আগামী শনিবার হিমাচল প্রদেশের বিধানসভা ভোট। এই মুহুর্তে পাহাড়ি রাজ্যে রাজনৈতিক দলগুলির তুমুল প্রচার চলছে। প্রসঙ্গত, ১৯৮৫ সাল থেকে হিমাচল প্রদেশে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বিধানসভা ভোটের ফলাফলে সরকার বদল হয়েছে। বিজেপি গত পাঁচ বছর এ রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসার কথা। এবার সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে কিনা তা জানা যাবে ফলাফলের দিন। তবে এবার কেবল কংগ্রেসই যে বিজেপিকে পরাস্ত করে ক্ষমতায় আসতে মরিয়া তা নয়, আম আদমি পার্টিও এই লড়াইতে সামিল। তারা দিল্লি ও পাঞ্জাবের পর হিমাচলেও নিজেদের জায়গা করে নিতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তাই গুজরাটের পাশাপাশি, হিমাচলেও নির্বাচনী প্রচারে নেমেছে আপ। তবে এবারও হিমাচলের মাটি ছাড়তে নারাজ বিজেপি। কংগ্রেসও ফিরে আসতে মরীয়া।
বিজেপি, কংগ্রেস ও আপের হেভি ওয়েট নেতারা পাহাড়ি রাজ্যে ভোটের ঠিক দু-দিন আগে পৌঁছে জোর প্রচার শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার হিমাচল গিয়েছেন। গত ৫ নভেম্বর সুন্দরনগর এবং সোলানে জনসভা করে মোদী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালিয়ে বলেছেন, “কেবলমাত্র দেশের সুরক্ষাই নয়, উন্নয়নের পথেও বাধা দিছে কংগ্রেস।” বুধবার সুজনপুর এবং চাম্বলিতে নির্বাচনী প্রচারে তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচন কেবলমাত্র ৫ বছর নয়, আগামী ২৫ বছরের জন্য রাজ্যের উন্নয়ন নির্ধারণ করবে। মোদী ছাড়াও বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ক্ষমতায় এলে পাহাড়ি রাজ্যের স্কুল ছাত্রীদের সাইকেল এবং কলেজ ছাত্রীদের স্কুটার দেওয়া হবে, পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন ৫টি নার্সিং স্কুল খোলা হবে।
অন্যদিকে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের নব নির্বাচিত সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে কংগ্রেসকে উদ্বুদ্ধ করতে এবং নির্বাচনী প্রচার চালাতে বুধবার সকালে হিমাচল পৌঁছে সিমলা ও নালগড়ে প্রচার শুরু করেছেন। হিমাচলে মাত্র দু’দিনের জন্য প্রচারে এসেছিলেন প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা, কিন্তু রাহুল গান্ধী হিমাচলে যাননি। কংগ্রেস ছত্তীসগঢ়ের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বঘেল, রাজস্থানের সচিন পাইলটকে বাদ দিলে মূলত স্থানীয় নেতাদের উপরেই ভরসা রেখেছে। গত রবিবার দেশের যে ছটি রাজ্যের সাতটি আসনের উপনির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে তাতে বিজেপি জয়ের আধিপত্য অখুণ্ণ রেখেছে। ৪টিতে বিজেপি এবং ১টি করে আসনে জয়ী হয়েছে আরজেডি, টিআরএস এবং উদ্ধবপন্থী শিবসেনা। কোথাও খাতা খুলতে পারেনি কংগ্রেস। ছয় রাজ্যের সাতটি বিধানসভা আসনের মধ্যে মাত্র তিনটি আসনে লড়েছিল তারা। কিন্তু সব আসনেই পরাজিত হয়েছে। আপ জামানত হারিয়েছে। তবে হিমাচলে তারা নির্বাচনী প্রচারে পিছিয়ে নেই। বৃহস্পতিবার আপ প্রার্থী রঞ্জন সুশান্তকে সমর্থন করতে হিমাচল পৌঁছেছেন আপ নেতা সঞ্জয় সিং। বিজেপি নেতারা মনে করছেন, আম আদমি পার্টি হিমাচলের ভোটে নামলেও অরবিন্দ কেজরীওয়াল মূলত গুজরাতেই জোর দিচ্ছেন। ফলে হিমাচলে বিজেপি বনাম কংগ্রেসের দ্বিমুখী লড়াই হবে।
হিমাচলে বিজেপির সমস্যা দলের বিদ্রোহীদের নিয়ে। তাদের মধ্যে অন্যতম নাম কৃপাল পারমার। নরেন্দ্র মোদী নিজে নাকি তাঁকে ফোন করে নির্বাচনের লড়াই থেকে সরে দাঁড়াতে বারন করেছেন। কিন্তু তিনি ভোটে লড়ছেন স্বাধীন ভাবে। যদিও তিনি সরাসরি তোপ দেগেছেন জেপি নাড্ডার বিরুদ্ধে। তিনি বলেছেন, ভোটের লড়াইতে থাকলেও বিজেপির প্রতিনিধি হিসাবে নয়, তাঁর লড়াই কংগ্রেসের সঙ্গে। জানা যাচ্ছে হিমাচলে বিজেপি পার্টির মধ্যে অনেক দ্বন্দ্ব রয়েছে। সে রাজ্যে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসতে হলে কংগ্রেসকে হারানোর পাশাপাশি নিজেদের সমস্যাও মেটাতে হবে। অন্যদিকে এবার হিমাচল প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে কংগ্রেসের ২৬ জন নেতা একসঙ্গে বিজেপি-তে যোগ দিয়েছেন৷ তার মধ্যে হিমাচল প্রদেশ কংগ্রেসের কয়েকজন পদাধিকারীও রয়েছেন৷ তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম ঠাকুরের উপস্থিতিতেই গেরুয়া শিবিরে যোগ দেন৷ কংগ্রেসে ভাঙন ধরিয়ে স্বভাবতই ভোটের আগে আরও চাঙ্গা পদ্ম শিবির৷ যে কারণে মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম ঠাকুর দাবি করেছেন, আরও অন্তত ২৫ বছর হিমাচল প্রদেশে শাসন করবে বিজেপি৷
কিন্তু হিমাচলে ভোটের আগে থেকেই স্থানীয় সমস্যা বড় হয়ে উঠছে। রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দাবি, পুরনো পেনশন প্রকল্প ফেরানোর দাবিতে সেখানে আন্দোলন চলছে। হিমাচলের আপেল চাষিরা রাস্তায় নেমে দাবি জানাচ্ছে, সার, ছত্রাক নাশকের দাম বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহণ খরচ বেড়েছে। অথচ তাঁরা আপেলের ঠিক মতো দাম পাচ্ছেন না। সুবিধা পাচ্ছে শুধু কৃষিপণ্য শিল্প সংস্থাগুলি। পঞ্জাব লাগোয়া জেলাগুলির অধিকাংশ পরিবারে কেউ না কেউ সেনায় কাজ করে। বহু যুবক সেনার চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু ‘অগ্নিবীর’ প্রকল্পে মাত্র চার বছরের জন্য সেনায় নিয়োগ- তরুণদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই ইস্যুগুলি বিজেপির মাথা ব্যাথার যথেষ্ট কারণ। কিন্তু কংগ্রেস সরকার বিরোধিতার হাওয়া নিজের পালে টেনে আনতে সক্ষম হয় কিনা সেটাই এখন দেখার।
হিমাচলের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম ঠাকুরের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ, রাজ্যে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকারের বদলের প্রথা উল্টে দেওয়া। কংগ্রেস বলছে, ক্ষমতাসীন বিজেপি স্থানীয় সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে দিল্লির নেতাদের হিমাচলে প্রচারে নামিয়েছে। কেন্দ্রে-রাজ্যে বিজেপির ‘ডবল ইঞ্জিন’-এর সরকারের মাহাত্ম্য প্রচার করছে। হিমাচলের মানুষের ক্ষোভ তাতে মিটবে না।