত হচ্ছে, সেই সময়টিতে তখন এটি গুরুত্বসহকারে আলোচনায় উঠে আসে। আগেই বলেছি শিরাজির এই কাজের বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়। শিরাজির পুস্তক আলফাজ… প্রথম ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ফ্রান্সিস গ্ল্যাডউইন ১৭৯৩ সনে কলকাতায়, বাজারে এটির প্রথম মূল ফারসি সংস্করণ ছাপা হয়ে আসার বহু আগে। গ্ল্যাডউইন মুখবন্ধে প্রকাশের উদ্দেশ্য বিষয়ে জ্ঞাত করে লেখেন, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মেডিক্যাল বোর্ডের নির্দেশে, ‘কোম্পানির ব্যবহারের জন্যে’ বইটি প্রকাশিত হল।
১৮৩১তে মেজর ডেভিড প্রাইস ইলাজাতইদারাশুকো থেকে নাসিরইহুসরোর সম্পাদিত অংশ মানবদেহের সাড়া, সময় ও বস্তুর কাজটি বিশদে অনুবাদ করেন। মুখবন্ধে তিনি লেখেন, a work of no common magnitude or importance […] and contains treatises, or discourses, not only on all the diseases […] but also on almost every subject within the compass of the human understanding. এই মুখবন্ধে বলা হয় সুরাটের ফরাসি কুঠিয়াল এম ব্রুইস ফ্রান্সের রাজসিক গ্রন্থাগারের জন্যে জন্যেও এই পুস্তক নকল করেছেন। কুঠিয়ালের ব্যক্তিগত সংগ্রহের পুঁথিটি ১৮০২ তে প্যারিসের বিবলিওথেক ন্যাশিওনাল দা পারিতে নিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

শিরাজির ইলায়াজা… মুঘল আমলের সব থেকে ব্যাপ্ত চিকিতসাশাস্ত্র বিষয়ক কাজ। পারস্যের চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে এলগুড এই গুরুত্ব বিষয়ে প্রখ্যাত জ্ঞানী ইবনে সিনা Avicenna-র কাজের গুণাগুনের সঙ্গে তুলনা লেখেন, a gigantic work which rivals in quantity, if not in quality, the Canon of Avicenna or the Thesaurus of al-Jurjani। তার আকারের তুলনায় এই কাজটি খুব কম সময়ে লেখেছিলেন শিরাজি। শিরাজি ইলায়াজা… লেখা শুরু করেন ১৬৪২-৪৩ সনে এবং এটি চার বছরের মধ্যে ১৬৪৬ লেখা শেষ করেন। বইতে তার চিকিৎসা জীবনের নানান অভিজ্ঞতাও তিনি লিপিবদ্ধ করেন। একই সঙ্গে তার আগের সময়ের জ্ঞানীদের বেশ কিছু কিছু জ্ঞানও লিপিবদ্ধ করেন। Fabrizio Speziale-র The Encounter of Medical Traditions in Nūr al-Dīn Šīrāzī’s ’Ilājāt-i Dārā Šikōhī তে বলছেন তিনি এই প্রবন্ধ লেখার সময় ইলায়াজা…র একটি সংস্করণ দেখেন তেহরানের মজলিস গ্রন্থাগারে। এই বইতে বেশ কিছু ছবিও আঁকা আছে, বিশেষ করে representations of the human body indicating the spots for cupping, phlebotomy and cauterization।
ইলাজাত…র সে যুগের জ্ঞানচর্চার অন্যতম সংশ্লেষী উদাহরণ। এটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল সে সময় ভারতীয় চিকিতসাশাস্ত্রলোকের যে ইন্দো-ফারসি জ্ঞানভাণ্ডার (বর্তমান ও অতীতের) ছিল, সেইগুলি এতে সঙ্কলিত হয়েছে। মুঘল শাহজাদা দারাশুকো ভারতীয় সুফি পরম্পরার অন্যতম কারিগর এবং উৎসাহী মানুষ ছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্যেই এই পুঁথিটি উতসর্গিত করেন তিনি। দারাশুকো উপনিষদের ফারসি অনুবাদ, শীররইয়াকবর-এ উৎসাহ দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি ফারসি ভাষায় লিখত সুফি সাধনার মুসলমান এবং হিন্দু তত্ত্ব পরম্পরার তুলনামূলক আলোচনার পুঁথি, মাজমুলবাহারিনও (১৬৫৫) লেখেন।
শিরাজির সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরাও ভারতীয় জ্ঞানচর্চার অন্যতম ধারক-বাহক। তাঁর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় ফৈজী ১৫৮৭এ, ভাষ্করের লীলাবতী অনুবাদ করেন আকবরের উতসাহে। এছাড়াও বেদান্ত দর্শন বিষয়ে সারিকুলমারিফাত লেখেন ইশরাকি ধর্মতত্ত্ব ভিত্তি করে। আকবরের নির্দেশে অথর্ববেদ অনুবাদের যে প্রকল্প নেওয়া হয় ফৈজী সেটির সঙ্গেও জড়িয়েছিলেন, কিন্তু সে কাজ যতদূর সম্ভব শেষ হয় নি। আকবরের নির্দেশে মহাভারতের ফারসি অনুবাদের ভূমিকা লেখেন আবুল ফজল এবং আইনিআকবরিতে ভারতীয় নানান পরম্পরার পরিচয় দেন তিনি।

মুঘল ভারতে ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে বিপুল পরিমান ফারসি বই রচিত হয়। সুলতানি সময় থেকে এই কাজটি উর্দু ভাষায় শুরু হয় এবং ধারাবাহিকভাবে চলে ব্রিটিশ আমলের আগে পর্যন্ত। উর্দু আর ফারসি ভাষায় ইসলাম-পূর্ব সময়ের চিকিৎসা শাস্ত্র এবং বিজ্ঞান বিষয়ক শাস্ত্র অনুবাদ মুঘল আমলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্ম বলে আজও বিবেচিত হয়। বিশেষ করে চিকিৎসা শাস্ত্র/জ্ঞান অনুবাদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় ভাষায় বিদেশি ওষুধ, গাছগাছড়ার প্রতিস্থাপনের দেশিয় জ্ঞান অর্জন। ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ে ফারসি পুঁথি লেখেন শিরাজীর সমসাময়িক চিকিৎসক আমনুল্লা হান। তিনি মদনবিনোদএর ফারসি অনুবাদ করেন। কয়েকটিতে ঔরঙ্গজেবের নামও জোড়া হয়, যেমন দারউইসমহম্মদের চিকিতসাশাস্ত্র বিষয়ে কাজ টিবইআউরঙ্গশাহী।
ইলাজাত…এর আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল ইসলামের ধার্মিক ও অধার্মিক পরম্পরার জ্ঞান ঐতিহ্যের পারস্পরিক সহাবস্থান। নুররুলদিন তার পুঁথিতে, নবি উল্লিখিত হাদিত (একটি শারীর বিজ্ঞান অন্যটি ধর্ম সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান) এবং ইসলামপূর্ব ইমাম এবং ধর্মতাত্ত্বিকদের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এই পুস্তকে তিনি অষ্টম শিয়াপন্থী ইমাম আলিঅলরিদার সময়ে লিখিত রিসালাঅলদাহাবিয়া থেকেও উদ্ধৃতি তুলেছেন। যোগীরা কিভাবে নিঃশ্বাসের কাজকর্ম করেন, সে উল্লেখও শিরাজী করেছেন তার পুঁথিতে।
সুফি বাদের কোন পন্থে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন তার উল্লেখ নেই যদিও, কিন্তু এই তথ্যটা পরিষ্কার তিনি দারার অনুগামী ছিলেন।