“কারে বা কই কিসের কথা,কই যে দফে দফে, / গাছের পরে কাঁঠাল দেখে তেল মেখো না গোঁফে।”
সুকুমার রায় দফায় দফায় এই যে সুপরামর্শ দিয়েছেন, তাতে কি মালুম হয় না যে কাঁঠাল একটি গোলমেলে ফল? গ্রীষ্মেই আগমন কাঁঠালের — আম, জাম, লিচু, জামরুল প্রভৃতির সঙ্গেই। তবু সে যেন একটু দলছাড়া। কোনদিনই ফলের থালায় সে “হিরো” নয়। ভিলেন না হলেও বরাবরই সে পার্শ্বচরিত্রে।
সপ্তপদীর নায়িকার মতো কাঁঠাল বলে না, “আমাকে টাচ করবে না”। তার মনোভাব—,”টাচ করো, তবে বুঝে-শুনে, নিজের দায়িত্বে।” কেন বুঝেশুনে ‘টাচ’ করতে হবে, সে তো বাউলগানে প্রাঞ্জলভাবেই বলা হয়েছে,
“গোলেমালে গোলেমালে পিরিত কোরো না/ পিরীতি কাঁঠালের আঠা/ আঠা লাগলে পরে ছাড়বে না।”
সেইজন্যেই অতি সাবধানী গোঁফওয়ালা বাঙালী বাবু গাছে কাঁঠাল দেখলেই গোঁফে তেল দিতে শুরু করতেন!
এ দেশে কেরালা আর তামিলনাডুতে কাঁঠালকে “রাজ্য ফল” হিসেবে সম্মান দেওয়া হয়। আমরা বাঙালীরা কাঁঠালকে এইভাবে মাথায় করে রাখিনি ঠিকই, তবে আমাদের মধ্যে “পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙা”র ব্যাপারটা তো একটু -আধটু আছে। চেহারা-চরিত্র নিয়ে একটু সন্দেহ, একটু দ্বিধা থাকলেও, আমাদের ভোজনের পাত থেকে সাহিত্যের পাতা, মুখের গ্রাস থেকে মুখের কথা— সর্বত্রই তার আগ্রাসন।
উদাহরণ ? কলার নাম কাঁঠালী কলা, ফুলের নাম কাঁঠালী চাঁপা। কাঁঠালপ্রিয় বিভূতিভূষণের ‘দ্রবময়ীর কাশীবাস’ গল্পে দেখা যায় যে বিধবা দ্রব ঠাকরুণের ভিটেয় যে কয়টি গাছ ছিল, তার মধ্যে কাঁঠাল গাছও ছিল। সে গাছের নাম আবার খয়েরখাগী কাঁঠাল গাছ।

বন্দে মাতরম মন্ত্রের রচয়িতার জন্মস্থানেও কাঁঠাল ! তাই বোধহয় সাহিত্যসম্রাট কমলাকান্তকে বলতে প্ররোচিত করেছেন, — “আমাদের দেশের এক্ষণকার বড়োমানুষদিগের মনুষ্যজাতি মধ্যে কাঁটাল বলিয়া বোধ হয়। কতকগুলি খাসা খাজা কাঁটাল, কতকগুলি বড়ো আটা, কতকগুলি কেবল ভুতুড়িসার, গরুর খাদ্য। কতকগুলি ইঁচোড়ে পাকে, কতকগুলি কেবল ইঁচোড়েই থাকে, কখনো পাকে না।”
কাঁঠাল যখন তরুণ, অনভিজ্ঞ, তখন সে ইঁচোড় (বা এঁচোড়)। ‘ইঁচোড়ে পাকা’ ছেলে সকলেরই না-পসন্দ, কিন্তু জম্পেশ করে রান্না করা ইঁচোড় খাওয়ার পাতে কারোরই না-পসন্দ নয়। না-মাংসভূক খাদকরা আহ্লাদ করে ইঁচোড়কে ডাকেন গাছপাঁঠা।
কমলাকান্তের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় যে ইঁচোড় থেকে কাঁঠালে উত্তীর্ণ হওয়া মোটেও সহজ নয়। কেউ কেউ অবশ্য অতি উৎসাহে “কিলিয়ে কাঁঠাল পাকাবার” চেষ্টা করেন, কিন্তু সেটা খুব গোলমেলে প্রক্রিয়া। “শ্রীকান্ত”তে রামকমল ভটচায্যিমশায়ের খেদোক্তি মনে পড়ে? — “এই হারামজাদা বজ্জাতকে বাস্তে আমার গতর চূর্ণ হো গিয়া। খোট্টা শালারা ব্যাটারা আমাকে যেন কিলায়কে কাঁটাল পাকায় দিয়া!”
“কাঁঠালের আমসত্ত্ব”ও একটা জটিল ব্যাপার। প্রোফেসর শঙ্কু এদিকে একটু মনোযোগ দিলে কাঁঠালের আমসত্ত্ব এতদিনে অভিধানের পাতা থেকে ভোজনের পাতে এসে পড়ত। কাঁঠাল নিয়ে আরেকটি প্রবাদ আছে, সেটিও কাঁঠালের গোলমেলে চরিত্রই দেখিয়ে দেয়— “কাকে খায় কাঁঠাল, বকের মুখে আঠা”। কী কান্ড বলুন তো!
কমলাকান্ত যাকে গরুর খাদ্য বলেছেন, কাঁঠালের সেই ভুতুড়ি অবশ্য রবি ঠাকুরের বাঁশী কবিতায় স্থান পেয়েছে,
“বর্ষা ঘন ঘোর …/গলিটার কোণে কোণে জমে ওঠে পচে ওঠে/আমের খোসা ও আঁটি, কাঁঠালের ভূতি…।”
যেসব ভোজনরসিকজন কাঁঠালের কন্টকময় বর্ম ও ছলনাময় আঠা পেরিয়ে তার অন্দরমহলে প্রবেশ করেন, তাঁরাই পান কুরূপ কাঁঠালের অন্তরের কোষে কোষে সঞ্চিত মধুর রসের সন্ধান। অনেক কাঁঠাল-রসিক খাজা কাঁঠালের সঙ্গে ক্ষীরের যুগলবন্দী পছন্দ করেন। এই ব্যাপারে বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্ত চক্রবর্তীর বক্তব্য শুনুন, — “আমার বিবেচনায় কাঁটাল ভাঙ্গিয়া , উত্তম নির্জ্জল দুগ্ধের ক্ষীর প্রস্তুত করিয়া, কমলাকান্তের ন্যায় সুব্রাহ্মণকে ভোজন করানোই ভাল।”
কুদর্শন কাঁঠাল কবির কাছে কাব্যের প্রেরণা হতে পারে নি, তবু তারও এক কাব্যিক নাম আছে— পনস। কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল কাব্যে খুল্লনা যে সকল ভোজ্য পরিবেশন করেছিলেন তার মধ্যে শেষ পাতে ছিল, — “দধি পিঠা খাইল সবে মধুর পায়স,/রসাল পনস-কোষ রসালের রস।।”

কৃত্তিবাসের রামায়ণে পনস নামে শ্রীরামচন্দ্রের এক সেনাপতির উল্লেখ আছে, — “ঋষভ কুমুদ দেখ পনস সম্পাতি।/ নল নীল দেখ এই মুখ্য সেনাপতি।।”
বানর সেনাপতির নামটি কি বৃহৎবপু ফলটির সঙ্গে বপুর বিশালতার সাদৃশ্যে ? জানা নেই।
বর্তমান সুষম আহার ও পুষ্টি সচেতনতার যুগে পুষ্টিবিদরা কাঁঠালের পুষ্টিমূল্য নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমনকি কাঁঠালের বীচি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। ‘পথের পাঁচালী’র অপুর স্মৃতিতে ধরা ছিল যে তার “মা বসিয়া বসিয়া বেশ নিশ্চিন্তমনে কাঁঠালবীচি ধুইতেছে”। মা-ঠাকুমার হেঁসেলে ডালে ও তরকারিতে কাঁঠাল বীজের চাহিদা ছিল।
আটপৌরে বাঙালীর ঘরে যখন ‘ডাইনিং টেবল্’-এর উপস্থিতি ছিল না, মেঝেতে পিঁড়ি পেতে বসে খাওয়ার সেই যুগে পিঁড়িদের মধ্যে কৌলীন্য ছিল কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ির। সে পিঁড়ি নাকি এতই মজবুত, যে সাত প্রজন্ম ধরে তাতে বসে খেতে পারত।
“দিবা শেষে কিষাণ যখন আসত ফিরে,/ঘি মউ মউ আম কাঁঠালের পিঁড়িটিতে বসত তখন” ‘কোন এক গাঁয়ের বধূ’ কিষাণী যখন কিষাণকে সবখানি মন উজাড় করে কিছু বলত, সেই রোম্যান্টিক দৃশ্যেও কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি।
তবু, ফলের পংক্তিতে কাঁঠাল যেন কিছুটা অপাংক্তেয় রয়ে গেছে, আধুনিক পরিভাষায় ‘সাব-অলটার্ন’। হয়তো কিছুটা তার রূপহীনতার জন্য, কিছুটা তার চড়া গন্ধের জন্যে। একদল তার গন্ধ সহ্য করতেই পারেন না, আর অপর দল তার সৌরভেই আকৃষ্ট হন।
পরিশেষে বলি বাঙালি পাঁঠারা (অবাঙালী পাঁঠাদের ব্যাপারে বলতে পারব না) কাঁঠালপাতা খেতে বড়ো পছন্দ করে। আর বিভিন্ন কাহিনী থেকে জানা যায় যে — শিয়ালরাও কাঁঠাল খেতে খুব পছন্দ করে, তবে তারা গোঁফে তেল দেয় কিনা জানা যায় নি।