উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোয় কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলার নবজাগরণের প্রভাব নানাভাবে বিকশিত হয়। সেদিক থেকে সমাজসংস্কার আন্দোলনের প্রভাব বাংলার গ্রামীণ জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে। সমাজসংস্কারক রূপে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিচিতি সেক্ষেত্রে তাঁর অন্যান্য বহুমুখী পরিচয়কে ছাপিয়ে দ্রুততার সঙ্গে প্রভাব বিস্তার করে চলে। তাঁর সেই জনপ্রিয়তা কলকাতা ছেড়ে দীর্ঘকাল কার্মাটাঁড়ে বাসকালেও যে অব্যাহত ছিল, তাঁর মৃত্যর প্রভাবেও তা প্রতীয়মান। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, বিদ্যাসাগরের চেয়েও আমজনতার মধ্যে না হলেও সমাজের শিক্ষাশোভন পরিসরে কেউ কেউ প্রভাবশালী ছিলেন। স্বভাবত মৃত্যুর শূন্যতা থেকেই জীবিতের পূর্ণতার পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভাবের বনেদিয়ানায় অস্তিত্বের স্বরূপ বেরিয়ে পড়ে, বিচ্ছেদবিরহেই প্রেমের পরাকাষ্ঠা ওঠে আসে। সেদিক থেকে বিদ্যাসাগরের অভাব তাঁর স্বভাবের দোসর। জনমানসে তাঁর প্রভাব যে সক্রিয় ছিল, তা যেমন সত্য, তেমনই উচ্চশিক্ষিত অভিজাত সমাজে তাঁর বিচ্ছিন্ন প্রকৃতিও অসত্য নয়
উল্লেখ্য, বিদ্যাসাগরের সমকালে শিক্ষাশোভন বনেদি পরিসরে অনন্য প্রভাবশালীদের ছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র। অথচ তাঁর মৃত্যু (১৮৯১-এর ২৬ জুয়াই) সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। কেননা তার দুদিন পরেই বিদ্যাসাগরের মৃত্যু হয় (১৮৯১-এর ২৯জুলাই)। এবিষয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সাক্ষ্য দিয়েছেন। ‘জীবনস্মৃতি’র ‘রাজেন্দ্রলাল মিত্র’ শীর্ষক অধ্যায়ের শেষের দিকে তিনি জানিয়েছেন : ‘বাংলাদেশের এই একজন অসামান্য মনস্বী পুরুষ মৃত্যুর পরে দেশের লোকের নিকট হইতে বিশেষ কোনো সম্মান লাভ করেন নাই। ইহার একটা কারণ, ইঁহার মৃত্যুর অনতিকালের মধ্যে বিদ্যাসাগরের মৃত্য ঘটে—সেই শোকেই রাজেন্দ্রলালের বিয়োগবেদনা দেশের চিত্ত হইতে বিলুপ্ত হইয়াছিল।’ বিদ্যাসাগরের মৃত্যু শুধু রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মৃত্যুশোককেই শুষে নেয়নি, সমাজের উচ্চস্তরকেও শোকার্ত করে তোলে। স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিমুখ দৃষ্টিতেও অশ্রুসজল হয়েছিলেন। এজন্য তিনি তাঁর তীব্র লেখনীকুঠারকেই পরিহার করেন। অকপটে তাঁর ‘বিবিধ প্রবন্ধ দ্বিতীয় ভাগ’-এর নিবেদনে প্রসঙ্গক্রমে বঙ্কিমচন্দ্র জানিয়েছেন : ‘বিদ্যাসাগর মহাশয় এক্ষণে স্বর্গারূঢ়, তীব্র সমালোচনায় তাঁহার আর কোন ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। কিন্তু তাঁহার জীবদ্দশায় কর্ত্তব্যানুরোধে তাঁহার গ্রন্থ যেরূপ তীব্রতার সহিত সমালোচনা করিয়াছিলাম, এখন আর তাহা পারা যায় না। কেন না, এখন তাঁহার শোকে আমরা সকলেই কাতর। যাঁহার জন্য সকলেই রোদন করিতেছে, তাঁহার কোনো ত্রুটির সমালোচনা এ সময়ে সাধারণ সমীপে উপস্থিত করিতে পারা যায় না।’
অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র ‘শোকে কাতর’ হয়েছেন এবং ‘সকলেই রোদন করিতেছেন’ জানিয়েও বিদ্যাসাগরের ত্রুটির অস্তিত্বকে বহাল রেখেছেন। সেদিক থেকে শোকের মধ্যেও বিদ্যাসাগরের প্রভাব স্বীকার করে নিয়েও তাঁর বিরূপ সমালোচনার অপরিহার্যতাকে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে তাঁর শ্রদ্ধাবোধ সাময়িকতায় মিলিয়ে গেলেও তাঁর বিরূপ মনোভাব অম্লান থেকে যায়। অন্যদিকে মৃত্যুশোকের শূন্যতায় জেগে ওঠা আপনবোধ একটু মাত্রাছাড়া হয়। বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও তা হয়েছিল। সময়ান্তরে শরতের মেঘের মতো আশা জাগিয়েও তা অনাবৃষ্টিতে আশাহত করে চলে যায়। প্রত্যাশার ভাঁড়ার প্রাপ্তির শূন্যতায় সরবে বেজে ওঠে।
আসলে মৃত্যুতে শূন্যবোধের আধারে জীবিতের অস্তিত্ব নানাভাবে প্রকাশিত হয়। শুধু তাই নয়, তার মধ্যেই সেই অস্তিত্বের প্রকৃত পরিচয় বা যথার্থ মূল্যায়ন বেরিয়েও পড়ে। অবশ্য জীবনের মূল্যায়ন তো মৃত্যুর অব্যবহিত পরিসরেই উঠে আসে না। কেননা তখন মৃত্যুশোক মূল্যায়নের অন্তরায়। কিন্তু সেই মৃত্যুশোকে জনমানসের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ফেলা দেওয়ার মধ্যে প্রয়াতের ভাবমূর্তিকেও অস্বীকার করা যায় না। সেদিক থেকে বিদ্যাসাগর তাঁর মৃত্যুতে মূর্তি থেকে প্রতিমায় পূজনীয় হয়ে উঠেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজেন্দ্রলাল মিত্র যেমন মৃত্যুতেও বিপুল সমাদর লাভ করেননি, পরেও তেমনই বাঙালিমানসে জেগে ওঠেননি। সেদিক থেকে বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে তাঁর প্রতি বাঙালির শোকপ্রকাশের মধ্যে সুগভীর শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় নিবিড় হয়ে উঠেছে। বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই তার সাক্ষ্য বহন করছেন। অন্যদিকে সুরেশচন্দ্র সমাজপতি তাঁর ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় গভীর শোকই প্রকাশ করেননি, বিদ্যাসাগরের জীবনী রচনার উদ্যোগের কথাও সবিনয়ে তুলে ধরেন। ‘সম্পাদকের নিবেদন’-এ তিনি জানিয়েছেন : ‘বিগত ১৩ শ্রাবণ মঙ্গলবার, ২/২২ মিনিটের সময়, পূজ্যপাদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দাদা মহাশয় লোকান্তরিত হইয়াছেন।/ আমার এখন কিছু বলিবার শক্তি নাই। দেশের সকল কাগজপত্রে তাঁহার কথা আলোচিত হইতেছে, আমাদের আত্মীয় ও বান্ধবগণ “সাহিত্যেও” দাদা মহাশয়ের জীবনচরিত লিখিতে অনুরোধ করিয়াছেন। আশা করি, তাঁহারা আমার অবস্থা বুঝিয়া, আপাততঃ আমায় ক্ষমা করিবেন।/ এই জন্য, সম্পাদকের অনবসর বশতঃ শ্রাবণ মাসের “সাহিত্য” যথাসময়ে প্রকাশিত হয় নাই।’ সেদিক থেকে বিদ্যাসাগরের মৃত্যশোকের তীব্র সাড়া মেলার মধ্যে তাঁকে নিয়ে চর্চার যে পরিসর সক্রিয় হওয়ার অবকাশ ছিল না, তা তো হয়নি, সেই ভাববেগও অন্তর্হিত হয়, তাঁকে নিয়ে উদ্যোগেও ভাটা পড়ে। মেঘ কেটে যায়, বৃষ্টির প্রত্যাশা জেগে থাকে।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই বিদ্যাসাগর ইতিহাস হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও তখন বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা পর্ব। তাঁর প্রভাবও তখন অভিভাবক হয়ে ওঠেনি। তবে ক্রমশ রবির উদীয়মান আলোর ছটা সম্প্রসারিত হচ্ছিল। তাছাড়া তাঁর সঙ্গে বিদ্যাসাগরের সরাসরি যোগসূত্রও ছিল ক্ষীণ। অথচ তিনি যে বিদ্যাসাগরের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তা বুঝতে কয়েকবছর অপেক্ষা করতে হয়। এজন্য বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর (১৮৯৪-এর ৮ এপ্রিল) দিনদশেকের মধ্যে ১৮ এপ্রিল স্টার থিয়েটারে তাঁর স্মরণসভায় তরুণ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের সুদীর্ঘ প্রবন্ধপাঠের (‘বঙ্কিমচন্দ্র’ নামে ১৩০১-এর বৈশাখে ‘সাধনা’য় প্রকাশিত হয়।) মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে, বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রে তার পরিচয় নেই। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও সেক্ষেত্রে সক্রিয় ছিল। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বঙ্কিমচন্দ্রের পথপ্রদর্শক ও অভিভাবকত্বের শূন্যতাবোধে তরুণ সাহিত্যিকের সংবেদী চিত্তের ক্ষরণ স্বাভাবিক ভাবেই আন্তরিক হয়ে উঠেছিল।
বিদ্যাসাগরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সংযোগের নিবিড়তা না থাকলেও তাঁর প্রতি যেমন প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধে সেই অভাব স্বভাব হয়ে ওঠেনি, তেমনই তা প্রকাশের ক্ষেত্রে সময়ের দূরত্ব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর চার বছর পরে তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ১৮৯৫-এর ২৮ জুলাই (১৩০২-এর ১৩ শ্রাবণ) কলকাতার এমারেল্ড থিয়েটারে আয়োজিত স্মরণ সভায় রবীন্দ্রনাথ রীতিমতো গবেষণা করে লেখা সুদীর্ঘ প্রবন্ধ ‘বিদ্যাসাগর’ পাঠ করেন। সেখানেও বিদ্যাসাগরের জীবনী লেখার কথা উঠে আসে। রবীন্দ্রনাথের তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধটি শুনে মুগ্ধ শ্রোতাদের মধ্যে প্রথম ভারতীয় ভাইস-চান্সেলর (১৮৯০-১৮৯২) গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ‘স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবনচরিত বিস্তৃতভাবে লিখিবার জন্য রবীন্দ্রবাবুকে’ অনুরোধ করেছিলেন। ইতিমধ্যে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে জীবনী লেখা যে হয়নি, তা নয়। শুধু তাই নয়, তা নিয়ে অচিরেই বিতর্কও শুরু হয়। ১৮৯১-এ বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী তথা স্বরচিত ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ প্রকাশিত হয়। সে বছরেই বিদ্যাসাগরের তৃতীয় সহোদর শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন রচিত ‘বিদ্যাসাগরজীবনচরিত’ বেরিয়েছিল।
এছাড়া ১৮৯৫-এ (জ্যৈষ্ঠ ১৩০২) চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিদ্যাসাগর’ জীবনীগ্রন্থটি প্রকাশ পায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধটি রচনায় বিদ্যাসাগরের স্বরচিত জীবনী ‘বিদ্যাসাগরচরিত’-এর সঙ্গে শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন ও চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনীগ্রন্থদুটির সাহায্য নিয়েছিলেন। বিশেষ করে প্রথমদুটি বইয়ের অনেক অংশই উদ্ধৃতি সহযোগে ও প্রয়োজনে নিজের ভাষায় ব্যাবহার করেছেন রবীন্দ্রনাথ। পাদটীকায় পরিপূর্ণ ষোলো পাতার প্রবন্ধটিতে চার ভাগের একভাগ বইদুটিরই সম্পদ। রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ অমিত্রসূদন ভট্টাচার্যের সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে জানিয়েছেন (‘বিদ্যাসাগর, তাঁর সমসময়ে’, ‘দেশ’, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০) : ‘প্রবন্ধ শুনে শ্রোতৃবর্গের অনেকেরই মনে হয়েছিল ‘বঙ্কিমচন্দ্র’র মতো আর-একটি জীবনমুখী প্রবন্ধ বাঙালি হাতে পেল। বিদ্যাসাগরের জীবনের এত তথ্যের সমাহার রবীন্দ্রনাথ যেভাবে ঘটিয়েছেন তা বিস্ময়কর।’ শুধু তাই নয়, প্রাবন্ধিক আরও লিখেছেন : ‘রবীন্দ্রনাথের রচিত ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ প্রবন্ধটি সমগ্র রবীন্দ্রসাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী রচনা বলে বিবেচনা করতে হয়। যাঁরা সেদিন তাঁর বক্তৃতা শুনেছিলেন তাঁরা তো আর সেই লেখায় কণ্টকাকীর্ণ ফুটনোটগুলি দেখেননি।’ প্রথম কথা, রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রকে সাহিত্যিক হিসাবে দেখেছেন, বিদ্যাসাগরকে মেনেছেন অসাধারণ মানুষ হিসাবে। ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ রচনাটি তাঁর ‘আধুনিক সাহিত্য’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ ‘চারিত্রপূজা’য়। সেদিক থেকে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনমুখী প্রবন্ধ’ পাওয়া প্রত্যাশিত নয়। তাছাড়া তরুণ কবি যেভাবে বঙ্কিমচন্দ্রের উষ্ণ সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, তা বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সহজ হয়ে ওঠেনি।
বিদ্যাসাগর জীবনের শেষ সতেরো বছর স্বেচ্ছায় দূরে সরে থাকায় বাঙালিমানসে তাঁর অস্তিত্ব সেভাবে সক্রিয় ছিল না। জীবিতকালেই তাঁর অসাধারণ মহামানবীয় মিথ জনমানসে যেমন তাঁকে ঈর্ষণীয় বিমুখতায় সামিল করেছিল, তেমনই স্বেচ্ছায় দূরে চলে যাওয়া উদাসীনতাও বয়ে এনেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বহুবিবাহ রোধে তাঁর ব্যর্থতা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে মৃত্যুর অনেক পূর্বেই বিদ্যাসাগরের সাহিত্যচর্চাও নীরব হয়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের শৈশবের শিক্ষা লাভের স্মৃতিতেই তিনি মুগ্ধ বিস্ময়ে জড়িয়ে ছিলেন। সেকথা কবি নানাভাবে বিভিন্ন প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণাও করেছেন। এমনকি, এজন্য বিদ্যাসাগরকে ‘কবিগুরু’র আসনে বসিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর পেয়েছিলেন শ্রদ্ধার দূরত্ব থেকে। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর কাছে বিদ্যাসাগরের বহুমুখী প্রতিভাব্র অধিকারী মহামানবের পরিচয় যেভাবে সক্রিয়তা লাভ করে, সেভাবে ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষ অনুভূতির আলোয় তাঁকে দেখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। প্রসঙ্গত স্মরণীয়, রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’র(১৯১২) স্বতন্ত্র অধ্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্র এলেও বিদ্যাসাগর আসেননি। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁকে জানার মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রয়াসে গবেষণায় আলোর প্রয়োজন পড়েছিল। অবশ্য বিদ্যাসাগরের বহুধাবিস্তৃত অতুলনীয় মহামানবীয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পথিকৃতের ভূমিকাটিও প্রকট হয়ে ওঠেছে।
রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের মহত্ত্বকে নানাভাবে তুলেধরায় ব্রতী হয়েছিলেন। সেখানে তাঁর অনন্য মানবিক সত্তার অতুলনীয় বিস্তারকে অসাধারণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিনম্র শ্রদ্ধায় প্রকাশ করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যে-বছর রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের স্মরণসভায় তাঁকে নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন, সেবছরেই (২৬চৈত্র ১৩০২) কবি ‘বঙ্গমাতা’ (‘চৈতালী’ কাব্যের) কবিতায় বাঙালিকে মানুষ করার কথা বলেছেন। সেখানে বিদ্যাসাগরের মানবিক মুখ প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে : ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,/ রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।’ প্রসঙ্গত স্মরণীয়, বিদ্যাসাগরকে নিয়ে প্রথম প্রবন্ধেই রবীন্দ্রনাথ অকপটে জানিয়েছেন : ‘…বিদ্যাসাগরের জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা করিয়া দেখিলে এই কথাটি বারংবার মনে উদয় হয় যে, তিনি যে বাঙালি বড়লোক ছিলেন তাহা নহে, তিনি যে রীতিমত হিন্দু ছিলেন তাহাও নহে—তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বেশি বড়ো ছিলেন, তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন। বিদ্যাসাগরের জীবনীতে এই অনন্যসুলভ মনুষ্যত্বের প্রাচুর্যই সর্বোচ্চ গৌরবের বিষয়। তাঁহার সেই পর্বতপ্রমাণ চরিত্রমাহাত্ম্যে তাঁহার কীর্তিকে খর্ব করিয়া রাখিয়াছে।’
আবার সেই প্রবন্ধের মধ্যে বিদ্যাসাগরের প্রতি দৃষ্টিনিবদ্ধ করে রবীন্দ্রনাথ আরও জানিয়েছেন, ‘মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চারকোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন সেখানে হঠাৎ দুই-একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।’ সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ‘পর্বতপ্রমাণ চরিত্রমাহাত্ম্য তাঁহার কীর্তিকেও খর্ব’ করে রাখার কথা বলে কার্যত বিদ্যাসাগরের মহামানবিক বিভূতিকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেক্ষেত্রে তাঁর কীর্তিতে তাঁকে যে পূর্ণ ভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না, তাও অনস্বীকার্য। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সেই সুদীর্ঘ প্রবন্ধে পর্যায়ক্রমে ‘তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা’, ‘বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী’ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করেই বিদ্যাসাগরের অনুপম চরিত্রের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সবিশদ আলোচনা করেছেন এবং উপসংহারে এসে তার লক্ষ্যভেদ করেছেন, ‘…দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব ; এবং যতই তাহা অনুভব করিব ততই আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্য সফল হইবে, এবং বিদ্যাসাগরের চরিত্র বাঙালির জাতীয় জীবনে চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে।’
প্রবন্ধটির বছরতিনেক পরে (অগ্রহায়ণ ১৩০৫) আবার যখন রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরকে নিয়ে লেখনীধারণ করেছেন, তখনও তাঁর মধ্যে অসাধারণ চরিত্রমাহাত্ম্যের কথা তুলে ধরেছেন। সেজন্য তিনি তা ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের জনসনের জীবনীকার বসওয়লের অভাব অনুভব করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে শিবনাথ শাস্ত্রীর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেই প্রবন্ধের মননে বিচরণশীল বিদ্যাসাগরের কথা উদ্ধৃতি সহযোগে প্রথমেই উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আজীবন ভেবেছেন। সেদিক থেকে যতই এগিয়েছেন, ততই তাঁর আত্মিক যোগ নিবিড় হয়ে ওঠায় নিজস্ব স্বকীয় কণ্ঠস্বর প্রাধান্য পেয়েছে, গবেষণার আর প্রয়োজন হয়নি। বিদ্যাসাগরের কীর্তির মধ্যে তাঁকে খুঁজে পাওয়ার বাতিক বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই প্রখর সচেতন ছিলেন। তাতে যে বিদ্যাসাগরের ‘অজেয় পৌরুষ’ ও ‘অক্ষয় মনুষ্যত্ব’ সমন্বিত মহামানবীয় ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না, সে-বিষয়ে তিনি বারে বারে সরব হয়েছেন। সেদিক থেকে বাঙালির মানবিক মুখে বিদ্যাসাগরের অতুলনীয় প্রকৃতি স্বাভাবিক ভাবেই ব্যতিক্রমীতে উদাহরণ হতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথও সেকথা দ্বিধাহীনভাবে স্মরণ করেছেন। যে রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নই বিদ্যাসাগরের ভাবমূর্তিকে আলোকিত করার সম্ভাবনায় দিশারি হতে পারত, তাই সময়ান্তরে অসফল হওয়ায় একসময় তিনিও আর খেদ গোপন করতে পারেননি।
বিদ্যাসাগরের জন্মশতবর্ষোত্তর পরিসরে লেখা প্রবন্ধ ‘বিদ্যাসাগর’-এ (‘প্রবাসী’, ভাদ্র ১৩২৯) রবীন্দ্রনাথ অকপটে জানিয়েছেন : ‘আমাদের দেশে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্মরণ-সভা বছর বছর হয় কিন্তু তাতে বক্তারা মন খুলে সব কথা বলেন না, এই ব্যাপারটা লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশের লোকেরা একদিক দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন না করে থাকতে পারেন নি বটে কিন্তু বিদ্যাসাগর তাঁর চরিত্রের যে মহত্বগুণে দেশাচারের দুর্গ নির্ভয়ে আক্রমণ করতে পেরেছিলেন সেটাকে কেবলমাত্র তাঁর দয়াদাক্ষিণ্যের খ্যাতির দ্বারা তাঁকে ঢেকে রাখতে চান। অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের যেটি সকলের কাছে বড়ো পরিচয় সেইটিই তাঁর দেশবাসীরা তিরস্করণীর দ্বারা লুকিয়ে রাখছেন।’ সেক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের ন্যায় দয়ার সাগর থেকে করুণাসাগরে সুপরিচিতিতে একমেবাদ্বিতীয়ম ঈশ্বরচন্দ্র যেভাবে মিথের শিকার হয়েছেন, সেভাবে তাঁর অকল্পনীয় মহামানবিক সত্তা স্বীকৃতি লাভ করেনি। সেবিষয়েও রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন জীবনের উপান্তেও বিদ্যাসাগরের প্রতি তাঁর সুগভীর অনুধ্যানকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
আসলে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভাবমূর্তিকে বাঙালিমানসে একাত্ম করতে চেয়েছিলেন, তা যে সময়ান্তরে সম্ভব হয়ে ওঠেনি, তাও তিনি গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এজন্য স্থূল ভাবে বিদ্যাসাগরের কীর্তির আধারে তাঁকে খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই যে গোলায় গলদ আছে এবং তা বাঙালির স্বভাবসুলভ সচেতন প্রয়াস, এবিষয়েও তাঁর অন্তর্দৃষ্টি সক্রিয় ছিল আজীবন। সেক্ষেত্রে তাঁর অবমূল্যায়ন প্রকৃতি নিয়ে তিনি বিদ্যাসাগর বিষয়ে প্রতিটি বক্তৃতা বা প্রবন্ধে সচেতন করার প্রয়াসী হয়েছেন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বকীয় আলোর উৎসেও বিদ্যাসাগরকে প্রতিস্থাপন করেছেন অবলীলায়। ১৯৩৯-এর ১৬ ডিসেম্বর মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর-স্মৃতি-মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটন করে যে বক্তৃতা প্রদান করেন, তাতে তাঁর হার্দিক শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যেও সত্যপ্রকাশ মূর্তি প্রতিমায় মিলিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের কথায় : ‘পূণ্যর্স্মৃতি বিদ্যাসাগরের সম্মাননার অনুষ্ঠানে আমাকে যে সম্মানের পদে আহ্বান করা হয়েছে, তার একটি বিশেষ সার্থকতা আছে। কারণ এই সঙ্গে আমার স্মরণ করবার এই উপলক্ষ ঘটল যে, বঙ্গসাহিত্যে আমার কৃতিত্ব দেশের লোক যদি স্বীকার করে থাকেন, তবে আমি যেন স্বীকার করি, একদা তার দ্বার উদ্ঘাটন করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একই কথা রবীন্দ্রনাথ তার বছরখানেক পূর্বে ১৯৩৮-এর ১০ সেপ্টেম্বরে লেখা ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ নামে চতুদ্দশপদী কবিতায় ব্যক্ত করেছেন। সেটিও সেই মেদিনীপুরের স্মৃতিসংরক্ষণ সমিতির অনুরোধে লেখা। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বাংলা সাহিত্যের মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটনে বিদ্যাসাগরের ভূমিকার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন, তাতেও তাঁর পরিচয় বর্ণপরিচয়ের আর গদ্যশিল্পীর আধারেই আবর্তিত হয়েছে। সেখানে তাঁর ব্রহ্মার সৃষ্টি নয়, নির্মাণের বিশ্বকর্মা নিয়েই সমালোচনা সরব হয়ে ওঠে । শিল্পকর্মে শিল্পীর ছায়া পড়ে, কায়া থাকে আড়ালে। স্থান-কাল-পাত্রের ত্রিবেণী সঙ্গমে শিল্পীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায়। সেখানে মূর্তি শুধু প্রতিমা হয়ে ওঠে না, ভাবমূর্তির গ্রহণযোগ্যতায় তা নৈবেদ্য লাভ করে। সেদিক থেকে বিদ্যাসাগরের স্থূল কীর্তির মধ্যে তাঁকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সেখানে তাঁর প্রাণের পরশের স্বীকৃতির বড় অভাব। সেবিষয়েও রবীন্দ্রনাথ তাঁর ১৬ ডিসেম্বরের বক্তব্যে স্পষ্ট করে তুলেছেন : ‘দীন দুঃখীকে তিনি অর্থদানের দ্বারা দয়া করেছেন, সেকথা তাঁর দেশের সকল লোক স্বীকার করে; কিন্তু অনাথা নারীদের প্রতি যে করুণায় তিনি সমাজের রুদ্ধ হৃদয়দ্বারে প্রবল শক্তিতে আঘাত করেছিলেন, তার শ্রেষ্ঠতা আরো অনেক বেশি, কেননা তার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে কেবলমাত্র তাঁর ত্যাগশক্তি নয়, তাঁর বীরত্ব।’ সেই ‘বীরত্ব’ তো দৃশ্য নয়, তা অনুভব করার শক্তি চাই, চাই সদিচ্ছা। সেদিক থেকে কীর্তিতে দৃশ্যমান বিদ্যাসাগরের চেয়ে অদৃশ্য ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বরূপ যেমন সময়ের দূরত্বে ক্রমশ আবছা হয়ে পড়েছে, তেমনই তা মিথের আড়ালে থাকায় তার মূল্যায়নেও এসেছে সন্দেহ আর উদাসীনতা, অবমূল্যায়নও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ সেক্ষেত্রে আলোকদিশারী হয়েও বাঙালিমানসের অন্ধকার যে বিদূরিত করতে অসফল হয়েছেন, তা তাঁর কথাতেই প্রতীয়মান।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
সকালবেলায় অর্ধেক পড়েছিলাম, কর্মব্যস্ততার মধ্যে থেকেও কোথাও যেন মনে হচ্ছিল সারা দিন কিছুই করিনি। একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। এখন সম্পুর্ন প্রবন্ধ পড়লাম, শান্তি পেলাম…