| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কাকের বাসায় কোকিলের ডিম : শৌনক ঠাকুর

Reporter
শৌনক ঠাকুর / ১০৯২ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৫

“…কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পাড়িয়া যায় …” মাত্র কয়েকটি শব্দে কবিগুরু একটি সমগ্র জাতি ও এক মহামানবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ইঙ্গিত করেছেন। ‘কাকের বাসা’ বলতে যে কুঁড়ে, অলস, আড্ডাবাজ, পরনিন্দা পরচর্চায়ব্যস্ত বাঙালি সমাজকে বোঝানো হয়েছে তা সচেতন পাঠক মাত্রই অনুমেয়। আর ‘কোকিল’ অবশ্যই দুর্বার, অনম্যতা, বলিষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। মিনমিনে বাঙালি ঘরে যা একেবারেই বেমানান।

ব্যক্তিত্বের কথা যখন এল তখন ওটা দিয়েই শুরু করা যাক। ব্যক্তিত্ব বলতে সাধারণভাবে বোঝায় সমাজ ও ব্যক্তির ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ। মনোবিজ্ঞানীরা ব্যক্তিত্বকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছেন। তাদের মতে সমাজের দিক থেকে গতাগতিকতার বাইরে গিয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ বা হাওয়ার বিপরীতে হাঁটতে যারা অপছন্দ করেন তাদের বলে গড় ব্যক্তিত্ব (average personality)। সাধারণত ছাপোষা বাঙালি। কিন্তু বিদ্যাসাগর আমৃত্যু স্রোতের প্রতিকুলে সাঁতার দিয়ে গেছেন। তা সে সমাজপতিদের বিরুদ্ধে গিয়ে বিধবাবিবাহ চালু বা নারীশিক্ষার ব্যবস্থা কিংবা কারসাহেবকে জুতো প্রদর্শন। আ্যাভারেজ টাইপ বাঙালি চরিত্র থেকে একেবারেই আলাদা। কোলকুঁজো বাঙালি ঘরে জন্মগ্রহণ করেও তিনি ছিলেন দৃঢ মেরুদণ্ডধারী।

এই রে আবার সেই মেরুদণ্ড। শব্দটি বর্তমানে বহুলচর্চিত। সঙ্গে কিছুটা বিতর্কিতও বটে। এখন আমরা সেইদিকে যাচ্ছি না। তবে শব্দটির ব্যবহার মূলত ব্যঞ্জনা অর্থে। বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে ওই একই শব্দের প্রয়োগ করেছেন শিবনাথ শাস্ত্রী। তাঁর বক্তব্য — “ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের মেরুদণ্ড কী? সে কি জিনিষ? যাহা হৃদয়ে থাকাতে তিনি সোজা পথে চলিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।” এখানে ‘সোজা পথে’ শব্দদ্বয়টি সদা উন্নত শির, স্পষ্টবক্তা, যুক্তিবাদী বিদ্যাসাগরের দৃঢচেতা মনোভাবের দ্যোতক। যুক্তির আতস কাঁচে তিনি যে কোন বিষয়কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করে তবেই বিশ্বাস করতেন। আর যে কাজটি বিশ্বাস করতেন সেই কাজটি সম্পূর্ণ করার পর ক্ষান্ত হতেন। এই ‘ঘাড়কেঁদো’ বাঙালিবাবুটি কখন আদর্শ বা নীতির সঙ্গে সমঝোতা করেন নি। এ জন্য তাঁকে চাকরি ছাড়তে হয়েছিল বহুবার। সত্যিই ‘এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন…’ বাঙালি সমাজে তাঁর আবির্ভাব, কার্যকলাপ অদ্ভূত। ঐতিহাসিক। সঙ্গে কিছুটা রোমাঞ্চকর।

বিদ্যাসাগরের জন্ম দরিদ্র কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে। সেকালে ব্রাহ্মণদের সিংহভাগের অবস্থা ছিল শোচনীয়। তারা ছিলেন পরাশ্রিত শ্রেণি। পূজা-অর্চনা, যজন-যাজন, গুরুগিরি সনাতন কুলবৃত্তিকে আঁকড়ে পড়েছিলেন। ফলে দারিদ্র্যতা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। তবুও তারা কৌলিন্যের অস্মিতায় অন্ধ ছিলেন। শাস্ত্রীয় বিকৃতি, অযৌক্তিক বিধানে স্বজাতির পাশাপাশি সমাজকেও তারা অবক্ষয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন। রুদ্ধ হয়েছিল অগ্রগতির ও আধুনিকতার পথ। এখানে বিদ্যাসাগরকে দু’রকম পাওয়া যায় — একদিকে তিনি সমাজ সংস্কারক যার চিন্তা চেতনায় রয়েছে সমাজের উন্নতি। অন্যদিকে কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারের প্রতিনিধি। তিনি বুঝেছিলেন এই পরাশ্রিত শ্রেণি দরিদ্র কুলীন ব্রাহ্মণদের সঠিক দিশা না দেখালে তাদের অগ্রগতি অসম্ভব। তাই তাঁর আন্দোলন ছিল সামাজিক স্বার্থে ও কুল স্বার্থে। এখানেই তাঁর চরিত্রের অভিনবত্ব।

এবার আপনাদের রামমোহন রায় বা কৃষ্ণমোহনসহ প্রমুখের নাম মনে হতেই পারে। কারণ তারাও কুলীন পরিবারের সন্তান। ভেবে দেখুন দরিদ্র কুলীন ব্রাহ্মণদের সমস্যা এঁরাও দেখেছেন কিন্তু ভোগ করেন নি। ভোগ করেছেন একমাত্র বিদ্যাসাগর। দেখা আর ভোগের মধ্যে বিস্তর ফারাক। বিদ্যাসাগর পিতামহ রামজয় বা পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কঠোর জীবনযাপন দেখেছেন। এর মধ্যে বড় হয়েছেন। ফলে তার চরিত্রে আদর্শবাদের সঙ্গে বাস্তববাদের এক সমন্বয় ঘটেছিল। এ প্রসঙ্গে বিনয় ঘোষের মন্তব্যটি স্মতব্য — “রামমোহনের মতন প্রধানত ‘idealist’ বা কৃষ্ণমোহনের মতন ‘extremist’ কোনটাই তিনি হতে পারেন নি। তাঁর সমকালীন সমাজকর্মীদের মধ্যে তিনি ছিলেন সত্যকার ‘realist’।”

এই realist বা বাস্তবতা তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিরাজমান। বিদ্যাসাগরের আগে বা পরে অনেকেই সমাজসংস্কারে ব্রতী হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আন্দোলন সভা-সমিতি, পত্র-পত্রিকা, বা আলোচনাচক্রে সীমাবদ্ধ ছিল। সমাজে তাঁর প্রত্যক্ষ প্রয়োগ তারা সেভাবে কেউ করতে পারেন নি। পেরেছিলেন একমাত্র বিদ্যাসাগর। বিধবাবিবাহ চালু করলেন এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিজ পুত্রের সঙ্গে এক বিধবার বিবাহ দিলেন। এই প্রয়োগ কোন সাধারণ ঘটনা নয়। কতটা দৃঢতা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে এই ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব তা অনুমান করায় যায়। গোবর-জলে সিক্ত স্যাঁতস্যাঁতে বাঙালি উঠানে এ হেন মানুষ কল্পনাতীত।

বিদ্যাসাগরের মধ্যে প্রাচীন ঋষিদের মত জ্ঞান, বিদ্যা, পাণ্ডিত্যের সঙ্গে ছিল ইংরেজদের মত কর্মশক্তি, নব উদ্যম, আবিষ্কারের নেশা, নতুন কিছু করার তাগিদ। এসবের পাশাপাশি তাঁর চরিত্রকে স্বাতন্ত্র্য করে তুলেছিল আত্মমর্যাদাবোধ, মানবতাবোধ ( humanism)। তাই শ্রেণিচরিত্র বা সমাজচরিত্র থেকে তিনি একেবারে পৃথক। শ্রেণি বা সমাজ চরিত্র থেকে ব্যক্তি চরিত্রের এই বৈপরীত্য, এই পৃথকীকরণ তাঁকে আলাদা মর্যাদায় নিয়ে গেছে — ‘… deviations from the culture pattern’। আর তাই তিনি গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসমান বাঙালি সংসারে একেবারে ‘misfit’। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর ভাষায় , “এই দেশে এই জাতির মধ্যে সহসা বিদ্যাসাগরের মত একটা কঠোর কঙ্কালবিশিষ্ট মনুষ্যের কিরূপে উৎপত্তি হইল তাহা বিষম সমস্যা হইয়া দাঁড়ায়।”

বিদ্যাসাগরের মনন ছিল কুসুমের মত কোমল, পালকের মত পেলব। অপরের দুঃখ তাঁকে বিচলিত করত। তাই তিনি দয়ারসাগর। তবে দান ও দয়ার ক্ষেত্রে তিনি মানুষকে নিক্তি দিয়ে বিচার করতেন। এই নয় যে তিনি সবাইকে সমানভাবে দান করতেন। যার যতটুকু দরকার ততটুকু দিতেন। কমও নয় বেশিও নয়। যেমন তাঁর উইলে (২৫ নং ধারা) তিনি তাঁর পুত্রকে বৃত্তির তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। অথচ পুত্রবধূ ভবসুন্দরী দেবীকে মাসিক ১৫ টাকা বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। এই সিধান্ত তাঁর বিচক্ষণতা ও কর্তব্য পরায়ণতার বিশেষ একটা দিক নির্দেশক। এই রকম অনেক উদাহরণ রয়েছে ।

সমাজে প্রচলিত বহুবিবাহ, ভ্রূণহত্যা, বাল্যবিবাহ, অকালবৈধব্যের মত ব্যভিচার দেখে আর পাঁচটা সাধারণ বাঙালির মত পাশ কাটিয়ে চলে যান নি। তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। হয়েছিলেন ‘বেসুর’। বর্তমানের এই অতৃপ্ত, এই বীতরাগের ফলে সমাজের যে পরিবর্তন যে বিপ্লব হয় তার ফসল সোনালি ভবিষ্যৎ। ‘বর্তমানের এই অতৃপ্ত থেকে জন্ম হয় ‘ভবিষ্যৎ রচনা’।

আমৃত্যু ছিল তাঁর জীবন সংগ্রাম। শেষ বয়সে পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন চেনা গণ্ডী ছেড়ে তিনি চলে যান বহু দূরে। কার্মাটাঁড়ে গড়ে তোলেন ‘নন্দনকানন’। চিরচেনা জগত থেকে সন্ন্যাস নিলেও সন্ন্যাস নেন নি মানবসেবা থেকে। দিনে চিকিৎসা। আর সন্ধ্যায় স্কুল। অবসরে কালী মণ্ডলকে নিয়ে বাগান পরিচর্চা। বাঙালির স্নেহ শীতল মায়াবী নয়নে দেখলে মনে হবে তিনি সুখী ছিলেন না। কিন্তু তাঁর আসল সুখ তো মানব সেবায়। শম্ভুনাথকে তিনি নিজেই বলেছেন, “বড় লোকের বাড়িতে খাওয়া অপেক্ষা এ সকল লোকের কুটিরে খাইতে আমার ভাল লাগে।” আসলে এই ধরনের মানুষকে দশটা পাঁচটা ডিউটি, নাতিপুতিতে সাজানো সংসারের পুতুলরূপে কল্পনা করা যায় না। এঁরা চির মুক্ত। তারপদ মত যেন পৃথিবীর অতিথি। দিবানিদ্রারত বাঙালি থেকে সহস্র যোজন দূরে।

তাহলে দেখা গেল ঈশ্বরচন্দ্র বাঙালি ঘরে জন্মগ্রহণ করলেও বাঙালির চরিত্র থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এক সত্ত্বা। এক নির্ভীক স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী। ‘কখনও নোয়াইতে’ না পারা এক অটল ব্যক্তিত্ব। কর্মভীরু অজুহাতপ্রিয় বাঙালি ঘরে কর্মবীর যোদ্ধা। এ প্রসঙ্গে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যটি উল্লেখ করা যেতে পারে, “ তিনি কাজের লোক ছিলেন। তাই যে কাজ অন্যের কাছে প্রায় অসম্ভব ছিল সেই কাজকে তিনি সম্ভবপর করিয়া তুলিয়া ছিলেন।” ব্যক্তিগত দুঃখ, যন্ত্রনা, বিষন্নতা, ধূসরতা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর শেষ পর্যন্ত তার কর্মচেতনাকে, মানবসেবাকে বিবর্ণ হতে দেন নি। তার বহুমুখী কর্মপ্রচেষ্টার মূলমন্ত্র ছিল ‘মানবতার জন্য বেদনাবোধ’। সত্যিই তো এটাই মানব জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই জন্যই তো ভবে আসা। এই শাশ্বত সত্যটি স্বীয় জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে একঘেঁয়ে, অন্তর্মুখী বাঙালিদের সামনে তিনি উপস্থাপন করেছেন। তাই হয়তো বিধাতাপুরুষ এক আদর্শ চরিত্রের নিদর্শনরূপে তাঁকে বাঙা্লি পরিবারে পাঠিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে দিয়েছিলেন তাদের মানুষ করার দায়িত্ব। যদিও কবিগুরু আগেই বলে গিয়েছেন — “মানব ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন।”

ঋণ স্বীকার

১। বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ : বিনয় ঘোষ

২। করুনাসাগর বিদ্যাসাগর : ইন্দ্র মিত্র

৩। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বিদ্যাসাগরচরিত

৪। সাহিত্যসাধক চরিতমালা : ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

৫। পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : শিবনাথ শাস্ত্রী

৬। আনন্দবাজারের বিভিন্ন প্রতিবেদন

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev