মৃত্যুপর পরে কোন লেখক কতদিন বেঁচে থাকবেন কি আদৌ থাকবেন না, পরবর্তী যুগে কার পুনরুত্থান ঘটবে কিংবা ঘটবে না, সমকালের মানুষের পক্ষে তা অনুমান করা শক্ত। সেকালে বহু আলোচিত ও বিতর্কিত লেখক জগদীশ গুপ্ত সম্পর্কেও সেদিন কোন মীমাংসা হয়নি। অর্থ-যশ-জনপ্রিয়তা কোনটাই তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। অনেকেই তাঁকে ভুল বুঝেছেন। কাল এবং মানুষ উভয়েই নিরবধি, কিন্তু তাদের কেউই নিরন্তর একমাত্রায় চলে না। কালের পালাবদল হয়, মানুষেরও — মানুষের জীবনদর্শন ও মূল্যবোধ কোণ বদলায়, ভাঙে গড়ে। উঁচুনিচু জনভূমির মধ্য দিয়ে বহতা সাহিত্যেও দিক বদলায়, বাঁক নেয়, লয় পালটায়। তবু ইতিহাসের মাইল স্টোনের মত কোন কোন কবি লেখক তাঁদের সফলতা-বিফলতা নিয়ে নথিচিহ্নের মত থেকে যান।
জগদীশ গুপ্ত সেইভাবেই থেকে গেছেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে। দুই শতাব্দী ছুঁয়ে, দুটি বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিমুখী জাতীয় আন্দোলন, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, দাঙ্গা, স্বাধীনতা, জনসমুদ্র মন্থনের হলাহল — ইত্যাদি ঘটনার তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী। লক্ষ্যহীন অপব্যয়, বিশৃঙ্খল ছন্নছাড়া প্রয়াস কোনো কোনো প্রতিভাকে শেষপর্যন্ত তুঙ্গগামী হতে দেয় না। তার সমূহ সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে। ব্যক্তি স্বভাবের অগৃহিণীপনা এবং পারিপার্শ্বিক অরাজকতা প্রতিভার ফলিত চরিত্রকে মহতী বিনষ্টির দিকে নিয়ে যায়। জগদীশ গুপ্তের প্রতিভাও এরকমই এক নিয়তির শিকার, এক অবিকল্প ট্র্যাজেডি। কথাশিল্পীর দৈবিক-দুর্লভ ক্ষমতা নিয়ে জন্মালেও এক আয়ুক্ষয়ী আত্মঘাত জগদীশবাবুকে কালোত্তীর্ণ হতে দেয়নি। তাঁর আজন্মের জীবনসংস্কার, বিষয়নিরাসক্তি এবং নিরাকাঙ্ক্ষ ঔদাসীন্য তাঁকে বৃত্তচারি করে তুলেছিল। নিরন্তর স্বরচিত গণ্ডির মধ্যে তিনি গুটিপোকার মত পাক খেয়েছেন, গুটি কেটে বেরতে পারেননি। তবে সাহিত্যে প্রজাপতির চেয়ে নষ্ট গুটির প্রয়োজন অনেক বেশি। শিল্পীর হয়তো ক্ষতি হয়েছে কিন্তু শিল্পের হয়নি। এই পথহারা প্রতিভা নিজের জীবন দিয়ে শিল্পের পথ-নির্দেশ রেখে গিয়েছেন। জগদীশ গুপ্তের পতনের পর আমাদের ভাঙাচোরা সমাজ ভিন্ন চেহারা নিয়েছে, মানুষের জীবনের আঙ্গিক এবং মূল্যবোধ বদলে গেছে, বদলে গেছে তার পরিভাষা। তবু এই একবিংশ শতকে এসে অনেক পাঁয়তারা ভাঁজা তালঠোকার পর আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলা সাহিত্য ঘুরে ফিরে আবার সেইখানেই পৌঁছেচে, যেখানে একদা জগদীশ গুপ্ত শেষ করেছিলেন। এই শেষ থেকেই, দূরদ্রষ্টা পথিকৃতের অনুশীলন-রেখা থেকেই, হয়তো বা শুরু হবে আমাদের সাহিত্যপালার এক নবীনযাত্রা।
নির্দল নিঃসঙ্গ আত্মপ্রচার বিমুখ এই মানুষটি অধিক বয়সে, প্রায় চল্লিশোর্ধে কথাসাহিত্যের দরবারে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের সরণি তখন নির্জন ছিল না। রবীন্দ্রনাথ শীর্ষচারি, শরৎচন্দ্রের ভরা জোয়ার, রাজপথ তখন জনপথ হয়ে উঠেছে কীর্তিমান সাহিত্যিকের মিছিলে। প্রভাত মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্লোল গোষ্ঠীর পাশাপাশি মনীন্দ্রলাল বসু প্রমুখ, সগৌরবে এই উজ্জ্বল সাহিত্য-জনতার মধ্যেও জগদীশ গুপ্ত কোণঠাসা হয়ে হারিয়ে যাননি, আলোর বৈপরীত্যে তাঁর অত্যাশ্চর্য সিলুয়েট মূর্তিচি অনায়াসেই চোখে পড়েছে। সাহিত্যের এই অনুবর্তনে তিনি ছিলেন মূর্তিমান ব্যতিক্রম।
প্রচলিত প্রথার বাইরে এক অর্থে শাস্ত্র বিরোধী সেই প্রথম পদক্ষেপ। একটু বেমানান, খাপছাড়া, সিদ্ধরসে আঘাতকারী। অপরিচিত অন্ধকার জগৎকে, নমানবতন্ত্রী জীবনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন। সে কালের তুলনায় কয়েক পা এগিয়ে এসেই তিনি কলম ধরেছিলেন। নির্মম বিদ্রুপশানিত কলমে তিনি পতিত পরাজিত পঙ্কিল মানুষের অকথ্যচিত্রকে তুলে ধরলেন নৈর্ব্যক্তিক দুঃসাহসে। ট্র্যাডিশন্যাল ট্রাজেডির বাইরে নতুন বিষাদ যুক্ত হল। প্রকৃতিবাদী বাস্তবতার অঙ্কিত হল ইতর জনমনুষ্যের ব্যক্তিগত এবং পরাভূত জীবন সংগ্রাম, তার দুঃখ, নৈরাশ্য ও নিঃসঙ্গতা। নিয়তির সঙ্গে পুরুষকারের এই অসম যুদ্ধে প্রমাণিত হল জন্মের মুহূর্তেই মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে ধ্বংসের বীজ। সমাজের দূষিত বাতাবরণ তাকে অনিবার্য করে তুলচে। পরস্পরভোগ্য মানুষের জীবন, তার নরত্ব, তার নারীত্ব কোন অর্থহীন অঙ্কের ফলশ্রুতি। জগদীশবাবু রাজনৈতিক সমাধানের স্তোকবাক্য দেননি, বিপ্লবের পথ বাতলালনি। নায়ক-নায়িকার সংজ্ঞা তাঁর হাতে বদলে গেছে। অ্যান্টি হীরো এবং অ্যান্টিনভেলের সূচনা করে গেছেন তিনি, প্লটের ক্ষেত্রেও কাহিনির কোলাজ-পিনদ্ধ কাঠামোর। জীবনের মোদ্দা সরল সত্যকে দেখার ব্যাপারে যদি বা তাঁর কখনো ভ্রান্তি থেকে থাকে বন্দুমাত্র ফাঁকি কিন্তু ছিল না। বাংলা সাহিত্যে এমন সৎ নিষ্ঠাবান নিস্পৃহ এবং নিমগ্ন লেখক সে যুগে আর দুটি ছিল না। তাঁর ব্যক্তিজীবন ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে তাঁর লেখার মধ্যে। অপ্রস্তুত পাঠকের পক্ষে সে লেখা সহজপাঠ্য হয়নি একাধিক কারণে, তাঁর কঠিন সংযম এবং শ্লীলমানসিকতাকে ধরতে পারেননি অনেকে। এমন কী রবীন্দ্রনাথও কিঞ্চিৎ অবিচার করেছেন তাঁর প্রতি। তবু রবীন্দ্রনাথই তাঁকে যোগ্যতম গুরুত্ব দিয়েছিলেন, একথাও অনস্বীকার্য। জগদীশ গুপ্তের জন্ম হয়েছিল ১৮৮৬ সালের জুলাই মাসে, নদীয়ার কুষ্ঠিয়া শহরে। তাঁদের আদি নিবাস ছিল ফরিদপুরে। কিশোর বয়স থেকেই কবিতা চর্চা শুরু হয়। এই কবিতাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম আখর। আমৃত্যু এই কাব্যচর্চা অব্যাহত ছিল। রক্ষণশীল পরিবারে এজন্য তাঁকে প্রথম জীবনে তিরস্কার ও নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। উত্তর জীবনে কবিতা সহচর গদ্য সাহিত্যের পরিপূরক এবং রিলিফ এবং বাগধারার আদি খসড়া ও ভাষাসৌকর্ষের সহায়ক হলেও এই চরিত্র ভিত্তিক ব্যঙ্গকাহিনিমূলক দীর্ঘকবিতার সংসর্গ গল্পউপন্যাসের পক্ষে পরোক্ষে হানিকর হয়েছিল এমন মনে হয়।
সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি খেলাধুলোয় ও সঙ্গীতে তিনি রীতিমতো অনুরাগী ও কৃতী ছিলেন। ভালো ফুটবলার জগদীশ গুপ্ত এস্রাজ, বেহালা, বাঁশি ও হরমোনিয়াম বাদনের পারদর্শী ছিলেন। কর্মসূত্রে স্থানান্তরে গমনের ফলে ক্রীড়া ও সঙ্গীতচর্চার ইতি ঘটে, সাহিত্যই তাঁর একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। ১৯০৫ সালে সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে রিপন কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু অনিবার্য কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ক্ষোভের বশে পড়া ছেড়ে দেন। বিদ্যায়তনিক জীবনের সমাপ্তি ঘটলেও সুপড়ুয়া এই মানুষটির আজীবন ব্যাপক পড়াশোনা ছিল। ১৯০৬ সালে চারুবালা সেনগুপ্তের গঙ্গে বিবাহ হয়। তারপর ভ্রাম্যমান চাকুরি জীবন। প্রথমে সিউড়ি জজকোর্টে টাইপিস্টের চাকড়ি। পরে সম্বলপুর একজিকিউটিভ এঞ্জিনীয়ার অফিসে ও পাঠনা হাইকোর্টে যথাক্রমে। মতবিরোধ হওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে কুষ্ঠিয়ায় ফিরে এসে কিছুদিন ফাউন্টেন পেনের কালি তৈরির ব্যবসায় নামেন এবং বিফল হন। শেষে বোলপুর আদালতে আবার টাইপিষ্টের কাজ নেন এবং সাহিত্যকর্মে পুরোপুরি আত্ম নিয়োগ করেন। এই পর্বে একের পর এক গ্রন্থ প্রকাশ হতে থাকে। বিনোদিনী (৯টি গল্প, ১৯২৭), অসাধুসিদ্ধার্থ (উপন্যাস, ১৯২৯), রোমন্থন (রচনাকাল ১৯২৮-২৯/উপন্যাসসোপম গল্প) রূপের বাহিরে (৯টি গল্প, ১৯৩১), শ্রীমতী (৯টি গল্প, ১৯৩১), অক্ষরা (কবিতা সংকলন, ১৯৩২), সুতিনী (উপন্যাস, ১৯৩৩), উদয়লেখা (১০টি গল্প, ১৯৩৩), তৃষিত সৃক্কনী (৩টি গল্প, ১৯৩৩), রতি ও বিরতি (১৯৩৫), উপায়ন (৫টি গল্প, ১৯৩৫), শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী (৬টি গল্প, ১৯৩৬)।
১৯৪৪ সালে অবসর গ্রহণের আগে-পরে কয়েক বছর গ্রন্থপ্রকাশে ভাটা পড়েছে। কর্মস্থল ছেড়ে কলকাতায় বসবাস করতে চলে আসেন এই সময়। তারপর ১৯৪৭-এ ‘মেঘবৃত অশনি’ (৯টি গল্প) এবং ‘নিষেধের পটভুমিকায়'(নাটক, ১৯৫২)। রক্তচাপে ভুগছিলেন জগদীশ গুপ্ত, শেষদিকে চোখে ভালো দেখতেন না। ১৯৫৭ সালে তাঁর মৃত্যু ঘটে। মৃত্যুর পর কয়েকটি বই বেরিয়েছিল। অনেক কবিতা অপ্রকাশিত এবং গ্রন্থাকারে অনুমোদিত রয়ে গেছে এখনও। প্রকাশকাল জানা যায়নি এমন কয়েকটি বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাইক শ্রীমিহির প্রামাণিক (১০টি গল্প), কশ্যপ ও সুরভী (কবিতার বই) ও যথাক্রমে (উপন্যাস)।