‘অথবা কিন্নর’ কাব্যগ্রন্থের ‘কবিতা’ কবিতায় কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র কবিতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছিলেন —
“শুধু যখন যন্ত্রণার ঢেউ উঠবে
পাকা বনেদের তালা থেকে
তোমার তুমি-কেও ভেঙে-চুরে
প্রাণের পুতুল-নাচের সুতো দিয়ে দু-দন্ডের জন্য হবে স্বাধীন,
তখন কবিতা লেখার চেষ্টা কোরো একটা।”
তেমনি কবি সুব্রত পালের ‘ঈশ্বরের নিকট ইতর’ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই ‘তোমার তুমি-কে’ ভেঙে চুরে নির্মাণ করার আশ্চর্য এক কৌশল। ৪১ টি ছোটো বড়ো কবিতায় সাজানো এই কাব্যগ্রন্থের নামটিও বেশ চমকপ্রদ। কাব্যটির প্রকাশক ধীমান ব্রহ্মচারী এবং তার প্রকাশনা সংস্থা ‘এবং অধ্যায়’- কেও অসংখ্য ধন্যবাদ এমন সুন্দর মনন সমৃদ্ধ একটি কাব্য উপহার দেওয়ার জন্য।
”শব্দ ও সময়ের মধ্যে খেলা কবিতার এক বিচিত্র ধর্ম। যেখানে ঈশ্বর কোথাও মানুষের ভাবনায় মুহূর্ত হয়ে ধরা দেয় বাস্তবের আঙিনায়।”— কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি কবিতা যেন এই কথাটিকেই প্রমাণ করতে চায়। কবি, লেখিকা ও অধ্যাপিকা ড.কৃষ্ণা বসু এই বইটির কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন — “তাঁর কবিতার ভিতর জীবনের গন্ধ আছে, জীবনের ছন্দ আছে।তাঁর কবিতার মধ্যে কবিতার মায়া ও ম্যাজিক আছে।… এই বইতে কবি তাঁর কবিতার ভেতরে জীবনকে ধরেছেন নানা ছন্দে, নানান ছবিতে, নান্দনিক ছাঁদে। তাঁর কবিতা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে আমার বিশ্বাস। তাঁর কবিতার ভেতরে শিল্প আছে, সংযোগও আছে, জীবনের বার্তাও আছে।”
প্রথম কবিতার নাম ‘ঈশ্বরের নিকট কামগ্রস্ত ইতর’। এ ঈশ্বরকে যেন বাস্তবের মাটিতেই খুঁজে পাই আমরা। প্রথমেই কবি বলেছেন —
“ঈশ্বরের নিকট কামগ্রস্ত ইতর
কিছু প্রার্থনা না করেই সঙ্গী খোঁজে দখলদারির যুদ্ধে নিজেকে নিয়োজিত করে
বাড়িয়ে নেয় আরেকটু টেস্টোস্টেরন আর ঈশ্বর তার পিছু পিছু আপেল হাতে খোসামোদ করে ফেরেন
লক্ষ্মীটি এবার খাবি আয়।”
মানবজীবনের সেই আদিম প্রবৃত্তি,
কামনা বাসনাময় জীবন, ঋতুভিত্তিক সঙ্গীতের মহড়া, বৈরাগী সেজে কয়েক সহস্রাব্দ এই কারাগারে বন্দি থাকা — এ সবই রূপক। এর থেকে নিস্তার নেই। তাই কখনো কখনো ফাঁস জালে ঈশ্বরও আটকে যান। জলের ঘেরাটোপে মাঝেমধ্যেই ঘাই মারতে হয় তাদের। কিন্তু ফিরতি জল পুনরায় তাকে ঘিরে ধরে। আসলে মানুষ তার সাংসারিক ঘেরাটোপে বন্দি। কামনা-বাসনা, যৌনতা এসব নিয়েই তো জীবন। এ থেকে কিছুতেই বেরোনো যায় না।
মানুষ আজ বড়ো ব্যক্তিগত। ‘ব্যক্তিগত চশমায়’ চোখ রেখে আত্মস্থ হয়ে থাকা-এ যেন কতকটা স্বভাব তাদের। ‘কেমন আত্মস্থ হয়ে আছি দ্যাখো’ কবিতায় তাই কবির মুখে বলতে শুনি —
“কেমন আত্মস্থ হয়ে আছি দ্যাখো
খাচ্ছি-দাচ্ছি ঘুমোচ্ছি
আর মাঝে মাঝে চোখ রাখছি ব্যক্তিগত চশমায়।
দিব্যি আছি আমি
সবই তো সাজানো-গোছানো ঠিকঠাক নিখুঁত জোড়াতালি…”
আমার কাছে যা ঠিকঠাক সাজানো- গোছানো তা আসলে সবসময় সকলের চোখে সাজানো-গোছানো নয়, তা একপ্রকার নিখুঁত জোড়াতালি। আসলে ‘সব রং মিলিয়ে মিশিয়ে দেখা প্র্যাকটিস’ করার মতো। কিচ্ছু ঠিক নেই, তবুও ঠিক আছে বলে মেনে নেওয়া ঠিক ওই উলঙ্গ রাজার গল্পটার মতো।
“সবাই দেখছে রাজা উলঙ্গ
তবু সবাই হাততালি দিচ্ছে।”
এইভাবে জোড়াতালি দিয়েই তো চলছে সবকিছু। তার পাশাপাশি আছে ব্যক্তিগত শোক, বিষাদ। তবুও এই শোককে কাটিয়ে ওঠে,বিষাদ ভুলে ব্যথা ও বাস্তব ছুঁয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়।আসলে —
“বিষাদ বলে কিছু তো নেই।
মন খারাপের রাত,
ধরে গলাগুলি এসো কাঁদি সখা
কেঁদে যদি হয় সুখ।”
কবি লিখছেন “অনন্ত বিষাদ জড়িয়ে বলে গেছ” কবিতায় —
“অনন্ত বিষাদ জড়িয়ে বলে গেছ- এভাবেই বেঁচে যেতে হয় ব্যথা ও বাস্তব ছুঁয়ে।
যতদিন বেঁচে আছি…”
অভাব-অভিযোগ,সুখ-দুঃখ,বিরহ- বেদন,নিঃসঙ্গতা সবই আছে মানুষের জীবনে।তবুও যদি চেষ্টা করি আমরা নিঃসঙ্গতা ভুলে থাকার- আমরা পারব। অন্তত চেষ্টা করাটা অন্যায় নয় —
“এসো নিঃসঙ্গতা ভুলে থাকার চেষ্টা করি,
একটু শান্তিতে বসি পাশাপাশি।
শীতের দুপুরগুলো বড্ড প্যাঁচপেঁচে
আর অলস মনে হয়।
বোবা সন্ধ্যার অন্ধকার
নিঙড়ে বার করে নেয়
দুপুরের সমস্ত তেজ।
এসো নিঃসঙ্গতা ভুলে থাকার চেষ্টা করি একটু করি প্রেমের কথকতা।
শ্রাবণ সন্ধ্যাগুলো বড্ড একা লাগে, বিরহী যক্ষের মত
এসো আরেকবার একসাথে লিখি
বেঁচে থাকার কবিতা।”
— ‘বেঁচে থাকার কবিতা’, প্রসেনজিৎ দাস।
তেমনি রোজকার অভাব-অভিযোগ, অনটন, নিঃসঙ্গতাকে দূরে সরিয়ে ভালো থাকতে বলেছেন কবি —
“চলো
আজ একটু ভালো থাকি
রোজকার অভাব-অভিযোগ
অনটন
সরিয়ে রেখে নিঃশর্ত যাপন
চলো….আজ একটু ভালো থাকি।”
আবার কখনো উচ্চারণ করেছেন —
“হৃদয়ের অনেকটা ফাঁকা…
সে শুধু কি তোমারই
খাঁ খাঁ পড়ে শুকোচ্ছে অলিন্দ-নিলয় জোড়া আমারও
কপাটিকা খোলো
কিছুটা তো অক্ষর আজ আবার নিরালায় আঁকি
চলো ভালোবাসি
আজ একটু ভালো থাকি।”
জীবনটা আসলে রঙ্গমঞ্চ। প্রত্যেকটা মানুষ এক একটা অভিনেতা। সে যেন অনেকটা পুতুল নাচের পুতুল। অদৃশ্য এক সুতোয় ঝুলছি আমরা আর জীবন নাট্যমঞ্চে চলছে নিখুঁত অভিনয়। অভিনয় শেষ হলেই অনন্তের দিকে যাত্রা।কবি সে কথাটাও কবিতার মাধ্যমে বলেছেন —
“পুতুল নাচের পুতুল
মরলেও হাজির হয়ে যায় ঠিক পরের শো’য়ে।
হাত-পা-মাথা-গলা-বুক-পেট সুতোয় বাধা তার
একেকবার একেকটা গল্পে জোড়া হয় তাকে
একেক রকম পোশাকে
অন্যরকম সংলাপ বসানো হয় মুখে।”
অর্থাৎ মানুষ একইসঙ্গে নানান ধরনের অভিনয় করে চলছে।
যে কবি একদিকে শুনিয়েছেন পজিটিভ জীবনের গল্প,রোজকার অভাব-অভিযোগ দূরে সরিয়ে নিঃশর্ত যাপন করতে চেয়েছেন,চেয়েছেন ভালো থাকতে, ভালবাসতে; সেই কবি আবার বিষণ্নতার ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছেন —
“বলবার মতো পাখি একটাও নেই
কঞ্চি দুলিয়ে সেই যে সাহেব বুলবুলি ফিরে গেল
সেই থেকে বলবার মতো পাখি একটাও নেই
গা-ছাড়া ফিঙে
মাটির কাছের টুনটুনিরাও বাস উঠিয়ে সুবিধাজনক ডালে
ভোরের প্রথম ট্রেনটা এলে ওভারহেড তার ছেড়ে উড়ে যায় কাকেরাও
তারপর সারাদিন বলবার মতো পাখি
একটাও নেই।”
এটাই জীবনের বাস্তবতা। এই বাস্তবতার চিহ্নগুলি বারবার মাটি ছুঁয়ে গেছে। চোখের সামনে আমরা এই বাস্তবতা গুলি উপলব্ধি করি অহরহ।জীবনের ট্র্যাজেডিগুলি বড্ড একা করে দেয় আমাদের। প্রেম পৃথিবীর সবচেয়ে পপুলার জিনিস। কিন্তু এই প্রেমই যখন পরিণত হয় ধোঁকাতে তখনই উচ্চারিত হয় —
“সারাটা বসন্ত শুধু ব্যথাই বাড়িয়ে গেলে এভাবে বাঁচে কেউ…”
আবার কখনো লিখছেন —
“দিলে তো একাকার করে
প্রেম পাপ সব
এখন যদি অচ্ছুৎ বলে আগ্রহ দেখায় কেউ
অযথা অন্ধকার নামবে
সব ভুল তোমার দিকে
অথচ ভুগতে হবে একা আমাকেই।”
তাই ‘ছাতার নিচে বিষণ্ণ ছায়া’ কবিতায় কবিকে বলতে শুনি —
“বুকের ভেতর বৃষ্টি ক্ষত ঢেকে
অলীক রঙে রাঙিয়ে রেখেছি খোলা আকাশ
খাঁ খাঁ
ছাতার নীচে বিষণ্ণ ছায়া মাড়িয়ে ফিরছি
অভিমানী পা’ দুটো বলছে
কিচ্ছু দিতে পার না তুমি
কান্নাটুকু ছাড়া।”
এভাবেই জীবনের ট্রাজিক পরিণাম, তাকে হারিয়ে বিষণ্ণতাকে সরিয়ে পথ চলতে হয় আমাদের। কারণ সুখ-দুঃখ সবকিছু মিলিয়েই তো জীবন। অন্ধকার না থাকলে যেমন আলোর গুরুত্ব থাকে না, তেমনি দুঃখ না থাকলেও সুখ এত মধুর হয় না। জীবনের এই সত্য গুলি কবির কবিতার পরতে পরতে উঠে এসেছে। শব্দকে নিয়ে এত নিখুঁত কাটাছেঁড়া, এতটা বাস্তবতা সৃষ্টি খুব কম কবিই করতে পারেন। শব্দকে তিনি খেলিয়েছেন,বলা ভালো শব্দের মধ্যে অদ্ভুত একটা ম্যাজিক কাজ করেছে। যার জন্য এতটা জীবন সত্য উদঘাটিত হয়েছে সুব্রতদার কবিতায়।
“আমার যৌবনে তুমি স্পর্ধা এনে দিলে তোমার দুচোখে তবু ভীরুতার হিম। রাত্রিময় আকাশে মিলনান্ত নীলে
ছোট এই পৃথিবীকে করেছো অসীম।”
প্রথম প্রেমে পড়েই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা লেখার সূত্রপাত হয়েছিল এটা তাঁর নিজের কথা থেকেই জানা যায়। তাই প্রেম কবিদের কবিতার একটা অন্যতম রসদ। তাইতো ইতালির কবি ওয়েলবি মৃত্যু শয্যায় শুয়ে শুয়ে উচ্চারণ করেছিলেন —
“কাকে বলে জীবন? ভালোবাসার নারীকে নিয়েই জীবন। চুল ওড়ানো পাগল হাওয়া, চোখের পরে রোদ্দুর, বন্ধুর হাতে হাত রেখে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে হেঁটে যাওয়া- এসবই তো জীবন।” ভালোবাসা মানুষের জীবনের এক অমোঘ সত্যের নাম। তাইতো ভালোবাসার জন্য হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে, দুরন্ত ষাড়ের চোখে লাল কাপড় বেঁধে, বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনা যায় ১০৮টি নীল পদ্ম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর “নীরার দুঃখকে ছোঁয়া” কবিতায় লিখেছিলেন —
“কতটুকু দূরত্ব? সহস্র আলোকবর্ষ চকিতে পার হয়ে/আমি তোমার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসি/তোমার নগ্ন কোমরের কাছে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলার আগে/অলঙ্কৃত পাড় দিয়ে ঢাকা অদৃশ্য পায়ের পাতা দুটি/বুকের কাছে এনে চুম্বন ও অশ্রুজলে ভেজাতে চাই।”
প্রেম যদি পবিত্র হয় ভালোবাসার সামনে কখনো কখনো নতজানু হতে হয়। আবার ভালবাসা সামনে এসে দাঁড়ালে কোনো কোনো কবিই আবার হয়ে যান অভিজ্ঞ যাযাবর। কবি তাঁর কবিতায় লিখছেন —
“ভালোবাসা সামনে এসে দাঁড়ালে
আমি যেন অভিজ্ঞ যাযাবর।”
আবার কখনো লিখছেন —
“ভালোবাসার সামনে দাঁড়িয়ে
সুখের কথাই তো বলতে চাই বারবার আমি
উনুনের ব্যস্ততায় উপোসি শরীর ভুলে যায় প্রসাধন
শখের দীপদানে ধিকি ধিকি উবে যায় কর্পূর সোহাগ
ভালোবাসা সামনে এসে দাঁড়ালে আমি কেমন যেন বালুচর দেখি
মাঝে মাঝে দাগ ছোপ… শুকনো ঘাস ওরই মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে বাঁচাতে চাই আমি।”
যাযাবরদের যেমন কোনো নির্দিষ্ট ঘর নেই, যখন যেখানে আশ্রয় জোটে সেখানে কাটিয়ে দেয়। তবু তো তারা সুখী। “জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন”। তাই ভালোবাসার সামনে দাঁড়িয়েও সুখ প্রার্থনা করেছেন কবি। সুখ তার প্রার্থিত। কিন্তু ভালোবাসা যখন পরিণত হয় ধোঁকাতে, তখন চোখে বালুচরের মত ধূ ধূ করে সবকিছু। তখন মনে হয় —
“প্রেম বলে কিছু নেই
চেতনা আমার জড়ে মিশাইলে
সব সমাধান পাই।”
শুকনো ঘাস, দাগ ছোপ- হয়তো সেই হারানো ভালোবাসার প্রতীক। তাই নতুন করে ভালবাসা সামনে এসে দাঁড়ালেও কবি হয়তো তাকে বাঁচিয়ে চলতে চান।
গত দু-তিন বছর আগে পৃথিবীর এক ভয়ানক অসুখ থাবা বসিয়েছিল মানুষের উপর, যার নাম করোনা ভাইরাস। এই ভয়াবহ অতিমারির কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ, অকালে ঝরে গেছিল অসংখ্য প্রাণ। সেই অতিমারিকে আটকাতে জারি হয়েছিল লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব বিধি। চারিদিকে মৃত্যুর মিছিল, হাহাকার, স্বজন হারানোর কান্না, অক্সিজেনের সংকট আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিল প্রকৃতির কাছে মানুষ আজও কতটা অসহায়। সেই লকডাউন এর স্মৃতি উঠে এসেছে সু-ব্রত দার ‘লকডাউন’ কবিতায়।জনজীবন স্তব্ধ, চারিদিকে খাঁ খাঁ,রাস্তাঘাটে মানুষ নেই, চারিদিকে শুনশান।কবি বলছেন —
“পার্থর কাঁসা-পিতলের কারখানার চিমনিমুখ ফুঁড়ে
দুমাস আগেও সারাদিন পেশীবহুল ধোঁয়া বেরোতো
এখন দুদিন পাঁচদিন বাদে বাদে দুর্বল ধোঁয়া বেরিয়ে
ক্র্যাচে ভর দিয়ে কেমন যেন পায়চারি করে বেড়ায় গলিটায় কাঁসা-পিতলের মৃদু ধাতব আওয়াজ আর
হাল্কা হাতুড়ির খাপছাড়া দু-একটা ঘায়
বলে দেয় যেন ভারী কাজ নেই আর ইদানিং।”
আবার কখনো বলছেন —
“গলিটার কংক্রিট রাস্তায় ভবঘুরে গরু এসে ফিরে যায় এখন
একটুও নোংরা না করে
পার্থর ছোট্ট কাঁসা-পালিশের কারখানার হাতুড়িগুলো বসে বসে দ্যাখে
নতুন কুকুরের সাথে গলির পুরাতন কুকুরের লড়াই।”
লকডাউনের জেরে অন্যান্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। কাজ হারিয়ে বিষণ্ণ চিত্তে তাদের অনেককেই বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছিল।’চলছে পা চলছে পা’ কবিতায় কবি বলছেন —
“হাঁটি হাঁটি ছেঁড়া চটি
ঘরমুখো পরিযায়ী পা দুটি
বাকি মোটে কয়েকশো আর মাইলস্টোন
পেরলে পরেই ঘর পাব
প্রতিবেশী বউ-বিবি-বাপ-মা-খোকা
গলিয়ে সস্তা জুতো- মোজা তাই
পরিযায়ী পা ফের সোজা-
চলছে পা চলছে পা চলছে পা।”
বাড়ি ফিরলেই আত্মীয়-স্বজন,বন্ধু-বান্ধব, চেনা কয়েকটা মুখ, আদর করার মতো মানুষজন সকলকে কাছে পাওয়া, সেই চেনা দোয়েল, কোকিল, ফিঙের নরম সুর আর ‘লকডাউনের সিদ্ধ ভাত’। তাই বুক বেঁধে পরিযায়ীরা পা ফেলে সোজা আপন গাঁয়েই ফিরতে চায়।
আধুনিক যুগের বিষণ্ণতা, হানাহানি, যান্ত্রিকতা, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো নানা অসুখ এখন আমাদের চারপাশে। চারপাশে নানা খেলা। আর এই খেলার মাঝে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার প্রয়াসটিও লক্ষণীয়। জীবন যুদ্ধে টিকে থাকা, শত লড়াই, ঝড়-ঝঞ্ঝা কাটিয়ে জীবন পথে এগিয়ে যাওয়ারই আরেক নাম জীবন। কিন্তু এখানেও যেন স্বার্থপরতা। নিজে গা বাঁচিয়ে চলা —
“এখন আর আরাম কই
চারপাশে উদ্ধত তলোয়ার
কেউ বলছে হাত কেটে দাও…কেউ বলছে পা
কেউ কেউ চাইছে গোটা মুন্ডুটাই
কেউ আবার শুধু ধড়
মুশকিল হল
সবাই সবারটা চাইছে আমাকে বাঁচিয়ে রেখে।”
এখানেও একজীবন ঘোর বাস্তবতা। এভাবেই বারবার জীবনের বাস্তবতা গুলো নিয়ে হাজির হয়েছেন সুব্রত দা তাঁর কবিতার মধ্যে। ভাবতে অবাক লাগে। জীবনের সব দিকগুলো এই কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটা কবিতায় উঠে এসেছে। একদিকে জীবন অন্যদিকে রিয়ালিজম যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে কবিতাগুলিতে। তবুও তো মানুষ স্বপ্ন দেখে —
“সামনে অনন্ত শূন্যতা
অথচ ধ্বংসের কিনারে বসে
সে রোজ স্বপ্ন দেখে।”
এই পজিটিভ এনার্জি তাঁর কবিতার সম্পদ।
সবশেষে আসছি কাব্যগ্রন্থের নামকরণ প্রসঙ্গে। প্রথম কবিতার অনুকরণে কবি এই কাব্যগ্রন্থের নামকরণ করেছেন “ঈশ্বরের নিকট ইতর”। অধ্যাপিকা ডক্টর কৃষ্ণা বসু বলেছেন —
“এই নামের মধ্যেও একটা চমক আছে, বিস্ময় আছে এবং ম্যাজিক আছে।”
হ্যাঁ আছে। এ ঈশ্বর স্বর্গে বসবাস করেন না, করেন বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে। মানুষের ভাবনায় এই ঈশ্বর যখনই মূর্ত হয়ে ধরা দেয় বাস্তবের অঙ্গনে, তখনই ঈশ্বরের সমস্ত ঐশীরূপ ভেঙে খানখান হয়ে যায়। মুখোশধারী ঈশ্বরের নিকট তখন কাম প্রার্থনা করতে আসে কাম গ্রস্ত ইতর।
কাব্যগ্রন্থ : “ঈশ্বরের নিকট ইতর”, কবি : সু-ব্রত (সুব্রত পাল), প্রকাশক : ‘এবং অধ্যায়’-এর ধীমান ব্রহ্মচারী, চ্যাটার্জি বাগান, চুঁচুড়া আর.এস., হুগলী-৭১২১০২, প্রচ্ছদ : অর্পণ, উৎসর্গ : যেসব মুহূর্তরা আমায় লেখায় এবং শেখায়, মূল্য : ২০০ টাকা মাত্র।
বাহ পড়ে মুগ্ধ হলাম
প্রকাশ করার জন্য ধন্যবাদ জানাই সম্পাদক মহাশয়কে।