‘কৃষ্ণনগরের একটিই পুজো জগদ্ধাত্রী’ —কৃষ্ণনগরের মানুষদের মুখে এই কথাটি শুনলে অবাক হবেন না যেন! আসলে জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণনগরে যে ধরনের উন্মাদনা দেখতে পাওয়া যায়, তার সাথে কারো তুলনা করা চলে না। কৃষ্ণনগরের অনেক মানুষই সরপুরিয়া সরভাজা, ঘূর্ণির মৃৎশিল্প, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রামতনু লাহিড়ী, সুধীর চক্রবর্তীর পাশাপাশি জগদ্ধাত্রী পুজো সম্পর্কেও বেশ শ্লাঘা অনুভব করেন। তবে এ কথাটিও ঠিক যে জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে এই উন্মাদনার বয়স খুব বেশি নয়। আজ থেকে ৫০ বছর আগে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর উন্মাদনা এমন মোটেও ছিল না। শহরের বয়োবৃদ্ধরা বলেন, তখন উন্মাদনা কীভাবে থাকবে, মানুষের হাতে এতো পয়সাই তো ছিল না! বাস্তবে জগদ্ধাত্রী পুজোর বয়স কত? কতদিন ধরে এই পুজো কৃষ্ণনগরে হচ্ছে? কেইবা এর প্রবর্তক?— এরকম হাজারো প্রশ্ন জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খায়। কিন্তু যথাযথ উত্তর এখনো অধরা।

প্রচলিত একটি মত হল— বাংলায় প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হয় কৃষ্ণনগরে, আর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের আমলে (১৭২৮-১৭৮২ খ্রি.) সেই জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা। আবার কেউ কেউ জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রবর্তক হিসেবে কৃষ্ণচন্দ্রের উত্তর পুরুষ মহারাজা গিরিশচন্দ্র রায়ের (১৮০২-১৮৪১ খ্রি.) কথা বলে থাকেন। কিন্তু আমার মনে হয় এই বিষয়গুলি নিয়ে আরো গভীর অনুসন্ধান, গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, সেই সকল হালকা চটকদার লেখাগুলি থেকে যেগুলি দুই মলাটে প্রকাশ পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অল্প সময়ে পরিপূর্ণ গবেষণা ছাড়াই প্রকাশিত হওয়ায় শুধুমাত্র ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাচ্ছে এবং পাঠকদের বিভ্রান্ত করছে। যাইহোক, জগদ্ধাত্রীর উৎস অনুসন্ধান যেহেতু এই প্রতিবেদনটির বিষয় নয়, সেহেতু আমরা এবারে মূল আলোচনায় অর্থাৎ জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রস্তুতি পর্বে প্রবেশ করি।

প্রতিবছর জগদ্ধাত্রী পুজো সময় কৃষ্ণনগরের চেহারা পাল্টে যায়। পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই চলে প্রস্তুতি। কৃষ্ণনগরের সবথেকে বড় ঐতিহ্যমন্ডিত উৎসব বলে কথা। জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় কৃষ্ণনগরে পর্যটকদের ঢল নামে। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষেরা কৃষ্ণনগরে আসেন। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে মিডিয়ার কভারেজ কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোকে আরও যেন প্রসারিত করেছে। একাধিক সংস্থার পক্ষ থেকে একাধিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। শ্রেষ্ঠ প্রতিমা থেকে শুরু করে শ্রেষ্ঠ মণ্ডপসজ্জা, শ্রেষ্ঠ প্রতিমা সজ্জা, শ্রেষ্ঠ আলোকসজ্জা আরও কত কী! বিগত বছরে জগদ্ধাত্রী পুজোতে এমনও হয়েছে যে, কোনো কোনো সংস্থা শ্রেষ্ঠ পরিবেশবান্ধব পুজোকে বেছে নিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় শহরময় বিজ্ঞাপনী প্রচার দেখতে পাওয়া যায়। কৃষ্ণনগরের পুজো কমিটিগুলি বড় বড় ব্র্যান্ড, কোম্পানির থেকে অনেক সময় স্পন্সরশিপ পায়। আবার, উৎসব উন্মাদনার পাশাপাশি আসে রাশি রাশি আবর্জনা, যদিও উৎসবের কটা দিন সেদিকে কারো নজর থাকে না। জগদ্ধাত্রী পুজো শেষ হলে সেই আবর্জনার চেহারা ফুটে ওঠে। উৎসব অনুষ্ঠানে মাতোয়ারা হয়ে শহরবাসী এবং বহিরাগত পর্যটকেরা পুজোর কটা দিনে কৃষ্ণনগর শহরের আবর্জনা বহুগুণ বৃদ্ধি করে। কৃষ্ণনগরের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে জলঙ্গী নদী, সেটিও যথেষ্ট দূষিত হয়।

এক দশকের অধিক কাল হয়ে গেছে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর উদ্যোক্তারা তাদের প্যান্ডেল গড়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিষয় ভাবনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সেগুলিকে দর্শকদের সামনে তুলে ধরছেন। চলতি কথায় এই পুজোগুলিকে ‘থিমের পুজো’ বলা হয়। কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর মণ্ডপসজ্জায় তাই ফি-বছর নিত্য নতুন বিষয় ভাবনা দেখতে পাওয়া যায়। ২০২২ সালও ব্যতিক্রম নয়। আবার কিছু সাবেক পুজোও রয়েছে, যেখানে ‘থিম’ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন— কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ঐতিহ্যমন্ডিত জগদ্ধাত্রী পুজো, চাষাপাড়া বারোয়ারির বুড়িমা, নুড়ি পাড়া বারোয়ারি, মালোপাড়া বারোয়ারি প্রভৃতি, এছাড়া পারিবারিক কিছু সাবেক জগদ্ধাত্রী পুজোর কথাও এ প্রসঙ্গে বলা যায়। চাষাপাড়া বারোয়ারির বুড়িমার পুজো ২০২২ সালে বিশেষভাবে করা হচ্ছে। কারণ পুজো উদ্যোক্তাদের দাবী এ বছর তাদের পুজো ২৫০ বছরে পদার্পণ করল। তাই এ বছর বুড়িমাকে সর্বোচ্চ পরিমাণ গয়নায় সাজানো হবে। মাকে সাত কেজি সোনার গয়না পরানো হবে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। এছাড়া বেশ কয়েক কেজি রুপোর গয়না তো থাকছেই।

২০২২ সালে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর মণ্ডপসজ্জায় বিভিন্ন ক্লাব বিভিন্ন রকম ভাবে চমক দিতে প্রস্তুত। ঐতিহাসিক বিষয় থেকে শুরু করে পরিবেশ প্রকৃতি, জীবজন্তু, লোকসংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা, গ্রাম বাংলা, চলচ্চিত্র, কুটির শিল্প, কার্টুন ও কার্টুনিস্ট প্রভৃতি একাধিক বিষয় জগদ্ধাত্রী পুজোর মণ্ডপসজ্জায় এবার দেখা যাবে। সাম্প্রতিক কিছু বিষয় নিয়েও মণ্ডপসজ্জা দেখতে পাওয়া যাবে। কৃষ্ণনগরের ক্লাব, বারোয়ারিগুলি ২০২২ সালে তাদের জগদ্ধাত্রী পুজোর মণ্ডপসজ্জার যে বিষয় ভাবনার কথা ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, সেগুলি হল— নগেন্দ্রনগরের যুবগোষ্ঠী (যুব মাতা) : জারোয়ার দেশ আন্দামান, পাত্রবাজার স্বীকৃতি ক্লাব : স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবের বিষয়টি মাথায় রেখে দিল্লীর লালকেল্লার আদলে প্যান্ডেল সঙ্গে লাইট এবং সাউন্ড শো, প্রভাত সংঘ (মা শেরাবালী) : পুরীর জগন্নাথ মন্দির (বিশেষ আকর্ষণ হল মায়ের গায়ে বাদামের সাজ), ক্লাব প্রতিভা (সন্ধ্যারামনগর) : বিশ্বের সবথেকে বড় জগদ্ধাত্রী (প্রায় একান্ন ফুট উচ্চতার জগদ্ধাত্রী প্রতিমা), রাধানগর অন্নপূর্ণা সরণী (অন্ন মাতা) : সিকিমের রাভাংলা বুদ্ধ পার্ক (বিশেষ আকর্ষণ ৬০ ফুট উচ্চ বুদ্ধ মুর্তি), রাধানগর আদি বারোয়ারি (সেরা মা) : তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরের আদি যোগী (এছাড়া বিশেষ লাইট এবং সাউন্ড প্রদর্শনী), আমিন বাজার বারোয়ারি (মিষ্টি মা) : পুণের স্বামী নারায়ণ মন্দিরের আদলে ৮০ ফুট উচ্চ মণ্ডপ, কালীনগর রেনবো ক্লাব : দক্ষিণ সিকিমের নামচির চারধাম, পল্লীশ্রী বারোয়ারি : সত্যযুগ (মহারাজা তোমারে সেলাম), রাজারোড ষষ্ঠীতলা বারোয়ারি (রাজ মাতা) : প্রজাপতির দেশে, ষষ্ঠীতলা বারোয়ারি : মহারাষ্ট্রের আদিবাসী শিল্পকলা ও সংস্কৃতি, পালকি (জগৎ মাতা) : সহজ পাঠ, ক্লাব রেনেসাঁস : শিবালয়।

শক্তিনগর এম এন বি ক্লাব : আগ্রাদুর্গ (৫০ ফুট উচ্চ ও ৯০ ফুট চওড়া থিম), রাধানগর নতুন বারোয়ারি (কৃষ্ণ মাতা) : গুজরাটের স্বামী নারায়ণ মন্দির, নতুন সড়ক ষষ্ঠীতলা বারোয়ারি (হৈমন্তী মাতা) : ইন্ডিয়া গেট, রায়পাড়া মালিপাড়া বারোয়ারি : রাধাকৃষ্ণের নাট মন্দির, মালিপাড়া ইন্দিরাপল্লী বারোয়ারি (গরীবের মা) : কয়লা খনি, হাতার পাড়া বারোয়ারি (মা মধ্যমণি) : দুয়ারে বদ্রীনাথ, ক্লাব অনন্যা : রোমের থ্রেভি ফাউন্টেন, এম জি রোড বারোয়ারি (রাজেশ্বরী মাতা) : আসামের কৈলাসনাথ মন্দির, বৌবাজার বারোয়ারি (মা মাহেশ্বরী) : যা পাখি উড়তে দিলাম তোকে, বাগদীপাড়া বারোয়ারি : শিশু সাহিত্যশিল্পী ও কার্টুনিস্ট নারায়ণ দেবনাথকে শ্রদ্ধার্ঘ্য, কালীনগরের ক্লাব আমরা সবাই (রাজেশ্বরী মাতা) : এক টুকরো আমাজন, ক্লাব মাদল : যুগান্তর, প্রীতি সম্মিলনী : মাটির টানে, মায়ের ঘরে, কংক্রিটের এই শহরে, এক টুকরো বাংলা গ্রাম, ক্লাব রয়্যাল : বাদ্যযন্ত্র সামগ্রী, ছুতোর পাড়া বারোয়ারি : এক টুকরো গ্রাম বাংলা, কর্মকার বাড়ি : যাপনচিত্র, রাজদূত ক্লাব (রাজ মাতা) : ভূতের রাজা, কাপড়ের পটি বারোয়ারি (নরসিংহী মা) : ভারততীর্থ, রাধানগর শিবমন্দির বারোয়ারি (শিব মাতা) : পরীর দেশে, দর্জিপাড়া বারোয়ারি : বারো মাসে তেরো পার্বণ, চৌধুরীপাড়া বারোয়ারি : বাংলার লোকশিল্প, শক্তিনগর পাঁচমাথা মোড় বারোয়ারি : গ্রাম বাংলার দৃশ্য, গোলাপটি বারোয়ারি : আনন্দ, ক্লাব বন্ধুরা : মিডিয়া — প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, ডিজিটাল, কলেজ স্ট্রীট বারোয়ারি (মেজো মা) : উদযাপন, চকের পাড়া বারোয়ারি (আদি মা) : নিরুদ্দেশের খোঁজে (বিশেষ আকর্ষণ লাইটিং-এ থিম আলোয় ভুবন ভরা), গোয়াড়ী বালকেশ্বরী বারোয়ারি (বালকেশ্বরী মাতা) : পথের পাঁচালী, অঞ্জনা পাড়া বারোয়ারি : মায়ের পেটে মা, ক্লাব পারিবারিক : পরিবেশ বাঁচলে মানব সভ্যতা বাঁচবে, গড়াইপাড়া বারোয়ারি : গ্রামীণ শিল্পকলা।

কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো সম্পর্কে আলোচনা করার সময় ঘূর্ণীর কথা আসবেই। কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণী যে মৃৎশিল্পের জন্য জগৎবিখ্যাত সে কথা সকলেই জানেন। ঘূর্ণীর জগদ্ধাত্রী প্রতিমাগুলিরও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ঘূর্ণীর পুজোগুলি দেখার জন্য দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ থাকে। মণ্ডপসজ্জাতেও থাকে বিশেষ চমক। ২০২২ সালের পুজোতেও তারা বিষয় ভাবনায় বৈচিত্র্য এনেছেন, যেমন— ঘূর্ণী দাসপাড়া বারোয়ারি : ২৫৩ বছরের পুরোনো ফাঁসির মঞ্চ, ঘূর্ণী তুফান সংঘ (দেবী মা) : প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, ঘূর্ণী আনন্দনগর বারোয়ারি (আনন্দ মাতা) : বদ্রীনাথের বদ্রী বিশাল মন্দির, ঘূর্ণী ভাই ভাই ক্লাব (সেরা মা) : মানি হেইয়েস্ট (ব্যাঙ্ক অফ স্পেন), ঘূর্ণী নবারুণ সংঘ (মা নবারুণেশ্বরী) : আলোকচিত্রসহ প্লাইউডের ৪০ ফুট উচ্চ ২৭ ফুট চওড়া দিল্লীর ইন্ডিয়া গেট সঙ্গে নেতাজীর মূর্তি, ঘূর্ণী শরৎ স্মৃতি সংঘ (শরৎ মাতা) : কুলো, চাটাইয়ের মন্ডপসজ্জা ও সাথে বুলনের সাজে প্রতিমাসজ্জা, ঘূর্ণী আদি ঘরামী পাড়া বারোয়ারি (চন্দ্রমাতা) : নো ওয়াটার নো লাইফ, ঘূর্ণী শিবতলা বারোয়ারি (সুন্দরী মা) : ফিরে দেখা শৈশব, ঘূর্ণী বিন্দুপাড়া বারোয়ারি (চন্দ্রমাতা) : মৎস্য কন্যা, ঘূর্ণী স্মৃতি সংঘ (স্মৃতি মাতা) : ধর্ম নিরপেক্ষ পৃথিবী। আগামী বছরগুলিতে জগদ্ধাত্রী পুজোর দর্শনার্থীদের জন্য আরো হাজারো চমক অপেক্ষা করছে। এভাবেই কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো তার ঐতিহ্য এবং উন্মাদনাকে সঙ্গী করে এগিয়ে চলেছে। চরৈবেতি! চরৈবেতি!
লেখক: অধ্যাপক, চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়, নদিয়া।
লেখাটি পড়ার পর জগদ্ধাত্রী পুজোর প্যান্ডেলগুলি দেখতে আরো আগ্রহ জাগছে।
লেখাটির মাধ্যমে অজানা অনেক ইতিহাস জানা গেলো ???? কৃষ্ণনগরে ঐতিহ্যময়ী জগদ্ধাত্রী পূজা ।