হিমালয়ে কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা ঘটলে দেখা যায় দুর্ঘটনাটির সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান না করেই মেঘ-ভাঙা বৃষ্টিকেই দায়ী করা হয়। গত ৫ অগাস্ট উত্তরাখণ্ডের ধারালিতে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে তার বেলাতেও প্রাথমিকভাবে মেঘ-ভাঙা বৃষ্টির কথাই বলা হয়। যদিও কয়েকটি রিপোর্টে অন্য কয়েকটি প্রসঙ্গের উল্লেখ করা হয়েছে যেমন, ওই অঞ্চলে চওড়া রাস্তা তৈরির কাজ চলছিল, তার একটি বড় প্রভাবে এই ঘটনা ঘটতে পারে কিন্তু এখনই নিশ্চিতভাবে সেকথা বলা যায়না তবে তেমনটা ঘটার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। ঠিক কী কারণে এত বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়, এত প্রাণহানি, এত সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হল — সেটা ঠিকঠিকভাবে নিরূপণ করতে হলে বিস্তারিত ক্ষেত্রসমীক্ষা দরকার, বিভিন্ন সময়ের উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবির গভীর পর্যবেক্ষণ দরকার এবং সঠিক ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা দরকার। তবেই বেরিয়ে আসতে পারে ধারালির মতো বিপর্যয়ের এক বা একাধিক কারণ।
ধারালি বিপর্যয়ের পর বলা হয়, মেঘ-ভাঙা বৃষ্টি হল কারণ। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় এই দুর্যোগ। কিন্তু ৬ অগাস্টের আবহাওয়া দফতরের রিপোর্ট বলছে, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল মাঝারি। অর্থাৎ মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি হলে যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি হয় তা হয়নি। তাহলে কারণ কী? আরও গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। কারণ এক বা একাধিক যাই হোক, অনুসন্ধানেই কারণ জানা যাবে এবং কীভাবে এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব সেটিও বোঝা যাবে। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব, বিশেষ করে হিমালয়ের মতো উঁচু জায়গায়। তবু আমরা যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এবার আসা যাক ওই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে কি কি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, এই ধরনের বন্যা বা জলোচ্ছাসকে আমরা বলি হিমবাহের হ্রদের আকস্মিক বন্যা বা glacial lake outburst flood GLOF। হিমবাহজাত হ্রদে জল থাকে, আবার পলি এসেও জমা হয়। এই হ্রদেরও ক্ষয়সীমা আছে। অর্থাৎ যে নির্দিষ্ট সীমা অবধি নদী তার তলদেশকে কাটতে পারে। সব নদীরই সমুদ্রে এসে পড়ার কথা। কিন্তু অনেক উচ্চতায় যে হ্রদগুলি রয়েছে বা স্থলভাগের মধ্যেকার হ্রদগুলিতেও ক্ষয়সীমা আছে তবে সেগুলি অস্থায়ী। অর্থাৎ সেখানে পলি জমা হলেও কোনো কারণে যদি সেই হ্রদের সঙ্গে অন্য কোনো খাত যুক্ত হয়, তাহলে পলি চেষ্টা করবে চূড়ান্ত ক্ষয়সীমার নিচে নেমে আসতে, মানে সমুদ্রপৃষ্ঠের স্তরে নেমে আসতে। হিমালয়ের নদীগুলির প্রবণতা হল হিমালয়কে সমুদ্রপৃষ্ঠে নামিয়ে আনা।

হিমবাহজাত হ্রদে পলি জমা হতে হতে একসময় তার সীমারেখা দুর্বল হয়ে পড়ে। যদি কোনো ভূমিকম্প হয়, সীমারেখার শিলাস্তরে ফাটল দেখা দিতে পারে। আবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ যখন গলতে থাকে, তখন হ্রদের সীমানা দেওয়ালের বরফও গলতে থাকে, আশেপাশের হিমবাহজাত দেওয়াল আর ধরে রাখতে পারে না। বরফ গলতে থাকায় হ্রদের জল আর পলির মিশ্র প্রবাহ নিম্নস্রোতের কোনো এক নদীখাতকে লক্ষ্য করেই নেমে আসে। আমরা জানি উত্তরাখণ্ডের বারোশোর-এ এমন হিমবাহজাত হ্রদ রয়েছে। উত্তরকাশীতেই রয়েছে ৪৩০টি হ্রদ। তার মধ্যে ১৩-১৪টি এমন অবস্থায় রয়েছে, যে কোনো সময়ে সেখানে বিস্ফোরক বন্যা হতে পারে। পরের কারণটি হল হিমবাহ উপত্যকা ধস। যদি হিমবাহ ভেঙে নেমে আসে বা তার বরফ গলতে থাকে তাহলে হিমবাহবাহিত পলি বেরিয়ে আসতে পারে। বেরিয়ে আসা সেই পলি প্রথমে হিমবাহজাত পাথর তৈরি করে। যদি সেগুলো স্থিতি কোণের (অর্থাৎ প্রাকৃতিক ঢালের উপর খাড়া হয়ে স্থির থাকতে পারে, সেই সর্বোচ্চ কোণ হল স্থিতি কোণ বা angle of repose বলে) সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে এই ধরনের ধস নামতে পারে।
এগুলির থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল হিমবাহ ধস, যাতে পুরো হিমবাহটাই ভেঙে নেমে আসে। যদি তুষাররেখা ক্রমশ উপরের দিকে সরতে থাকে, হৈমবাহিক পরিবেশ ধীরে ধীরে হিমবাহপ্রবাহ পরিবেশে (glaciofluvial) পরিণত হয়। সেখানে হিমবাহের নিচের দিকটি গলে যেতে থাকে এবং ঘর্ষণ কমে যায়। একটা সময় আসে যখন আশেপাশের এবং উপরের সমস্ত ধরনের পলি মিলেমিশে তৈরি হয় এক দ্রুতগতির ভরপ্রবাহ বা mass flow। অনেক সময়ে ভূমিঢালে ধস নামলেও তা থেকে দ্রুতগতির ভরপ্রবাহ তৈরি হতে পারে। পাহাড়ি উপত্যকায় নদী থাকাই স্বাভাবিক, সেই নদীর স্রোতের সঙ্গে পলিপ্রবাহের মিশ্রন ভরপ্রবাহ তৈরি করতে পারে। সেটাও কখনো কখনো হড়পা বানের আকার নিতে পারে। অনেকসময় দেখা যায়, বড় কোনো ভূমিধস হচ্ছে। সেই ভূমিধস কোনো নদী উপত্যকায় গিয়ে পড়লে, সেটা আরও গতি পেয়ে নদী বরাবর বয়ে যাবে।
এছাড়া আমরাও তো কিছুটা হলেও দায়ী। তার মধ্যে একটি হল অস্থায়ী পুকুর খনন। যদিও প্রাকৃতিক কারণেও নদীর ধারে জল-পলি জমে গিয়ে অস্থায়ী পুকুর তৈরি হয়ে যেতে পারে। আবার যখন রাস্তা সম্প্রসারণ হয়, পাহাড়ের দেওয়াল কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি হয় বা ভূমিধস হয়ে যাওয়ার পর আবার রাস্তা বানানো হয়, তখনও তো অতিরিক্ত পলি জমে। সেই পলিকে বাইরে ফেলা হয় না, স্থায়ী কোনো জায়গাও নেই ফেলার। ফলে সেখানেও এই অতিরিক্ত পলি বা বিপুল ভরের পদার্থ এক জায়গায় জড়ো হওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। মাথায় রাখা হয়না ভবিষ্যতে এমন ঘটনা অর্থাৎ দ্রুতগতির ভরপ্রবাহকে ত্বরান্বিত করতে পারে। অতিরিক্ত পলি জমা হয় নতুন নতুন প্রকল্পের কারণে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য যেখানে বাঁধ তৈরি হচ্ছে, সেই বাঁধের পিছনে অনেকদিন ধরে জল জমে থাকার ফলে পলি জমে। পাহাড়ি উপত্যকায় সেতু তৈরির সময়ে যখন উপত্যকার দুদিকের দেওয়াল কেটে তাকে স্থিতিশীল করতে হয়, তখনও ওখানকার পলি এই ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ে। এই ধরনের প্রকল্পে যখন ডিনামাইট বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তাতে পাথর দুর্বল হয়ে যায়। ভঙ্গুর প্রকৃতির পাথরের ক্ষেত্রে তা টাইম বোমার সমান বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আসলে প্রকৃতিকে আমরা ক্রমান্বয়ে বিরক্ত করে চলেছি। দুর্গম জায়গায় যাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় সেখাঙ্কার রাস্তা চওড়া করতে হচ্ছে; হোটেল, আরও বেশি বেশি হোটেল, রিসর্ট বানাতে হচ্ছে। এসবই প্রকৃতিকে বিরক্ত করা এবং তার অবধারিত ফল অবাধ ধ্বংসলীলা।