রাজারহাট-গোপালপুর-নারায়ণপুরের আঞ্চলিক ইতিহাস কেউ লিখে গিয়েছেন কিনা, আমার জানা নেই। রাজা প্রতাপাদিত্য, রাজ মানসিংহ, রাজা নবকৃষ্ণদেব, না বর্ধমানের মহারাজা — কার নাম থেকে যে এই ‘রাজারহাট’ নামটির উৎপত্তি, তা জানা দুষ্কর।
বিভিন্ন জায়গায় আর একটি আজগুবি ব্যুৎপত্তির কথা পড়া যাবে। যেমন, — “রাজা গজেন্দ্রনারায়ণ রায় মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অধীনে অর্থ-কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন, হাভেলি শহরে (বর্তমানে হালিশহর) বসবাস করেছিলেন। উত্তর চব্বিশ পরগনার বৃহত্তর অংশে তাঁর বিশাল জমিদারি ছিল। একদিন তিনি লাবণ্যবতী নদী (বর্তমানে নোয়া খাল নামে একটি সংকীর্ণ খাল) বরাবর বজরা করে তাঁর জমিদারিতে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে দুর্ঘটনার ফলে বজরা ডুবে গেল এবং তার সঙ্গে সব যাত্রীর সলিলসমাধি হল। এই দুর্ঘটনার পর তিনি হালিশহর ফিরে আসতে অস্বীকার করেন এবং এই স্থানে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। লাবণ্যবতী নদীর উত্তরে তিনি তাঁর বাসভবন নির্মাণ করেন। তার বাড়ির চারপাশে একটি গ্রাম বেড়ে উঠল, যা এখনও রাজবাটী বা রাজবাড়ি নামে পরিচিত। এই গ্রামটি জোজেড়া ও বেরবাড়ি গ্রামের দুই কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। পরবর্তীকালে তাঁর প্রজাদের অনেক পরিবারই এই জায়গাটির চারপাশে বসতে শুরু করে এবং বাজার শুরু হয় যা ক্রমে রাজারহাট নামে পরিচিত হল। এই বাজারটি এখনো পূর্ব দিকে অবস্থিত — বিষ্ণুপুর রোড ও পুরনো শ্যামবাজার — বসিরহাট লাইট রেললাইন, বর্তমানে বাগুইটআটি-রাজরহাট রোড নামে পরিচিত। এই রাজা গজেন্দ্রনারায়ণ রায়ের পরবর্তী ৭ম প্রজন্ম দুর্গা প্রসাদ রায় বেহালায় বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং তাকে বেহালা বিখ্যাত রায় পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করা হয়।”
গল্পের গরু যে গাছে উঠেছে তা তো দেখাই যাচ্ছ।
এরকম আর একটি কাহিনী শুনিয়েছেন লেখক হরিপদ ভৌমিক।
শহরের ব্যুৎপত্তি এবং ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন: “রাজারহাট নামটি আসে ১৬৪৯ সালে যখন গৌরহরি রায়চৌধুরী এই এলাকায় একটি বাজার শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র ছিলেন। ১৬০৮ সালে, রাজা মানসিং গঙ্গোপাধ্যায়কে বারাকপুর থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত পাঁচটি পরগনার জমিদারি দিয়েছিলেন। তারা ছিল করআদায়কারী (মজুমদার), স্থানীয়ভাবে রাজা হিসেবে সম্মানিত,” ভৌমিক ব্যাখ্যা করেছিলেন।
বর্তমান রাজারহাট সেই দিনগুলিতে ইতিমধ্যেই জনবসতি ছিল কিন্তু রায়চৌধুরীরা এটির বিস্তার ও উন্নয়ন শুরু করলে এটি একটি নতুন চেহারা পায়।
“রাজারহাট নামটি কেবলমাত্র সেই জায়গায় দেওয়া হয়েছিল যেখানে বাজারটি এসেছিল তবে এটি এর আশেপাশের অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেকটা যেমন নদীয়া, যেটি এখন একটি জেলা, একসময় এমন একটি জায়গা ছিল যেখানে একজন তান্ত্রিক নয়টি (নাউ) দিয়া জ্বালিয়ে ধ্যান করতেন,” বলেছেন ভৌমিক।
কিন্তু রায়চৌধুরীর মৃত্যুর পর, তাঁর ছেলে ১৭১৬ সালে নিমতা, বিরাটিতে তাদের বাসভবন ছেড়ে বড়িশা, বেহালায় চলে আসেন। তারপর থেকে, রাজারহাট পরবর্তী কয়েক শতাব্দী অবহেলার শিকার হয়।
বিংশ শতাব্দীতে, সংযোগের অভাবের কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। “রাজারহাটে একমাত্র পরিবহন ছিল তখন গরুর গাড়িতে। শ্যামবাজার ছেড়ে যাওয়া বাসগুলি বাগুইআটি বা রাজারহাটে পৌঁছতে পারেনি কারণ বাগজোলা খাল পথে এসেছিল,’ ভৌমিক ব্যাখ্যা করেছিলেন।”
এরকম ভাবে এক রাজাকে রাজারহাটের নেপথ্যে নিয়ে আসা হয়, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব, না-মুমকিনও বলা যায়।
তবে সাবঅল্টার্ন থিওরি তো রাজা-মহারাজাদেরও ছেড়ে কথা বলে না! ধ্বনিগতভাবে ‘রাজা’-র কাছাকাছি শুনতে একটি শব্দ আছে ‘রেজা’। অভিধানে এর অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘ছোট খণ্ড বা টুকরো’। আর একটি অর্থ হল, ‘রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে বা সহকারী’। শব্দটি বাংলায় এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। গরিব ও প্রান্তিক মুসলমান অধ্যুষিত ওই অঞ্চলের গ্রামগুলোতে কোনও ফসলের ঝড়তিপড়তি অংশ বা টুকরোগুলো হয়তো ফেলা হত না। ‘রেজামাল’, ‘রেজা আলু’ শব্দগুলো গ্রামবাংলায় এখনও চালু আছে। কেঁট বা ছোট আলু, ছোট মাছ, ছোট কপি, ছোট বেগুন প্রভৃতি হয়তো বিক্রি হত ‘রেজা-র হাট’-এ। রেজা-র হাট’-ই কালে কালে লোকমুখে ‘রাজারহাট’ হয়ে গেল। রাজমিস্ত্রির জোগাড়েরাও বাস করত ওই অঞ্চলে। কারণ শহর কলকাতার বড় বড় ইমারতগুলো তখন গড়ে উঠছে। রাজমিস্ত্রির সঙ্গে জোগাড়েদেরও তখন খুব চাহিদা। এই অঞ্চলে সেই জোগাড়েদের জন্যে কমদামের হাট বসত। ‘রাজাবাজার’ জায়গাটিতেও আমি স্বচক্ষে রাজমিস্ত্রির জোগাড়েদের বসে থাকতে দেখেছি আটের দশকের প্রথমদিকে। তখন আমি নারকেলডাঙার ড. বি সি রায় মেমোরিয়াল হসপিটাল ফর চিলড্রেনের (এখন নাম বদলে গেছে) পিডিয়াট্রিক্সের হাউসস্টাফ। রাজারহাটেও এক চিত্র থাকা অসম্ভব নয়। রেজারহাট বলে একটি জায়গা সত্যিই আছে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জে।
রাজারহাটে এখন বড় বড় অফিস-কাছারি, এম এন সি-র স্বর্গরাজ্য এখন রাজারহাট। অনেক সংবাদপত্রের দপ্তরও এখন সেখানে। এখন সত্যিই রাজা বনে গেছে রাজারহাট। কিন্তু তিনশ’ বছর আগে এই রাজারহাট কি ছিল?