নদিয়া জেলার বগুলার সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে স্বপ্নদীপ কুণ্ডু। বগুলা হাইস্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রটি উচ্চমাধ্যমিকে ৭৮ শতাংশ নম্বর পেয়ে ভর্তি হয়েছিলেন বগুলা শ্রীকৃষ্ণ কলেজে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে। স্বপ্নদীপ বিজ্ঞান নিয়ে পড়লেও বাংলা সাহিত্যের প্রতি ছিল গভীর টান। তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ার সুযোগ পেয়ে বগুলা থেকে চলে এসেছিলেন। কেবল লেখাপড়াই নয় ক্যুইজ থেকে শুরু করে প্রবন্ধ লেখা, সব কিছুতেই স্বপ্নদীপ তাঁর মেধা বুদ্ধির সাক্ষর রেখেছিলেন, পেয়েছিলেন বহু পুরস্কার। স্বপ্নদীপের বাবা রামপ্রসাদ কুণ্ডু কাজ করেন কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে আর মা স্বপ্না কুণ্ডু আশা কর্মী। বাংলা সাহিত্যকে ভালবেসে যে ছাত্রটি জেলার কলেজ ছেড়ে কলকাতার অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলেন, পরিবারের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে স্বেচ্ছায় হস্টেল জীবন বেছে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র নিজের পছন্দের বিষয় পড়তে পারবেন বলে। কিন্তু মাত্র কয়েকটি দিন যেতে না যেতেই বাংলা সাহিত্য নিয়ে স্বপ্ন দেখা স্বপ্নদীপ অকালে ঝরে গেলেন। ‘এলিট’ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমদিন ক্লাস করে স্বপ্নদীপ বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছিলেন তাঁর ভাল লেগেছে। কিন্তু দ্বিতীয় দিন আর তাঁর ক্লাসে যাওয়া হল না, পরিবর্তে তাঁর রক্তাত্ত দেহ গেল হাসপাতাল সেখান থেকে মর্গে। কত আশা নিয়ে স্বপ্নদীপের মা বাবা ছেলেকে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু ছেলে যে আর ফিরবে না।
গত বুধবার রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র স্বপ্নদীপ কুণ্ডুর দেহ উদ্ধার করা হয় হস্টেলের এ-২ ব্লকের নীচ থেকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় এবং তাঁর দেহ ছিল রক্তাত্ত। তাঁকে ভর্তি করা হয় কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, সেখানেই বৃহস্পতিবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর থেকেই ফের খবরের শিরোনামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। যাদবপুর থানার পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন পড়ুয়া জানান, টানা তিনদিন ধরে হস্টেলে স্বপ্নদীপকে সমকামী বলে হেনস্থা করা হচ্ছিল, তাঁকে উলঙ্গ হয়ে হস্টেলের ব্যালকনিতে ঘোরানো হয় এবং বিবস্ত্র অবস্থায় তাঁকে নাচতেও বাধ্য করা হয়, এ ছাড়াও তাঁকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়। স্বপ্নদীপের মা বাবা জানান, বুধবার রাতে সে তাঁর মাকেও ফোন করে নিজের অসহায়তার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘খুব ভয় করছে”, খুব তাড়াতাড়ি তাঁদের আসতে বলেছিলেন, পরের দিন বাড়ি ফেরার কথাও জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।
এবার দেখা যাক যে অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়বেন বলে স্বপ্নদীপ বিজ্ঞান বিভাগ ছেড়ে বগুলা থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন সেই গৌরবময় প্রতিষ্ঠানের ১৭২ বিঘা জমির বু্কে প্রতিনিয়ত কি ঘটে চলেছে। প্রতিদিন সকালে সাফাইকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ ও নানা জায়গা পরিস্কার করার সময় বস্তাবন্দী করেন গুচ্ছ গুচ্ছ মদের বোতল। কোনওদিন এক বস্তা, কোনওদিন দুই বা তিন বস্তাও হয়। বিশাল ক্যাম্পাস সাফসুতরো করতে করতে জলের বোতলের সঙ্গে ওই মদের বোতলও খুঁজে পান সাফাই কর্মীরা। এই সব বোতল আগের রাতের অন্ধকারের মেহফিলের আবর্জনা। প্রতিদিন রাতেই ক্যাম্পাসের মধ্যে নেশার আসর বসে। গাঁজা, চরস তো দিনের বেলা থেকেই শুরু হয়ে যায়। কিন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কারা প্রতি রাতে মদের আসর বসায়, তারা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, নাকি বহিরাগত? বিশ্ববিদ্যালয়ে তো একাধিক নিরাপত্তারক্ষী রয়েছেন, প্রশাসন কি এসবের কিছুই জানেন না? পাঁচতারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিতর প্রতিদিন-রাতে গাঁজা, চরস, মদ চলছে অগাধে অবাধে অথচ তা রোখার কোনও ব্যবস্থা নেই? নাকি এটাই এলিট বিশ্ববিদ্যালয়ের দস্তুর?
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের থেকেই জানা যাচ্ছে, ‘ইন্ট্রোডাকশনের’ নাম করে হোস্টেলে বহু বছর ধরে চলছে র্যাগিং। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হোস্টেলে যা ‘ইন্ট্রো’ নামে পরিচিত। ইন্ট্রো-র নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিরাতে খাওয়া দাওয়ার পর ঘড়ির কাঁটা যখন ১১টা বা ১২টা ছুঁলে হোস্টেল ঘরের প্রত্যেকটি দরজায় ধাক্কা দিতে হয়। সেই সময় শিক্ষার্থীদের নামমাত্র পোশাক পরে থাকতে হয়। সিনিয়র ছাত্ররা দরজা খোলার পর গড়গড় করে কয়েকটি বিষয় মুখস্থ বলে যেতে হয়। কী কী বলতে হবে, তারও একটা নির্দিষ্ট ফরম্যাট আছে। সেই ফরম্যাট অনুসারে নিজের নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের যৌনমিলনের তারিখ, শিক্ষাগত যোগ্যতা বলতে হয়। এখানেই রেহাই মেলে না। নিজের শারীরিক গঠন কেমন তারও বিস্তারিত বর্ণনা দিতে হয়। এই সময় যদি কারও মুখ ফসকে ইংরেজি শব্দ বেরেলেই তার ওপর চলে শারীরিক অত্যাচার। যেমন, দরজার খিল দিয়ে হাঁটুতে প্রহার নয়তো কান ধরে উঠবোস ইত্যাদি। কতৃকপক্ষ কি এসব কিছুই জানেন না? বহুবার জানানোর পরও তারা কোনও রকম পদক্ষেপ নেননি। তাহলে স্বপ্নদীপ কুণ্ডুর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে?