| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : লিখেছেন শিবনাথ শাস্ত্রী

Reporter
শিবনাথ শাস্ত্রী / ৯১২ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই, ২০২১

বিদ্যাসাগর-যুগ

এক্ষণে আমরা বঙ্গসমাজের ইতিবৃত্তের যে যুগে প্রবেশ করিতেছি, তাহার প্রধান পুরুষ পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এককালে রামমোহন রায় যেমন শিক্ষিত ও অগ্রসর ব্যক্তিগণের অগ্রণী ও আদর্শপুরুষরূপে দণ্ডায়মান ছিলেন এবং তাঁহার পদভরে বঙ্গসমাজ কাঁপিয়া গিয়াছিল, এই যুগে বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই স্থান অধিকার করিরাছিলেন। মানব-চরিত্রের প্রভাব যে কি জিনিস, উগ্র-উৎকট-ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তেজীয়ান পুরুষগণ ধনবলে হীন হইয়াও যে সমাজমধ্যে কিরূপ প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে পারেন, তাহা আমরা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে দেখিয়া জানিয়াছি। সেই দরিদ্র ব্রাহ্মণের সস্তান, যাঁহার পিতার দশ বার টাকার অধিক আয় ছিল না, যিনি বাল্যকালে অধিকাংশ সময় অৰ্দ্ধাশনে থাকিতেন, তিনি এক সময় নিজ তেজে সমগ্র বঙ্গসমাজকে কিরূপ কাঁপাইয়া গিয়াছেন তাহা স্মরণ করিলে মন বিস্মিত ও স্তব্ধ হয়। তিনি এক সময়ে আমাকে বলিয়াছিলেন—“ভারতবর্ষে এমন রাজা নাই যাহার নাকে এই চটিজুতাশুদ্ধ পায়ে টক্‌ করিয়া লাথি না মারিতে পারি।” আমি তখন অনুভব করিয়াছিলাম, এবং এখনও অনুভব করিতেছি যে তিনি যাহা বলিয়াছিলেন তাহা সত্য। তাঁহার চরিত্রের তেজ এমনি ছিল যে, তাঁহার নিকট ক্ষমতাশালী রাজারাও নগণ্য ব্যক্তির মধ্যে। সেই চরিত্রবীর পুরুষের সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত দিয়া এই পরিচ্ছেদ আরম্ভ করিতেছি, কারণ একদিকে লাহিড়ী মহাশয়ের সহিত অকপট মিত্রতা সূত্রে তিনি বদ্ধ ছিলেন, অপর দিকে বঙ্গদেশের আভ্যন্তরীণ ইতিবৃত্ত গঠন বিষয়ে তিনি এই যুগের সর্বপ্রধান পুরুষ ছিলেন।

বিদ্যাসাগর মহাশয় ১৮২০ সালে, মেদিনীপুর জেলার অন্তঃপাতী বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। যে ব্রাহ্মণকুলে তিনি জন্মিলেন, তাঁহারা গুণগৌরবে ও তেজস্বিতার জন্য সে প্রদেশে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁহার পিতামহ রামজয় তর্ক্কভূষণ কোনও পারিবারিক বিবাদে উত্যক্ত হইয়া স্বীয় পত্নী দুর্গাদেবীকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক কিছুকালের জন্য দেশান্তরী হইয়া গিয়াছিলেন। দুর্গাদেবী নিরাশ্রয় হইয়া বীরসিংহ গ্রামে স্বীয় পিতা উমাপতি তর্ক্কসিদ্ধান্ত মহাশয়ের ভবনে আশ্রয় গ্রহণ করেন। জ্যেষ্ঠপুত্র ঠাকুরদাস সেই সময় হইতে ঘোর দারিদ্র্যে বাস করিয়া জীবন-সংগ্রাম আরম্ভ করেন। তাঁহার বয়ঃক্রম যখন ১৫ বৎসর হইবে তখন জননীর দুঃখনিবারণার্থ অর্থোপার্জ্জনের উদ্দেশে কলিকাতাতে আগমন করেন। এই অবস্থাতে তাঁহাকে দারিদ্র্যের সহিত যে ঘোর সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল, তাঁহার হৃদয়বিদারক বিবরণ এখানে দেওয়া নিম্প্রয়োজন। এই বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে অনেক দিনের পর, অনেক ক্লেশ ভূগিয়া, অবশেষে একটা ৮ টাকা বেতনের কৰ্ম্ম পাইয়াছিলেন। এই অবস্থাতে গোঘাটনিবাসী রামকান্ত তর্ক্কবাগীশের দ্বিতীয়া কন্যা ভগবর্তী দেবীর সহিত ঠাকুরদাসের বিবাহ হয়, ঈশ্বরচন্দ্র ইহাদের প্রথম সন্তান।

বিদ্যাসাগর মহাশয় শৈশবে কিয়ৎকাল গ্রাম্যপাঠশালাতে পড়িয়া পিতার সহিত কলিকাতাতে আসেন। কলিকাতাতে আসিয়া তাঁহার পিতার মনিব পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর। বড়বাজারের ভাগবতচরণ সিংহের ভবনে পিতার সহিত বাস করিতে আরম্ভ করেন। পিতাপুত্রে রন্ধন করিয়া খাইতেন। অতি কষ্টে দিন যাইত। এই সময়ে ভাগবতচরণ সিংহের কনিষ্ঠা কন্যা রাইমণি তাঁহাকে পুত্রাধিক যত্ন করিতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কোমল হৃদয় কোনও দিন সে উপকার বিস্মৃত হয় নাই। বৃদ্ধবয়সেও রাইমণির কথা বলিতে দর দর বারে তাঁহার চক্ষে জলধারা বহিত।

কলিকাতাতে আসিয়া কয়েক মাস পাঠশালে পড়িবার পর, বিদ্যাসাগর মহাশয়েয় পিতা তাহাকে কলিকাতা সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করিয়া দেন। কালেজে পদার্পণ করিবামাত্র তাঁহার অসাধারণ প্রতিভা শিক্ষক ও ছাত্র সকলের গোচর হইল। ১৮২৯ সালের জুন মাসে তিনি ভৰ্ত্তি হইলেন, ছয় মাসের মধ্যেই মাসিক ৫৲ টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হইলেন। সেই বৃত্তি সহায় করিয়া তিনি অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। ক্রমে কালেজের সমুদয় উচ্চবৃত্তি ও পুরস্কার লাভ করিলেন। সে সময়ে মফস্বলের ইংরাজ জজদিগের আদালতে এক একজন জজ-পণ্ডিত থাকিতেন। হিন্দু ধৰ্ম্মশাস্ত্র অনুসারে ব্যবস্থা দেওয়া তাহাদের কার্য্য ছিল। সংস্কৃত কালেজের উত্তীর্ণ ছাত্রগণ ঐ কাজ প্রাপ্ত হইতেন। তাহা একটা প্রলোভনের বিষয় ছিল। কিন্তু উক্ত কৰ্ম্মপ্রার্থীদিগকে ল কমিটী নামক একটী কমিটীর নিকট পরীক্ষা দিয়া কৰ্ম্ম লইতে হইত। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বয়ঃক্রম যখন ১৭ বৎসরের অধিক হইবে না, তখন ল কমিটীর পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হইয়া ত্রিপুরার জজ-পণ্ডিতের কৰ্ম্ম প্রাপ্ত হন; কিন্তু পিতা ঠাকুরদাস এত দূরে যাইতে দিলেন না।

১৮৪১ সালে তিনি কালেজ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া বিদ্যাসাগর উপাধি পাইয়া ফোর্ট উইলিয়াম কালেজের প্রধান পণ্ডিতের পদ প্রাপ্ত হন। এই পদ প্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি বাড়ীতে বসিয়া ইংরাজী শিখিতে আরম্ভ করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে সকলে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত বলিয়াই জানেন, কিন্তু তিনি ইংরাজীতে কিরূপ অভিজ্ঞ ছিলেন, কি সুন্দর ইংরাজী লিখিতে পারিতেন, তাহা অনেকে জানেন না; এমন কি তাঁহার হাতের ইংরাজী লেখাটীও এমন সুন্দর ছিল যে, অনেক উন্নত উপাধিধারী ইংরাজীওয়ালাদের হাতের লেখাও তেমন সুন্দর নয়। এ সমুদয় তিনি নিজ চেষ্টা যত্নে করিয়াছিলেন। তাঁহার আত্মোন্নতি সাধনের ইচ্ছা এরূপ প্রবল ছিল যে তাঁহার সংস্পর্শে আসিয়া তাঁহার বন্ধুবান্ধব সকলেরই মনে ঐ ইচ্ছা সংক্রান্ত হইয়াছিল। তাহার দৃষ্টান্ত স্বরূপ দুইটী বিষয়ের উল্লেখ করা যাইতে পারে। বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন ফোর্ট উইলিয়াম কালেজে প্রতিষ্ঠিত, তখন তথাকার কেরাণীর কৰ্ম্মট খালি হইলে, তাঁহারই চেষ্টাতে তাঁহার তদানীন্তন বন্ধু বাবু দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সে কৰ্ম্মটী প্রাপ্ত হন। দুর্গাচরণ বাবু ঐ পদ প্রাপ্ত হইলেই বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহাকে ঐ কৰ্ম্মে থাকিয়া, মেডিকেল কালেজে ভৰ্ত্তি হইয়া চিকিৎসা বিদ্যা অধ্যয়ন করিতে প্রবৃত্ত করেন। তাহাই দুর্গাচরণ বাবুর সকল ভাবী উন্নতি ও প্রতিষ্ঠার কারণ। ইনি সুপ্রসিদ্ধ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যেপাধ্যায়ের পিতা। এই সময়ে আর এক বন্ধুর দ্বারা অার এক কার্য্যের সূত্রপাত হয়। প্রেসিডেন্সি কালেজের ভূতপূৰ্ব্ব সংস্কৃতাধ্যাপক রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় অবসরকালে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট সংস্কৃত পড়িতে আরম্ভ করেন। তাঁহাকে সংস্কৃত শিখাইতে প্রবৃত্ত হইয়াই বিদ্যাসাগর মহাশয় অনুভব করিলেন যে, তাঁহারা নিজে যে প্রণালীতে সংস্কৃত শিখিয়াছিলেন সে প্রণালীতে ইঁহাকে শিখাইলে চলিবে না, অনর্থক অনেক সময় যাইবে। সুতরাং নিজে চিন্তা করিয়া এক নূতন প্রণালীতে তাঁহাকে সংস্কৃত পড়াইতে আরম্ভ করিলেন। ইহা হইতেই তাঁহার উত্তর কালে রচিত উপক্রমণিকা ও ব্যাকরণ-কৌমুদী প্রভৃতির সূত্রপাত হইল।

১৮৪৬ সালে সংস্কৃত কালেজের এসিষ্টাণ্ট সেক্রেটারির পদ শূন্য হইলে বিদ্যাসাগর মহাশয় ঐ পদ পাইলেন। কিন্তু উক্ত কালেজের অধ্যক্ষ রসময় দত্ত মহাশয়ের সহিত মতভেদ হওয়াতে দুই এক বৎসরের মধ্যে ঐ পদ পরিত্যাগ করিতে হইল। ১৮৫০ সালের প্রারম্ভে দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় ফোর্ট উইলিয়াম কালেজের কেরাণীগিরি কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া চিকিৎসা ব্যবসায় আরম্ভ করাতে, মার্শেল সাহেবের অনুরোধে, মাসিক ৮০ টাকা বেতনে, বিদ্যাসাগর মহাশয় ঐ কৰ্ম্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু সে পদে তাঁহাকে অধিক দিন থাকিতে হয় নাই। ঐ সালেই তাঁহার বন্ধু মদনমোহন তর্ক্কালঙ্কার মুর্শিদাবাদের জজ-পণ্ডিতের কৰ্ম্ম পাইয়া চলিয়া যাওয়াতে সংস্কৃত কালেজের সাহিত্যাধ্যাপকের পদ শূন্য হইল। বিদ্যাসাগর মহাশয় এডুকেশন কাউন্সিলের সভাপতি মহাত্মা বেথুনের পরামর্শে ঐ পদ গ্রহণ করিলেন। সেই পদ হইতে ১৮৫১ সালের জানুয়ারি মাসে সংস্কৃত কালেজের অধ্যক্ষের পদ প্রাপ্ত হন। অধ্যক্ষের পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াই তিনি নানা প্রকার সংস্কার কার্য্যে হস্তার্পণ করেন। প্রথম, প্রাচীন সংস্কৃত পুস্তকগুলির রক্ষণ ও মুদ্রণ; (২য়) ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ব্যতীত অন্য জাতির ছাত্ৰগণের জন্য কালেজের দ্বারা উদ্ঘাটন; (৩য়) ছাত্রদিগের বেতন গ্রহণের রীতি প্রবর্ত্তন, (৪র্থ) উপক্রমণিকা, ঋজুপাঠ প্রভৃতি সংস্কৃত শিক্ষার উপযোগী গ্রন্থাদি প্রণয়ন, (৫ম) ২ মাস গ্রীষ্মাবকাশ প্রথা প্রবর্ত্তন (৬ষ্ঠ) সংস্কৃতের সহিত ইংরাজী শিক্ষা প্রচলন। সংস্কৃত কালেজের শিক্ষা প্রণালীর মধ্যে এই সকল পরিবর্ত্তন সংঘটন করিতে বিদ্যাসাগর মহাশয়কে যে কত চিন্তা ও কত শ্রম করিতে হইয়াছিল তাহা আমরা এখন কল্পনা করিতে পারি না। সে কালের লোকের মুখে তাঁহার শ্রমের কথা যাহা শুনিয়াছি, তাহা শুনিলে আশ্চর্যাম্বিত হইতে হয়।”

ইহার পর দিন দিন তাঁহার পদবৃদ্ধি ও খ্যাতি প্রতিপত্তি বাড়িতে লাগিল। পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি ১৮৪৭ সালে তাঁহার “বেতাল পঞ্চবিংশতি” মুদ্রিত ও প্রচারিত হয়। “বেতাল” বঙ্গসাহিত্যে এক নবযুগের সূত্রপাত করিল। তৎপরে ১৮৪৮ সালে “বাঙ্গালার ইতিহাস” ১৮৫০ সালে “জীবনচরিত” ১৮৫১ সালে “বোধোদয়” ও “উপক্রমণিকা,” ১৮৫৫ সালে “শকুন্তলা” ও “বিধবাবিবাহ বিষয়ক প্রস্তাব” প্রকাশিত হইল। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নাম আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলের নিকট পরিচিত হইল।

শিক্ষাবিভাগে ইনস্পেক্টারের পদ সৃষ্ট হইলে বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কৃত কালেজের অধ্যক্ষের পদের উপরে, নদীয়া, হুগলি, বর্দ্ধমান ও মেদিনীপুরের ইনস্পেক্টারের পদ প্রাপ্ত হন। এক দিকে যখন তাঁহার পদ ও শ্রম বাড়িল, তখন অপর দিকে তিনি এক মহাব্ৰতে আত্মসমর্পণ করিলেন। সেই সালেই বিধবা-বিবাহ হিন্দুশাস্ত্রানুমোদিত ইহা প্রমাণ করিবার জন্য গ্রন্থ প্রচার করিলেন। বঙ্গদেশে আগুন জলিয়া উঠিল। কিন্তু সমাজসংস্কারে এই তাঁহার প্রথম হস্তক্ষেপ নয়। ১৮৪৯ সালে মে মাসে বেথুন সাহেৱ যখন বালিকাবিদ্যালয় স্থাপন করেন, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহার প্রথম সম্পাদক নিযুক্ত হন। তিনি ও তাঁহার বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কার বেথুনের পৃষ্ঠপোষক হইয়া দেশে স্ত্রীশিক্ষা প্রচলন কাৰ্য্যে আপনাদের দেহ মন প্রাণ সমর্পণ করেন।

১৮৫৬ সাল বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাল। এই বৎসরে তাঁহার কার্য্যপটুতা যে কত তাহা জানিতে পারা গেল। এক দিকে বিধবাবিবাহের প্রতিপক্ষগণের আপত্তিখগুনার্থ পুস্তক প্রণয়ন, বিধবাবিবাহ প্রচলনার্থ রাজবিধি প্রণয়ণের চেষ্টা, কার্যতঃ বিধবাবিবাহ দিবার আয়োজন, এই সকলে তাঁহাকে ব্যাপৃত হইতে হইল; অপরদিকে এই সময়েই শিক্ষাবিভাগের নব-নিযুক্ত ডিরেক্টার মিষ্টার গর্ডন ইয়ংএর সহিত তাঁহার ঘোরতর বিবাদ বাঁধিয়া গেল। এই বিবাদ প্রথমে জেলায় জেলায় বালিকাবিদ্যালয় স্থাপন লইয়া ঘটে। বিদ্যাসাগর মহাশয় নদীয়া, হুগলী, বৰ্দ্ধমান ও মেদিনীপুর এই কয় জেলার স্কুল ইনস্পেক্টরের পদ প্রাপ্ত হইলেই নানা স্থানে বালকদিগের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে বালিকাবিদ্যালয় স্থাপনে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি মনে করিলেন এদেশে স্ত্রীশিক্ষা প্রচলনের জন্য তাঁহার যে আস্তরিক ইচ্ছা ছিল, তাহা কিয়ৎপরিমাণে কার্য্যে পরিণত করিবার সময় ও সুবিধা উপস্থিত। তিনি উৎসাহেব সহিত তাঁহার সংকল্প সাধনে অগ্রসর হইলেন। কিন্তু ইয়ং সাহেব, বালিকাবিদ্যালয় স্থাপনের জন্য গবৰ্ণমেণ্টের অর্থ ব্যয় করিতে অস্বীকৃত হইয়া, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রেরিত বিল স্বাক্ষর করিলেন না। এই সংকটে বিদ্যাসাগর মহাশয় লেপ্টনাণ্ট গভর্ণরের শরণাপন্ন হইলেন। সে যাত্রা তাঁহার মুখ রক্ষ হইল বটে, কিন্তু ডিরেক্টার তাঁহার প্রতি হাড়ে চটিয়া রহিলেন। কথায় কথায় মতভেদ ও বিবাদ হইতে লাগিল। এই বিবাদ ও উত্তেজনাতে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের চিত্ত এই বৎসরের অধিকাংশ সময় অতিশয় আন্দোলিত ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষের বিবিধ চেষ্টাসত্ত্বেও এই বিবাদের মীমাংসা না হওয়ায় অবশেষে ১৮৫৮ সালে তাঁহাকে কৰ্ম্ম পরিত্যাগ করিতে হয়।

এদিকে ১৮৫৬ সালের অগ্রহায়ণ মাসে তাঁহার অন্যতম বন্ধু শ্ৰীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন মহাশয় এক বিধবার পাণিগ্রহণ করিলেন। তাহাতে বঙ্গদেশে যে আন্দোলন উঠিল, তাহার অনুরূপ জাতীয় উত্তেজনা আমরা অল্পই দেখিয়াছি। ইতিপূৰ্ব্বে শাস্ত্রানুসারে বিধবাবিবাহের বৈধতা লইয়া যে বিচার চলিতেছিল তাহা পণ্ডিত ও শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের মধ্যেই বদ্ধ ছিল। রাজবিধিপ্রণয়নের চেষ্টা আরম্ভ হইলে, সেই আন্দোলন কিঞ্চিৎ পাকিয়া উঠিয়াছিল; কিন্তু বিদ্যাসাগর মহাশয় শাস্ত্রীয় বিচারে সন্তুষ্ট না থাকিয়া যখন কার্যতঃ বিধবাবিবাহ প্রচলনে প্রবৃত্ত হইলেন, তখন আপামর সাধারণ সকল লোকে একেবারে জাগিয়া উঠিল। পথে, ঘাটে, হাটে বাজারে, মহিলাগোষ্ঠীতে এই কথা চলিল। শান্তিপুরের তাঁতীরা “বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে” —এই গানাঙ্কিত কাপড় বাহির করিল। এমন কি বিদ্যাসাগরের প্রাণের উপরেও লোকে হাত দিবে এরূপ আশঙ্কা বন্ধুবান্ধবের মনে উপস্থিত হইল।

এই সকল অবিশ্রান্ত পরিশ্রম ও সংগ্রামের মধ্যে যে কতিপয় বন্ধু বিদ্যাসাগর মহাশয়কে উৎসাহ ও হৃদয়ের অনুরাগ দানে সবল করিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে লাহিড়ী মহাশয় একজন। তিনি ১৮৫৭ সালে উত্তরপাড়া স্কুল হইতে বদলী হইয়া বারাসত স্কুলে গমন করেন। সেখানে প্রায় দেড় বৎসরকাল প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। বারাসত কলিকাতা হইতে বেশী দূরে নয়; সুতরাং লাহিড়ী মহাশয় সেখান হইতে আসিয়া সৰ্ব্বদাই সহরে বন্ধুবান্ধবের সহিত মিলিতেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহাদের মধ্যে একজন প্রধান ব্যক্তি ছিলেন।

লাহিড়ী মহাশয় শিক্ষকতা সূত্রে স্বল্পকালের জন্যও যেখানে বাস করিয়াছেন সেইখানেই তাঁহার স্মৃতি রাথিয়া আসিয়াছেন। সে সময়ে বারাসত স্কুলে যাঁহার তাঁহার নিকটে পাঠ করিয়াছেন, তাঁহারা এখনও ভক্তিতে গদ গদ হইয়া তাঁহার দৈনিক জীবনের বর্ণনা করিয়া থাকেন। তাঁহার চরিত্রে তাহারা কর্তব্যপরায়ণতার আদর্শ দেখিয়াছিলেন। শিক্ষকতা কার্য্যে এরূপ দেহ মন প্রাণ ঢালিয়া দেওয়া কেহ কখনও দেখে নাই; ঘড়ির কাঁটাটীর ন্যায় যথাসময়ে তাঁহাকে নিজ কৰ্ম্মস্থানে দেখা যাইত; তৎপরে যে সময়ের যে কাজটী, তাহার প্রতি মুহুর্তকালের অমনোযোগ হইত না। ছাত্ৰগণের হৃদয়ে জ্ঞানষ্পৃহা উদ্দীপ্ত করিবার জন্য, তাহাদের চরিত্র ও নীতি উন্নত করিবার জন্য, এবং সকল সাধু বিষয়ে তাঁহাদের উৎসাহ ও অনুরাগ বৰ্দ্ধিত করিবার জন্য, তাহার অবিশ্রান্ত মনোযোগ দৃষ্ট হইত। যেমন তিনি একদিকে ছাত্রগণের মানসিক উন্নতির প্রতি দৃষ্টি রাখিতেন, তেমনি অপরদিকে নিজে মানসিক উন্নতির প্রতি যত্নবান ছিলেন। অবসরকালে দেখা যাইত হয় তিনি বাগানে বৃক্ষগণের পরিচর্য্যাতে নিযুক্ত, না হয় পাঠে গভীররূপে নিমগ্ন। এই সময়ে উদ্ভিদ-বিদ্যা ও উদ্যান-রচনার প্রতি তাঁহার বিশেষ মনোযোগ দৃষ্ট হইয়াছিল। তিনি কতিপয় ছাত্রের সহিত স্কুলগৃহের নিকটস্থ ভূমিখণ্ডও তাগ করিয়া লইয়াছিলেন। নিজে কিয়ৎ পরিমাণ ভূমি লইয়া ছাত্রদিগের এক জনকে এক একখণ্ড ভূমি দিয়াছিলেন। নিজে আপনার নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ডে পরিশ্রম করিয়া তাঁহাদিগকে শ্রমশীলতার দৃষ্টান্ত দেখাইতেন।

লাহিড়ী মহাশয় যখন বারাসতে প্রতিষ্ঠিত তখন ১৮৫৭ সালের মিউটনীর হাঙ্গামা উপস্থিত হয়। ১৮৫৭ সালের প্রারম্ভে গভর্ণমেণ্ট স্থির করেন যে সৈন্যবিভাগে এক প্রকার নুতন বন্দুক প্রচলিত করিবেন। ঐ বন্দুকের গুলিপূর্ণ টােটার উপরকার কাগজ দাঁত দিয়া কাটিয়া বন্দুকে পূরিতে হইত। সেই সকল টোটা দমদমের কারখানাতে প্রস্তুত হইতে লাগিল। দমদম হইতে এই কথা উঠিল যে দুই প্রকার টোটা প্রস্তুত হইতেছে; এক প্রকার টােটার উপরকার কাগজ গো-বসার দ্বারা, অপর প্রকার টােটার কাগজ শূকর-বসার দ্বারা লিপ্ত করিয়া প্রস্তুত করা হইতেছে; গো-বসা-লিপ্ত টোটা হিন্দুদিগকে ও শূকর বসা-নিৰ্ম্মিত টোটা মুসলমানদিগকে দেওয়া হইবে। প্রজাগণকে স্বধৰ্ম্মচ্যুত করা ইংরাজদিগের উদ্দেশ্য। এই জনরবের কিছুমাত্র মূল ছিল না; এবং নুতন টোটা তখনও বাহির হয় নাই। অথচ এই জনরবে সিপাহীদিগের মন বড়ই উত্তেজিত হইয়া উঠিল। সিপাহীদিগের মধ্যে অযোধ্যা প্রদেশের অধিবাসী অনেক ছিল। তাহাদের মন লক্ষ্ণৌএর নবাবের পদচ্যুতি নিবন্ধন অগ্রেই উত্তেজিত ছিল। লর্ড ডালহউসি যে ভাবে অযোধ্য রাজ্য ব্রিটিশ রাজ্যভুক্ত করিয়াছিলেন, তাহাকে তৎপ্রদেশীয় প্রজাকুল জবরদস্তী ও বিশ্বাসঘাতকতা বলিয়া অনুভব করিয়াছিল। অযোধ্যা প্রদেশবাসী সৈন্যদলের মনে সেই অসন্তোষ প্রধুমিত বহ্নির ন্যায় রহিয়াছিল। তাহার উপরে টোটা কাঁটার জনরব বাতাসের ন্যায় আসিল। ১৮৫৭ ফেব্রুয়ারি মাসে বারাকপুরে সিপাহীদিগের মধ্যে গভীর অসন্তোষের লক্ষণ সকল প্রকাশ পায়; কিন্তু সে অসন্তোষের গভীরতা কত কর্তৃপক্ষ তখন তাহা ধরিতে পারিলেন না।

কিছুদিন পরে বারাকপুর হইতে একদল সৈন্য কোনও বিশেষ কারণে বহরমপুরে প্রেরিত হয়। তখন বহরমপুরে একদল সিপাহী সৈন্য ছিল। বারাকপুর হইতে নবাগত সিপাহীগণ তাহাদের কাণে কাণে নুতন টোটার কি বিবরণ বলিল তাহাতে সিপাহীরা একেবারে উত্তেজিত হইয়া উঠিল। সেখানে একদিন ইংরাজ-সৈন্যাধ্যক্ষদিগের সহিত সিপাহীদিগের মারামারি হইল। এই সংবাদ কলিকাতার পৌছিলে লর্ড ক্যানিং ঐ সকল সিপাহীকে বারাকপুরে আনিয়া সকলের সমক্ষে তাহাদিগকে কৰ্ম্মচ্যুত করিতে আদেশ করিলেন। তদনুসারে তাহাদিগকে বারাকপুরে আনিয়া সমুদা সিপাহী সৈন্যদলের সমক্ষে তাহদের অস্ত্ৰ শস্ত্র কাড়িয়া লইয়া তাহাদিগকে সৈন্যদল হইতে বিদায় দেওয়া হইল। অন্য সময় হইলে এই শাস্তি দ্বারা অনিষ্টকর ফল না ফলিয়া ইষ্ট ফলই হইত। কিন্তু উপস্থিত ক্ষেত্রে তাহার বিপরীত ঘটিল। কৰ্ম্মচ্যুত সিপাহীদিগের মধ্যে অনেকে অযোধ্য প্রভৃতি প্রদেশের লোক ছিল। তাহারা কৰ্ম্মচ্যুত হইয়া স্বীয় স্বীয় দেশে ফিরিবার সময় নুতন টোটার কথা লইয়া গেল। বিশেষতঃ তৎতৎস্থানের সিপাহীদিগের কর্ণে সেই কথা তুলিল; এবং কিরূপে তাহারা স্বধৰ্ম্ম রক্ষার্থ অস্ত্ৰধারণ করিয়াছিল এবং সেজন্য নিগৃহীত হইয়াছে তাহাও গৌরব ও স্পৰ্দ্ধার সহিত প্রচার করিয়া দিল। চারিদিকে প্রধূমিত অগ্নির ন্যায় অসন্তোষ ব্যাপ্ত হইতে লাগিল।

অবশেষে সেই প্রধূমিত অসন্তোষ ১০ই মে দিবসে মিরাট নগরে বিদ্রোহাগ্নির আকারে প্রজলিত হইয়া উঠিল। সেখানে ৬ই মে দিবসে ৮৫ জন দেশীয় সৈনিক কাওয়াজের সময় টোটা লইতে অস্বীকৃত হওয়াতে তাহাদিগকে কোর্টমার্শালের বিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ইহাতে অপরাপর সিপাহিগণ তাহাদিগকে ধৰ্ম্মের জন্য নিপীড়িত বলিয়া, সদলে বিদ্রোহী হইয়া, ১০ই মে দিবসে জেলের কয়েদিদিগকে ছাড়িয়া দেয়; রাজকোষ লুণ্ঠন করে; অস্ত্রাগার হস্তগত করে; অনেক ইংরাজকে হত্যা করে; এবং অবশেষে দিল্লীয় নাম-মাত্র সম্রাট বৃদ্ধ বাহাদুর সাকে পুনরায় রাজসিংহাসনে বসাইয়া স্বাধীনতার পতাকা উড়াইবার মানসে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করে। তাহারা ১১ই মে দিল্লী অধিকার করে। এই সংবাদ দেশে প্রচার হইলে যে, যে স্থানে দেশীয় সিপাহী সৈন্য ছিল, সৰ্ব্বত্রই বিশেষ উত্তেজনা দৃষ্ট হইতে লাগিল। রাজপুরুষগণ সতর্ক হইয়া বিবিধ উপায় অবলম্বন করিতে লাগিলেন; ভয় ও মৈত্রী প্রভৃতির দ্বারা যতদূর হয় কিছুই করিতে অবশিষ্ট রাখিলেন না। কিন্তু সকল চেষ্টাই বিফল হইল। যেমন গ্রীষ্মের দিনে ঘরে আগুন লাগিলে দেখিতে দেখিতে এক ঘর হইতে অপর এক ঘরে লাগিয়া যায়, সেই প্রকার দেখিতে দেখিতে বিদ্রোহাগ্নি চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল।

এই সুযোগ পাইয়া যাহাদের কোন না কোনও কারণে পূৰ্ব্বাবধি ব্রিটিশ গবর্ণমেণ্টের প্রতি বিদ্বেষ-বুদ্ধি ছিল, এমন কতকগুলি লোক এই বিদ্রোহব্যাপারের সারথ্য কার্য্যে অবতীর্ণ হইলেন। তন্মধ্যে ফৈজাবাদের মৌলবী, বিস্তুরের নানা সাহেব, ঝান্সীর রাণী ও নুন্সির সেনাপতি তাঁতিয়া টােপী সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। ফৈজাবাদের মৌলবী একজন মুসলমান ধৰ্ম্মাচাৰ্য্য, লক্ষ্নৌএর নবাবকে পদচ্যুত করাতে তিনি ইংরাজদেগের প্রতি জাতক্রোধ হইয়াছিলেন। নবাবের পরিবারস্থ ব্যক্তিদিগের সহিত তাঁহার আলাপ ও আত্মীয়তা ছিল। তাহাদের অবনতিকে তিনি নিজধর্মের অধঃকরণ বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। তিনি এই সময়ে বিদ্রোহীদলের একজন প্রধান উৎসাহ-দাতা হইয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহার দৃষ্টান্তে অযোধ্যার সহস্ৰ সহস্র ব্যক্তি বিদ্রোহে যোগ দিয়াছিল। তিনি নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়া যুদ্ধ করিতেও কুষ্ঠিত হন নাই।

নানাসাহেব মহারাষ্ট্রীয় প্রসিদ্ধ বাজীরাওর পোষ্যপুত্র। তিনি পেনসন প্রাপ্ত হইয়া একপ্রকার বন্দীদশাতে কানপুরের সন্নিকটবৰ্ত্তী বিঠুর নামক স্থানে বাস করিতেছিলেন। ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট তাঁহার কোন কোন ও প্রার্থনা অগ্রাহ্য করাতে তিনি ইংরাজদিগের প্রতি চটিয়াছিলেন। তিনিও এই সুযোগ পাইয়া বিদ্রোহের অপর একজন সারথি হইলেন।

ঝঁন্সীর রাণীও ঐ প্রকার কোনও কারণে ইংরাজদিগের প্রতি চটয়াছিলেন। তিনিও এই বিদ্রোহে যোগ দিলেন। তাঁহার স্বাদশহিতৈষণা ও বীরত্ব দেখিয়া ইংরাজগণও মুগ্ধ হইয়া গিয়াছিলেন।

কোন স্থানে কবে বিদ্রোহাগ্নি জ্বলিল তাহার বিশেষ বিবরণ দেওয়া উদ্দেশ্য নহে। এইমাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, বিদ্রোহাগ্নি উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের নানাস্থানে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। এমন কি বক্সর, আরা প্রভৃতির ন্যায় বেহারের অন্তর্গত স্থান সকলেও ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। তন্মধ্যে কানপুরেই লোমহর্ষণ হত্যাকাণ্ড হইয়াছিল। নানাসাহেবের প্ররোচনাতে বিদ্রোহী সিপাহিগণ উৎসাহিত হইয়া সেখানকার ইংরাজগণকে কয়েক দিন একটা বাড়ীতে অবরুদ্ধ করিয়া রাখে; তৎপরে তাহাদিগকে নৌকাযোগে অন্য স্থানে প্রেরণ করিবার আশা ও অভয় দিয়া তাহাদিগকে বাহিরে আনিয়া, নৌকাতে আরোহণ করাইয়া, তাহাদের অধিকাংশকে গুলি করিয়া হত্যা করে। অবশেষে যে সকল ইংরাজ রমণী ও বালক বালিকা থাকে তাহাদিগকে কিছুদিন অবরুদ্ধ রাখা হয়; কিন্তু প্রতিশোধের দিন নিকটে আসিতেছে দেখিয়া তাহাদিগকেও সদলে হত্যা করিয়া একটা কূপের মধ্যে তাহাদের মৃতদেহ নিক্ষেপ করে। এতদ্ব্যতীত ১২৬ জন ইংরাজ যাহাঁদের অধিকাংশ স্ত্রীলোক ও বালকবালিকা ছিল) ফতেগড় হইতে নৌকাযোগে পলাইয়া আসিতেছিল, নানার আদেশে তাহাদিগকে নৌকা হইতে নামাইয়া হত্যা করা হয়। এই নিদারুণ হত্যা বিবরণ নানাসাহেবের নামের উপর অবিনশ্বর কলঙ্কের রেখার ন্যায় চিরদিন বিদ্যমান থাকিবে। কারণ স্ত্রীলোক ও বালক বালিকার হত্যা সকল দেশের সামরিক নীতির বিরুদ্ধ-কাৰ্য্য।  ১৮৫৭ সালের জুলাই মাসে কলিকাতাতে এরূপ জনরব উঠিল যে বিদ্রোহী সিপাহীগণ আসিতেছে, তাহারা কলিকাতা সহরের সমুদয় ইংরাজত্বে হত্যা করিবে এবং কলিকাতা সঙ্কর লুট করিবে। এই জনরবে কলিকাতার অনেক ইংরাজ কেল্লার মধ্যে আশ্রয় লইলেন; দেশীয় বিভাগেও লোকে কি হয় কি হয় বলিয়া ভয়ে ভয়ে দিনযাপন করিতে লাগিল। ইংরাজ ফিরিঙ্গী ও দেশীয় খ্ৰীষ্টানগণ সৰ্ব্বদা অস্ত্ৰ শস্ত্র লইয়া বেড়াইতে লাগিলেন। বন্দুকের দোকানের পসার অসম্ভবরূপ বাড়িয়া গেল। ইংরাজগণ ভয়ে ভীত হইয়া গবর্ণর জেনারেল লর্ড ক্যানিংকে অনেক অদ্ভুত পরামর্শ দিতে লাগিলেন,—কালাদের অস্ত্র শস্ত্র হরণ কর, কঠিন সামরিক আইন জারি কর, ইত্যাদি; ক্যানিং তাহাতে কৰ্ণপাত করিলেন না। এজন্য ইংরাজের তাহার নাম Clemency Canning “দয়াময়ী ক্যানিং” রাখিলেন। আজ শোনা গেল দেশীয় সংবাদ পত্র সকলের স্বাধীনতা হরণ করা হইবে; কালি কথা উঠিল, রাত্রি ৮টার পর যে মাঠের ধারে যায় তাহাকেই গুলি করে; সন্ধ্যার পর বাজার বন্ধ হইত; একটা জিনিসের প্রয়োজন হইলে পাওয়া যাইত না; লোকে নিজ বাসাতে দুই চারিজনে বসিয়া অসংকোচে রাজ্যের অবস্থা ও রাজনীতি সম্বন্ধে নিজ নিজ মত প্রকাশ করিতে সাহস করিত না, মনে হইত প্রাচীরগুলি বুঝি শুনিতেছে! কিছু অধিক রাত্রে গড়ের মাঠের সন্নিকটবৰ্ত্তা রাস্তা দিয়া আসিতে গেলেই পদে পদে অস্ত্রধারী প্রহরী জিজ্ঞাসা করিত, “হুকুমদার” অর্থাৎ (Who comes there?) তাহা হইলেই বলিতে হইত “রাইরত হায়” অর্থাৎ আমি প্রজা, নতুবা ধরিয়া পরীক্ষা করিয়া তবে ছাড়িত। এইরূপে সকল শ্রেণীর মধ্যে একটা ভয় ও আতঙ্ক জন্মিয়া কিছুদিন আমাদিগকে স্থির থাকিতে দেয় নাই।

যাহা হউক ইংরাজগণ সত্ত্বর বিদ্রোহাগ্নি নিৰ্ব্বাপিত করিলেন। দিল্লী ও লক্ষ্মৌ পুনরায় তাহাদের হস্তগত হইল। প্রতিশোধের দিন যখন আসিল তখন তাহারাও নৃশংসতাচরণ করিতে ক্রটী করিবেন না। ইংরাজসৈন্যগণ যতদূর অগ্রসর হইত, তাহাদের গমনপথের উভয় পার্শ্বে দোষী নির্দোষী, হতাহত দেশীয় প্রজার মৃতদেহে আকীর্ণ হইতে লাগিল! এক এলাহাবাদে ৮০০ শত দেশীয় প্রজাকে ফাঁসি দেওয়া হইল!

ক্রমে সমগ্র, দেশে, আবার শাস্তি স্থাপিত হইল। ১৮৫৮ সালে মহারাণী প্রজাদিগকে অভয়দান করিয়া ভারত সাম্রাজ্য নিজে হস্তে লইলেন; ষ্টেট-সেক্রেটারির পদ সৃষ্ট হইল; কলিকাতা সহৱ আলোকমালাতে মণ্ডিত হইল; চারিদিকে আনন্দধ্বনি উঠিল। কিন্তু সিপাহী বিদ্রোহের উত্তেজনার মধ্যে বঙ্গদেশের ও সমাজের এক মহোপকার সাধিত হইল; এক নবশক্তির সূচনা হইল; এক নব আকাঙ্ক্ষা জাতীয় জীবনে জাগিল। সে জন্যই ইহার কিঞ্চিৎ বিস্তৃত বিবরণ দিলাম।

বিদ্রোহজনিত উত্তেজনাকালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ নামক সাপ্তাহিক ইংরাজী কাগজ এক মহোপকার সাধন করিল। পেট্রিয়ট সারগর্ভ সুযুক্তি-পূর্ণ তেজস্বিনী ভাষাতে কর্তৃপক্ষের মনে এই সংস্কার দৃঢ়রূপে মুদ্রিত করিবার প্রয়াস পাইলেন যে, সিপাহী-বিদ্রোহ কেবল কুসংস্কারাপন্ন সিপাহিগণের কার্য্য মাত্র, দেশের প্রজাবর্গের তাহার সহিত যোগ নাই। প্রজাকুল ইংরাজ গবর্ণমেণ্টের প্রতি কৃতজ্ঞ ও অনুরক্ত, এবং তাঁহাদের রাজভক্তি অবিচলিত রহিয়াছে। পেট্রিয়টের চেষ্টাতে লর্ড ক্যানিংএর মনেও এই বিশ্বাস দৃঢ় ছিল; সেজন্য এদেশীয়দিগের প্রতি কঠিন শাসন বিস্তার করিবার জন্য ইংরাজগণ যে কিছু পরামর্শ দিতে লাগিলেন, ক্যানিং তাহার প্রতি কৰ্ণপাত করিলেন না। পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি সেই কারণে তাঁহার স্বদেশীয়গণ তাঁহার Clemency Canning বা ‘দয়াময়ী ক্যানিং” নাম দিল। এমন কি তাহাকে দেশে ফিরাইয়া লইবার জন্য ইংলণ্ডের প্রভূদিগকে অনেকে পরামর্শ দিতে লাগিলেন। পার্লেমেন্টেও সে কথা উঠিয়াছিল; কিন্তু ক্যানিংএর বন্ধুগণ পেট্রিয়টের উক্তি সকল উদ্ধৃত করিয়া দেখাইলেন যে এদেশবাসিগণ ক্যানিংএর প্রতি কিরূপ অনুরক্ত, এবং ব্রিটিশ গবর্ণমেণ্টের প্রতি কিরূপ কৃতজ্ঞ। পেট্রিয়ট এই সময়ে এদেশীয়দিগের অদ্বিতীয় মুখপাত্র হইয়া উঠিল। হরিশ্চন্দ্র একদিকে যেমন গবর্ণমেণ্টের সৰ্ব্বপ্রকার বৈধ শাসনকে সমর্থন করিতেন, তেমনি অপরদিকে ইংরাজগণের সর্বপ্রকার অবৈধ আচরণের প্রতিবাদ করিতেন। সকলে উত্তেজনাতে পড়িয়া স্থিরবুদ্ধি হারাইয়াছিল, কেবল পেট্রিয়ট হারায় নাই; এজন্য রাজপুরুষগণের নিকট ইহার আদর বাড়িয়া গেল। এরূপ শুনিয়াছি পেট্রিয়ট বাহির হইবার দিন লর্ড ক্যানিংএয় ভৃত্য আসিয়া পেট্রিয়ট আফিসে বসিয়া থাকিত, প্রথম কয়েকখানি কাগজ মুদ্রিত হইলেই লইয়া যাইত। হিন্দু পেটিয়টের এই প্রভাব দেখিয়া দেশের শিক্ষিত ব্যক্তিগণ পুলকিত হইয়া উঠিলেন। ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান এসোসিএশনের প্রধান প্রধান ব্যক্তিগণ এবং রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী প্রভৃতি নব্যবঙ্গের নেতৃগণ হরিশের পৃষ্ঠপোষক হইয়া তাহাকে উৎসাহ দিতে লাগিলেন।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev