রাজ্য জুড়ে কৃষিতে সেচ ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে। কারণ একটাই তা হল জলের সঙ্কট। একদিকে ভূগর্ভস্থ জলে টান। অপরদিকে অনিয়মিত বৃষ্টি। নদী-নালা, খাল-বিল জলের অভাবে শুকোচ্ছে। সেইসঙ্গে সংস্কারের অভাবে মজে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে কৃষিতে সেচের অভাব এখন থেকেই চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরাও চিন্তিত। রাজ্যের মোট চাষির ৯৬ শতাংশ ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক চাষি। দেখা যাচ্ছে ৬৮ লক্ষ ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক পরিবার চাষি। যা রাজ্যের মোট পরিবারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ চাষের উপর নির্ভরশীল। সেচ পরিকাঠামো সেখানে যদি দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে তাহলে আগামী দিনে ফসল উৎপাদনে মার খাবে ওই সমস্ত চাষি। আর তার ফল ভুগতে হবে রাজ্যবাসীকে। এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ধরা যাক কৃষি প্রধান জেলা হুগলির কথা। এই জেলায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৫২ লক্ষ হেক্টর। যার মালিকানা ৭১ লক্ষ ২৩ হাজার কৃষক পরিবার। দেখা যাচ্ছে এই জেলায় ৮০ শতাংশ সেচের উপর নির্ভরশীল। সেখানে ব্যবহার হচ্ছে নদী উত্তোলন সেচ, ক্যানাল (ডি ভি সি), গভীর নলকূপ, মিনি গভীর নলকূপ, খালবিল ও পুকুর — ডোবা ইত্যাদি সেচ থেকে। দিনের দিন এগুলো প্রায় সবই সেচ ব্যবস্থায় দুর্বল হচ্ছে। উল্লেখ করতেই হয় হুগলি জেলার ১৮ টি ব্লকে বেশিরভাগ জমি তিন অথবা দু-ফসলি। বেশি সেচের উপর চাষিরা নির্ভরশীল বোরো ও রবি চাষে। বোরো চাষ হয় ৩০ হাজার হেক্টরে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিগত কয়েক বছর অনিয়মিত বৃষ্টির ফলে ডিভিসি সব ব্লকগুলিকে একসঙ্গে দরকার মতো সেচের জল দিতে পারছে না। প্রতি বছর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। কংসাবতী বাঁধ থেকে গোঘাট ব্লকে সেচের জলে একই অবস্থা। এদিকে ভূগর্ভস্থ জলেও টান পড়েছে। ইতিমধ্যে জেলার কয়েকটি ব্লককে ব্ল্যাক জোন ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ব্লকগুলিতে সরকারিভাবে ভূগর্ভস্থ থেকে জল তোলার ব্যাপারেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এখানেই চাষিদের ঘুম কেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন হুগলি জেলা-সহ রাজ্যের একটা বড় অংশ বন্যা প্রবণ। সেচ পরিকল্পনায় আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব আছে। কম বা বেশি বৃষ্টি রাজ্যের এক বড় অংশের কৃষকে প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত করে। তা সত্ত্বেও বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভর করে এলাকাভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিরাট ঘাটতি আছে। বিশেষজ্ঞের মতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে খরিফ বা রবি মরসুমের দৈর্ঘ্যের যে পরিবর্তন হচ্ছে তা মাথায় রেখে এলাকাভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা হচ্ছে না। সেচের অভাব দেখা দিচ্ছে। চিরাচরিত প্রক্রিয়ায় চাষ করতে গিয়ে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
প্রসঙ্গত সেচের আরও সমস্যার কারণ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা তাহল— চাষিরা এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতে ও অবৈজ্ঞানিকভাবে চাষ করছেন। এছাড়াও বাণিজ্যিক ফসলের চাষ কম করছেন। তাছাড়াও লক্ষ্য করা যাচ্ছে ছোট ছোট ও অসমতল জমিতে সেচের পরিমাণ বাড়ছে।

উল্লেখ, কিছু কিছু অঞ্চল জলসেচ নির্ভর হলেও বেশিরভাগ মৌসুমী বায়ুর উপর নির্ভরশীল। হুগলি জেলা মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল। সে জন্য সেচ ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করতে হবে। এজন্য জরুরি কিছু কার্যকরী পরিকল্পনা দরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে এলাকাভিত্তিক আবহাওয়া অনুসারে কৃষি ও সেচের পরিকল্পনা দরকার। পুকুর খনন, ভূগর্ভস্থ জলের সংরক্ষণ, বৃষ্টির জলকে ধরে রাখার ব্যবস্থা, নদী-খাল-বিল-পুকুর সংস্কার, ছোট-বড় নদীগুলোর একত্রে সংযোগ ঘটাতে হবে। সরকারিভাবে সেচের উন্নতিকল্পে বিভিন্ন গঠনমূলক পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রসঙ্গত রাজ্যসরকার সেচের উন্নতিকল্পে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সেচের অভাবে ফসল উৎপাদনে যাতে চাষিরা মার না খায় এজন্য একটি মাইক্রোসেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। যা জলসম্পদ সংরক্ষণ করছে। আবার কৃষকদের ফসল উৎপাদনেও সহায়তা করছে। যা ‘বাংলা কৃষি সেচ যোজনা’ নামে পরিচিত। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হল দরিদ্র কৃষকদের বিনামুল্যে ফসলে সেচ সুবিধা-সহ তাদের ফসল বৃদ্ধি করতে সহায়তা করা। মাইক্রো সেচ প্রকল্পের আওতায় রাজ্যসরকার কৃষকদের জন্য ক্ষুদ্র সেচ সুবিধা প্রদান করছে। এটি কৃষিক্ষেত্রে জলের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবে। সর্বোপরি জলের অপচয়রোধে কার্যকর হবে। দুটি নির্দিষ্ট সেচ কৌশল চিহ্নিত করেছে। একটি স্প্রিঙ্কলার সেচ ব্যবস্থা (Sprinkler Irrigation System) এবং অন্যটি ড্রিপ সেচ (drip irrigation system)। এই দুটি পদ্ধতি জল সংরক্ষণের সহায়তা করবে। সরকার এ ব্যাপারে চাষিদের আর্থিক সহায়তা করবে। খাদ্যশস্য চাষ ছাড়াও এই সেচ প্রকল্পটি শাকসবজি ও ফল চাষের জন্যেও পর্যাপ্ত পরিমাণ জল সরবরাহ করবে।

মনে রাখতে হবে রাজ্যের মোট আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। তাই কৃষিতে সেচ ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে আগাম গঠনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নচেৎ উৎপাদনে ঘাটতি হবে। আয় কমবে। চাষির ঋণে জর্জরিত হবেন।