‘নবম শতাব্দী পর্যন্ত হিন্দু সমাজ বিদেশীকে নিজের অঙ্গ করিয়া লইত, আর তাঁহাকে নিজের ধর্মে আনিয়া নৈতিক নবজীবন দান করিত’। দেশে ইসলামের আবির্ভাবের পরে হিন্দু সমাজের গ্রহণ ক্ষমতা ব্যাহত হয়’ [গ্রন্থ পরিচয় ও সমালোচনা, ‘প্রতাপ সিংহ’]
যদুনাথ সরকার ১৯০৪-এ রবীন্দ্রনাথ, নিবেদিতা, জগদীশচন্দ্র-অবলা-আনন্দমোহনের সঙ্গে বৌদ্ধ গয়া ভ্রমণে যান। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সখ্য। রবীন্দ্রনাথের বহু সাহিত্য অনুবাদ মডার্ন রিভিউতে প্রকাশের ভগীরথ তিনি। সোনার তরী নিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় আক্রমণাত্মক প্রবন্ধ লিখলে যদুনাথ রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কলম ধরেছেন।
সখ্য গভীর হলে কবি তাঁকে শান্তিনিকেতনে আহ্বান জানান। রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারত বিষয়ে ১০০টি ম্যাজিক ল্যান্টার্ন স্লাইড উপহার দেন। যদুনাথ শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের সামনে ইতিহাস বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। ঐতিহাসিক সরদেশাই-এর পুত্র শ্যামাকান্তকে শান্তিনিকেতনে পড়তে প্রস্তাব পাঠান। নোবেল পাওয়ার কাছাকাছি সময়ে প্রকাশ করেছেন বেশ কিছু গল্প কবিতা অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথ ‘হোম ইউনিভার্সিটি সিরিজ’ এবং ‘কেম্ব্রিজ ম্যামালস অব সায়েন্স এন্ড লিটারেচার’ সিরিজের আদর্শে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার কিছু বই বাংলায় সর্বজনবোধ্য করে ‘বিশ্ববিদ্যা সংগ্রহ’ গ্রন্থমালার পরিকল্পনা করলে যদুনাথ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ১৩৪২-এর ১৩ আষাঢ় যদুনাথের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে কবি, কালিদাস নাগ আলোচনা করে ‘বিশ্ববিদ্যা সংগ্রহ পুস্তকমালা’ প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিছু দিন পরে প্রবাসীতে যদুনাথ বিষয়টা ‘বিশ্ববিদ্যা সংগ্রহ’ প্রবন্ধে বিশদে আলোচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ হলেন প্রধান সম্পাদক, উপদেষ্টা এবং কার্যনির্বাহক।
যদুনাথ ১৯১৯-১৯২৩-এ কটকের র্যাভেনশ কলেজে, সে সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিশ্বভারতীর পরিচালন সমিতির সভ্য করতে চেয়েছিলেন। তিনি দুটো কারনে রাজি হন নি ১। দূরত্ব; ২। যদুনাথ শান্তিনিকতনকে বিদ্যালয় হিসেবে গণ্য করেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নয়। যদুনাথের মনে হয়েছিল শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পদ্ধতির উপযোগিতায় আস্থা পেশ করে শান্তিনিকেতনকে উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে মান্যতা দিতে অস্বীকার করেন — কারন তারা ‘এক্সাক্ট নলেজ ও ইন্টালেকচুয়াল ডিসিপ্লিনকে ঘৃণা এবং উহার শিক্ষক এবং সেবকগণকে হৃদয়হীন, শুষ্কমস্তিষ্ক, বিশ্ব মানবের শত্রু, মেকি পণ্ডিত বলিয়া উপহাস করে’। তাদের [শিক্ষার্থী] শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘আমার কর্মের প্রতি আপনার এমন অবজ্ঞা মিশ্রিত অশ্রদ্ধার তীব্রতায় আমি নিরতিশয় ব্যথিত হইয়াছি। …বিশ্বভারতীর সঙ্কল্প মাথায় লইয়া ভারতবর্ষে যখন ফিরলাম তখন সহায়তার জন্যে সর্ব্বপ্রথম আপনাকেই সন্ধান করিয়াছিলাম। কিন্তু যখন আপনি বিশ্বভারতীর সঙ্গে আপনার নাম আপনি সংযুক্ত রাখিতে চান না তখন তাহা প্রত্যাহার করিব; তৎসত্ত্বেও ভাবুক বলিয়া আপনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করিলেও সত্যসাধক বলিয়া শেষ পর্য্যন্ত আপনার প্রতীক্ষা করিব’। এ সম্বন্ধে বিশদে জানতে নিচের সূত্র দেখুন
এই লেখাটি তৈরি করলাম নিখিলেশ গুহ এবং রাজনারায়ণ পাল সম্পাদিত ‘যদুনাথ সরকার রচনা সম্ভার’-এর ভূমিকা ত্রিশ থেকে তেত্রিশ পাতার তথ্য অবলম্বনে। আমার খটকা লিখে রাখি —
১] ১৯২০-র দশকে রাভেনশয় চাকরির সময় কবির আহ্বান যদুনাথ প্রত্যাখ্যান করেন — এবং দুজনের শিক্ষা চিন্তায় তীব্র মতানৈক্য দেখতে পাই; কিন্তু বিশ্ববিদ্যা সংগ্রহ সিরিজের বৈঠক হচ্ছে ১৯৩০-এর দশকের মাঝে (১৩৪২ বঙ্গাব্দ);
২] এত মতপার্থক্যের প্রায় এক দশক পরে বিশ্ববিদ্যা সংগ্রহ পরিকল্পনা বিষয়ে বৈঠক করেও সেখান থেকে যদুনাথ সরে গেলেন কেন, তার কোনও সদুত্তর পাই নি।
ছবি বিদ্যাসাগর স্মৃতিভবন উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে দুজনে