যদুনাথ সরকার মানুষ হিসেবে দারুণ সেটা দীপেশ চক্রবর্তী তাঁর বিশাল বইতে বারবার বলেছেন — বহু ফ্যাসিস্ট মানুষ ব্যক্তি মানুষ হিসেবে কথা বলার জন্যে অসাধারণ। এবং কলাবতী মুদ্রার প্রকাশনার কাজে আসার আগের অনুবাদক হিসেবে যদুনাথ সরকারের কাজকর্ম নিয়ে আমার ভালই অভিজ্ঞতা হল। তাঁর দুটো বই অনুবাদ করেছি। ফলে তাঁর লেখা প্রচুর পড়েছি। মীরজুমলা অনুবাদ কররার সময় দেখেছি যেভাবে ভূমিকা লিখতে গিয়ে জগদীশ নারায়ণ সরকারের পিঠ চাপড়ে বলেছেন এটা আমার লেখা থেকেও অনেক ভাল ইত্যাদি। সে সব অসামান্য মানবতার লক্ষ্মণ।
কিন্তু আমরা যখন ইতিহাস পড়ব তখন স্পষ্ট পক্ষ বাছতে হবে। আমরা গত বছর যখন ব্যান হওয়া আবাল বাঙ্গালির জ্ঞানচর্চা শুরু করছি, দু-চারজন উচ্চ-পড়াশোনাওয়ালা আইটিভাইটি এসে যদুনাথের মহত্ব নিয়ে জ্ঞান দিতে গিসল, হকার কারিগর চাষীদের পক্ষ থেকে ঝেড়ে কাপড় পরিয়ে কান ধরে বার করে দিয়েছি। যদুনাথবাবু ঔপনিবেশিকতাকে, জাতিরাষ্ট্রের ধারণাকে তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন যেহেতু তার বায়াস ছিল সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশের অন্যতম নাটবল্টু উইলিয়াম আরভিং-এর প্রতি (মুঘল এডমিনিস্ট্রেশনের অনেকগুলো সংস্করণ পড়লে এই পক্ষপাতটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হুবে)। যদুনাথ তার গুরুর মতে নিদারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি স্টেটিস্ট ছিলেন সময়ের দাবি অনুসরণ করে, এবং সেটা হরপ্রসাদ, নীহারবাবু বা নরেন্দ্রকৃষ্ণও ছিলেন। কিন্তু যদুনাথবাবু গুরুকে অনুসরণ করে আইনি-আকবরিকে উদুম খিস্তি করেছেন, আওরঙ্গজেবকে ভিলেন ঠাউরছেন। নরেন্দ্রকৃষ্ণ বা হরপ্রসাদ অন্তত ওর মত ছদ্ম-সাম্প্রদায়িক ছিলন না। ভারত ইতিহাসে স্যর যদুনাথের এই কাজের রেট্রোস্পেক্টিভ ফল হয়েছে মারাত্মক। তার ফল সঙ্ঘীরা তুলেছে। সমস্যা সেখানে।

সিরিয়াস ভাবে ব্রিটিশপূর্ব সময় বা প্রথমদিককার ঔপনিবেশিক সময় নিয়ে গত দু-দশকে অসামান্য সব কাজ হচ্ছে বিশেষ করে ইটনের কাজটা মাইলফলক। তাঁরও আগে সুশীল চৌধুরী গত দু-দশক ধরে সুপ্রিয়া গান্ধী, ওমর ফারুকি, অড্রে ট্রুস্কে, রাজীব কিনরা, কপিল রাজ, বীণা তলোয়ার, রুবি লাল, প্রসন্নন পার্থসারথী, সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম, বার্নার্ড কোহন (তিনি অনেক আগেই) এবং আরও অনেকে ভারত ইতিহাস দেখার দৃষ্টিভঙ্গী পালটে দিয়ছেন। অনেকের নাম চটজলদি মনে পড়ল না।
কিন্তু এক সময় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সত্যিই একটা বদ্ধ-ঔপনিবেশিক সময় গিয়েছে দক্ষিণ এশিয় জ্ঞানচর্চায় — আজও কেটেছে কী না জানি না। যুদ্ধ, পুঁজিবাদ বা মার্কেন্টিলিজম এবং তাদের থেকে উদ্ভব হওয়া লুঠেরা জাতিরাষ্ট্রের বিকাশে ইতিহাস ঔপনিবেশিক নৃতত্ত্ব, বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্বের ভূমিকা অল্প নয় এবং সেই জ্ঞানচর্চার ধারকদের ভূমিকাও ফেলে দেওয়ার মত নয়।
গৌতম ভদ্র বা দীপেশ চক্রবর্তী (তাঁর ছুতো আমি ঐতিহাসিক নই) উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন যদুবাবুর সাম্প্রদায়িক এবং সাম্রাজ্যপক্ষীয় বয়ান এবং অবস্থান। গত বছরের এই সময়ের দেশ পড়ে দেখবেন গৌতম ভদ্রের লেখাটায় যদুনাথবাবুর সম্বন্ধে বিন্দুমাত্রও সমালোচনা নেই — সত্যিই নেই — এবং সত্য সত্য চোখ কচলে কচলে লেখাটা পড়েছি! খুবই হতাশ। গোটা সাবঅল্টার্ন দলের মধ্যে একমাত্র গৌতমবাবুই কিছুটা ব্যতিক্রম বলে আমার মনে হয়েছিল তার কিছু বাংলা লেখায় — সেখানেও নানান ঔপনিবেশিকতার রেশ আছে — অসামান্য ইমান ও নিশান কেউ গভীরে পড়ে দেখবেন।
তবু অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে দীপ জ্বালিয়ে যেতেই হবে, প্রশ্ন করে যেতেই হবে, কাজ করে যেতেই হবে এটাই অভদ্রলোকেদের জ্ঞানচর্চার শিক্ষা।
উপনিবেশ বিরোধী চর্চা দীর্ঘজীবি হোক।